রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:০৫ পিএম
বাঙালির স্রোতধারার সংস্কৃতির পাশে, অনেকটা নীরবে অথচ দৃঢ় আত্মপরিচয়ে, উপকূলের বালুকাবেলায় আজও বেঁচে আছে এক প্রাচীন জনগোষ্ঠীর গল্পÑ রাখাইন। বরগুনার তালতলী ও সদরের বালিয়াতলীর নিভৃত জনপদে আড়াইশ বছরের বেশি সময় ধরে তারা আগলে রেখেছে নিজেদের ভাষা, ধর্ম, শিল্প ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। ইতিহাসের বহু ঢেউ এই উপকূলে আছড়ে পড়লেও ভাঙতে পারেনি তাদের স্বাতন্ত্র্য বরং এই জনপদকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ।
সময়টা ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ। আরাকানের মেঘাবতী অঞ্চল থেকে নির্যাতন আর নিপীড়নের মুখে জীবন বাঁচাতে উত্তাল বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়েছিল রাখাইনদের একটি বহর। প্রায় ৫০টি নৌকা নিয়ে তারা প্রথমে পৌঁছায় রামু ও কক্সবাজার উপকূলে। পরে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী দ্বীপ হয়ে আশ্রয় নেয় বরগুনার জনমানবহীন, গভীর জঙ্গলঘেরা উপকূলীয় এলাকায়।
উপকূলীয় জেলা বরগুনার তালতলী ও সদরের বালিয়াতলী এই দুই জনপদের নিভৃত পল্লিতে আজও নীরবে টিকে আছে এক ঐতিহাসিক জনপদের গল্প। প্রায় আড়াইশ বছরের বেশি সময় ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে মহানৃগোষ্ঠীভুক্ত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী রাখাইন সম্প্রদায়। সংখ্যায় ছোট হলেও তাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাস উপকূলীয় বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভুবনকে করেছে অনন্য ও বৈচিত্র্যময়।

সেই সময় এই অঞ্চল ছিল অরণ্য আর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। দা, লেজা ও বল্লম হাতে বন পরিষ্কার করে তারা গড়ে তোলে টংঘর, বসতি ও আবাদি জমি। নিজেদের সঙ্গে আনা ধান, ফল ও ফসলের বীজে শুরু হয় নতুন জীবনের অধ্যায়। তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে পত্তন নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে এই জনগোষ্ঠী। সংখ্যায় ক্ষুদ্র হলেও রাখাইনদের রয়েছে ধর্ম, বসতি ও শিল্পকলার এক স্বতন্ত্র জগৎ। উঁচু কাঠের টংঘর, শান বাঁধানো পুকুর, বড় বড় বৌদ্ধ বিহার, শ্মশান ‘চে-শেই’Ñ সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক আলাদা জীবনবিন্যাস। তাদের হাতে গড়া বাসন-কোসন, নকশাদার কাপড় ও তাঁত শিল্প আজও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
তালতলীর প্রবীণ রাখাইন সদস্য মং এ্যা খ্যাং বলেন, ‘একসময় আমাদের প্রায় প্রতিটি মন্দিরে পিতল, কষ্টিপাথর ও শ্বেতপাথরের বুদ্ধমূর্তি ছিল। কালের স্রোতে অনেক কিছু হারালেও আজও ঠাকুরপাড়াগুলোতে শ্বেতপাথরের বুদ্ধমূর্তিই আমাদের প্রধান আরাধ্য।’
রাখাইন সমাজে নারীর পরিচয়ের বড় অংশ জুড়ে আছে তাঁত। প্রচলিত বিশ্বাস যে মেয়ে তাঁত বুনতে জানে না, তার বিয়ে ভালো হয় না। তাই বছরের বারো মাসই রাখাইন পল্লির বাতাসে ভেসে বেড়ায় তাঁতের খটখট শব্দ। মায়ানমার থেকে আনা সুতায় তারা বোনে চাদর, লুঙ্গি, শার্ট পিস, গামছা ও ব্যাগ। বর্ণিল সুতা দিয়ে ফুল-লতা ও জ্যামিতিক নকশায় তৈরি এসব কাপড় দক্ষিণাঞ্চলের বাজারে বেশ জনপ্রিয়। শীত মৌসুমে স্থানীয় হাটে রাখাইন কাপড়ের চাহিদা থাকে তুঙ্গে।
রাখাইন সমাজের সবচেয়ে বর্ণিল ও প্রাণবন্ত উৎসব হলো সাংগ্রাইÑ জলকেলীর মাধ্যমে পালিত নববর্ষ। ঘণ্টাধ্বনিতে উৎসবের সূচনা হয়। এরপর তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে একে অন্যের গায়ে জল ছিটিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। নাচ, গান আর হাসিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো জনপদ।
এই উৎসব উপলক্ষে তালতলী ও বালিয়াতলীতে নেমে আসে হাজারো মানুষের ঢল। বাঙালি ও আদিবাসীদের মিলনমেলায় রূপ নেয় পুরো এলাকা। জনশ্রুতি আছে সাংগ্রাই উৎসবই নাকি রাখাইন তরুণ-তরুণীদের ভালোবাসা আর জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার সবচেয়ে শুভ সময়।
তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে বাস্তবতা। একসময় বরগুনা জেলায় রাখাইন জনসংখ্যা ছিল ১০ হাজারের বেশি। বর্তমানে তা নেমে এসেছে দুই হাজারের নিচে। ভূমি সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জীবিকার অভাব ও আধুনিক জীবনের চাপ অনেক পরিবারকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছে।
বালিয়াতলীর প্রবীণ মং অং সাই (৭২) আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা বন কেটে এই গ্রাম গড়েছি। আজ ঘর আছে, কিন্তু জমির নিরাপত্তা নেই। নতুন প্রজন্ম এখানে থাকতে চায় নাÑ এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভয়।’
বৌদ্ধ ভিক্ষু উ সুমনা থেরা বলেন, জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক বিহার রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঝুঁকিতে পড়েছে। ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
উপকূলীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশ কর্মী মুশফিক আরিফের মতে, ‘রাখাইনরা শুধু একটি জনগোষ্ঠী নয়, তারা এ অঞ্চলের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ মানে উপকূলের ইতিহাস রক্ষা করা।’