× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যেতে যেতে পথে হলো দেখা

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:২৭ পিএম

যেতে যেতে পথে হলো দেখা

ক্যালেন্ডারের পাতায় ছুটির লাল চিহ্ন দেখলেই মাথা ঘুরপাক খায়। মনে হয় যেন কতকাল যাইনি কোথাও। তাই এই ছুটি আর মিস করা যাবে না। কী আশ্চর্য! সবেমাত্র দুই সপ্তাহ আগেই ঘুরে এসেছি। রক্তের সঙ্গে ভ্রমণ লেপ্টে গেলে যা হয়। সত্যিই ভ্রমণ নেশায় পুরাই বুঁদ হয়ে বাসের টিকিট না পেয়ে বন্ধু নাজমুল ভূঁইয়া বিবেক, নিজেই চালকের আসনে বসে চার চাকা নিয়ে হাজির।

যাচ্ছি চার বন্ধু। যেতে যেতে সিরাজগঞ্জ চায়না বাঁধে। বাঁধ থেকে যমুনা ব্রিজের নান্দনিক সৌন্দর্য অসাধারণ। সেইসঙ্গে সাদা কাশফুলের নরম ছোঁয়া। দুই দিকে নদী মাঝখানে বাঁধ। মূল ফটক হতে প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক চলে গেছে চায়না বাঁধের শেষ অবধি। এই বাঁধের আরেক নাম ক্রসবার-৩। পুরো পরিবার নিয়ে সারাটা দিন সবুজ গালিচায় বসে নীল আসমান দেখতে দেখতে কিংবা যমুনা নদীতে নৌভ্রমণ করে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতেও ইঞ্জিন নৌকায় করে গিয়ে ঘোরা যাবে। যমুনার মাতাল হাওয়ায় যখন মশগুল, তখনি চালক বন্ধুর হাঁকডাক। গাড়ি স্টার্ট। আবারও ছুটলাম। যেতে যেতে বগুড়া শহরে ব্রেক। সন্ধ্যা ৭টায় রংপুর শহরের রবার্টসনগঞ্জ পৌঁছাই। রাতটা রংপুরেই কাটাতে মনস্থির করলাম। সরকারি এক বালাখানায় প্রবেশ করে ফ্রেশ হয়ে রাতেই শহর ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি। বেশ পরিপাটি শহর। পুজোর আনুষ্ঠানিকতা থাকায় রাত গভীরেও পথেঘাটে মানুষের বেশ সমাগম।

সকালে ঘুম ভাঙলেই দ্রুতগতিতে রেডি। শুরুতেই চলে যাই তাজহাট জমিদারবাড়ি। প্রবেশ ফি দিয়ে ফটকের ভেতর ঢুকতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল। বিশাল আঙিনা। সেই আঙিনায় সবুজের সমাহার। জমিদারবাড়ির স্থাপত্যশৈলী চমৎকার। মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাড়িটির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। শেষ করতে প্রায় দশ বছর লেগেছিল। সেই ১৯১৭ সালেই এর নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। তাজহাট জমিদারবাড়িটি আগে ৩৫ একর নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি এখন মাত্র ১৬ একর আয়তন নিয়ে টিকে রয়েছে। রংপুরের প্রাচীণ নিদর্শন তাজহাট জমিদারবাড়িটি, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রাসাদগুলোর মধ্যে একটি। প্রাসাদটি প্রায় ২১০ ফুটের মতো প্রশস্ত। এর উচ্চতা প্রায় ৪ তলার মতো উঁচু। মোট ৩১টি সিঁড়ির প্রতিটিই মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি।

প্রাসাদটিতে একটি গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে গুপ্ত সিড়িঁটি কোনো একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘাঘাট নদীর সঙ্গে মিশেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে এখন সিঁড়িটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রাসাদের ফোয়ারা শ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথরে মোড়ানো। কথিত আছেÑ দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারাটি বিশেষ করে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে রানীর জন্যই করা হয়েছিল। এখানেও প্রমাণিত গুণবতী নারীরা সর্বকালেই পুরুষের কাছে সম্মানিত। তাজহাট জমিদারবাড়ি তথা রাজপ্রাসাদটির সম্মুখভাগ প্রায় ৭৬ মিটার পূর্বদিক মুখ করা। প্রাসাদটির মাঝখানেও মার্বেল পাথরের তৈরি প্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এর প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় মুঘল স্থাপনার অনুকরণে, দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যখচিত বাড়িটি নির্মাণশৈলীতে বেশ রুচির পরিচয় বহন করেছে। বর্তমানে এটি তাজহাট রাজবাড়ী জাদুঘর নামে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। প্রতি রবিবার পূর্ণ ও সোমবার অর্ধদিবসসহ সরকারি বিশেষ ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘর বন্ধ থাকে। 

এরপর চলে যাই কারুপণ্যর অফিস পাশাপাশি কারখানায়। যদিও এটা অফিস কিন্তু তবুও ঘোরার ও অভিজ্ঞতা অর্জনেও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখ ছানাবড়া। পুরো সাততলা ভবন লতাপাতায় ঘেরা। যেন বিশালাকার কোনো বাগানে রয়েছি। প্রাকৃতিকভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য এই কার্যকরী আয়োজন। এতে প্রায় ৮০ ভাগ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়েছে। ভেতরটায়ও রয়েছে বেশ নান্দনিকতার ছোঁয়া। সবকিছুই খুব সুন্দরভাবে সাজানো গোছানে। কারুপণ্যের হস্তশিল্পর কারখানা ও সাতরঞ্জি বিক্রয় কেন্দ্র ঘুরে ছুটলাম বেগম রোকেয়া বিশ্বদ্যিালয় ক্যাম্পাসে। শ্রদ্ধা স্মরণে জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। সবুজে ঘেরা সুবিশাল ক্যাম্পাস। চোখে একপ্রকার প্রশান্তি এনে দেয়। পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরতে গেলে সময় লাগবে বেশ। তাই দেরি না করে গাড়ি ছুটল তিস্তা ব্যারাজ। যেতে যেতে গঙ্গাচড়া ব্রেক। জবিয়ান বন্ধু সাবেক উপজেলা চ্যেয়ারম্যান সুজনের আতিথেয়তা গ্রহণ করা ছাড়া গাড়ির চাকা আগাতে পারবে না। ওর বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করতেই মনের ভেতর অন্যরকম শিহরন দোল খেল। এ যেন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে অনন্য এক গৃহস্থ বাড়ি। দল বেঁধে চীনা হাঁসের ছুটে চলার মনোরম দৃশ্য, ঘরের পাশেই সবুজ ধানক্ষেত নজরকাড়ে।

ভ্রমণ মানেই পরতে পরতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়, মানসিক তৃপ্তি লাভের উপকরণসহ যাপিত জীবনের উত্তম শিক্ষা। জম্পেশ একটা ভূরিভোজ শেষে ছুটলাম তিস্তা ব্যারাজ। ছবির মতো সুন্দর গঙ্গাচড়ার প্রকৃতি দেখতে দেখতে তিস্তা ব্যারেজ যখন পৌঁছি, তখন সন্ধ্যার আলোও বিদায়। কী আর করা। গাড়ি নিয়ে চলল পঞ্চগড়। সরকারি এক গেস্টহাউসে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে ছুটলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে তেঁতুলিয়া। প্রশস্ত সড়কে ভোরের হাওয়ায় মাতাল টানে, সীমান্ত নদী মহানন্দার তীরে যেতেই চোখে ধরা দিল দার্জিলিং পাহাড়মালা। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার খবর নেই। তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো। জায়গাটা এখন মিনিপার্ক। সাধারণ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বিনোদনের খোরাক। দূর দেশের পাহাড় দেখার জন্য কেন যেন মন আর ধৈর্য ধরল না। সমতলের চা বাগানের কচিপাতার ঘ্রাণ শুকতে শুকতে বাংলাবান্ধার পথে। কিছুদূর গিয়েই ব্রেক মেরে সকালের নাশতা করতে করতে মাথায় খেলল, কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটে ঢুঁ মারার ভাবনা। যেমন ভাবা তেমন কাজ।

যাত্রা শুরু রওশনপুর গ্রামের পথে। গ্রামে ঢুকতেই নয়নাভিরাম সব চা বাগান। চোখ জুড়ানো পরিপাটি গ্রাম। গাড়ি আগাতে আগাতে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের মূল ফটকে। পার্ক করেই হাঁটা। ভেতরটা বাহারি রকমের গাছের লতাপাতা, গুল্ম দিয়ে ঠাসা। আমরা ধীরলয়ে পায়ে হাঁটতে থাকি। তৃপ্ত চিত্তে চারপাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে আমাদের দুনয়ন জুড়ে মুগ্ধতা ভর করে। ব্যক্তিমালিকানাধীন ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত অর্গানিক চা উৎপাদনের জন্য টি এস্টেটের অফিস ও বাংলো প্রকৃতির মেলবন্ধনে সাজিয়েছে বেশ। বাংলোগুলোর সম্মুখে সবুজ ঘাসের প্রান্তরের পাশে সুদৃশ্য লেকও রয়েছে। আরও রয়েছে সারি সারি হরেক রকমের ছোট-বড় গাছ। গাছের ছায়ায় লেকের ধারে বসে অনায়াসে প্রেয়সীর জন্য একটি মন ভোলানো গদ্য কবিতা লেখা যাবে। দরকার নাই ভাই আমাদের গদ্য-পদ্য কবিতা লেখার। এমনিতেই উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে এলে, মাথায় বিয়ের ভূত চাপে। ইস্পাত কঠিন মনোবলের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, তিনিও অনেক জায়গায় গিয়ে প্রেমের খেয়ায় ভাসছেন। সেই ক্ষেত্রে আমাদের দোষ কই। তা দোষগুণ যাই হোক, এর চেয়ে ভালো দেশের শেষ সীমান্ত বাংলাবান্ধা যাই। সেখানটাতে গিয়া তো মোর পুরাই গোলক ধাঁধা। এক দশকেরও বেশি সময় আগে যেমনটি দেখে গিয়েছিলাম, এখন আর তেমনটি নেই।

বর্তমানে এতটাই আধুনিকায়তন করা হয়েছে যে, সাধারণ ভ্রম পিপাসুদের জন্য এটি একটি বিনোদনমূলক পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর হয়ে উঠেছে। তা ভালো। এমনিতেই দেশে বিনোদন কেন্দ্র অপ্রতুল। হিমালয়কন্যা পঞ্চগড় জেলার সর্বোত্তরের তেঁতুলিয়া উপজেলার ১নং বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট। ১৯৯৭ সালে এখানে স্থলবন্দর স্থাপন করা হয়েছিল। কংক্রিট দিয়ে তৈরি বিশালাকার একটি জিরো, যা কারোরই দৃষ্টি এড়াবে না। মূলত সেই জিরো স্থান থেকেই ভারতের পাশে বাংলাদেশের সীমানা শুরু। জিরোর অপর প্রান্তে রয়েছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। বাংলাবান্ধা দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানির পাশাপাশি সীমিত আকারে যাত্রীরাও যাতায়াত করতে পারে। প্রকৃতির চাদরে সবুজে ঘেরা বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে ভারতের শিলিগুড়ি মাত্র ৭ কিলোমিটার, দার্জিলিং ৫৮ কিলোমিটার। আর আরেক প্রতিবেশী দেশ নেপাল মাত্র ৩০ কিলোমিটার। বাংলাবান্ধা ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার ব্যাপারটা হলো, আপনি একেবারে দেশের মানচিত্রের মাথায় অবস্থান করার এক অব্যক্ত অনুভূতি অনুভব করতে পারবেন। কিন্তু সেই অনুভূতির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা বলে-কয়ে কাউকে বোঝাতে পারবেন না। যিনি বুঝতে আগ্রহী হবেন, তাকে সশরীরে নয়নাভিরাম বাংলাবান্ধা যেতেই হবে।        

যাতায়াত : নিজস্ব গাড়ি/মোটরসাইকেল হলে বেশ ভালো। এ ছাড়া বাস, ট্রেন ও বিমানেও উত্তরবঙ্গ যাওয়া যায়।

খাবেন-থাকবেন কোথায় : প্রতিটি জেলা-উপজেলায়ই প্রচুর হোটেল/মোটেল ও সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। খাওয়ার জন্য রয়েছে মানভেদে প্রচুর রেস্তোরাঁ।             

টিপস : নিজস্ব গাড়ি না হলে কমপক্ষে ৫ দিন সময় নিয়ে বের হবেন।

  • ইচ্ছো করলে ঘোরাঘুরির জায়গা কমিয়ে দুই দিনেও করা যাবে।
  • প্রকৃতি ও জায়গা উপভোগের সঙ্গে আঞ্চলিক খাবার-দাবারের স্বাদ নিতে ভুল করবেন না।
  • ভ্রমণকালীন স্থানীয়দের সঙ্গে সুন্দর আচরণের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে একাকার হওয়ার চেষ্টা করবেন।
  • আবহাওয়া অনুকূল থাকলে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপও চোখে ধরা দিতে পারে।
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা