মহুয়া রউফ
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৬ পিএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:২৪ পিএম
ট্রেজার আইল্যান্ড’ খ্যাত স্কটল্যান্ড এর রাজধানী এডিনবরা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর স্থাপত্যের বিপুল ঐশ্বর্যে ভরপুর ইউরোপের এক অসাধারণ দেশ ‘ ট্রেজার আইল্যান্ড’ খ্যাত স্কটল্যান্ড এর রাজধানী এডিনবরা। এই শহরের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, রঙ ও রূপ। এই শহরে ইতিহাস আর ঐতিহ্য যেন হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে। এডিনবরা ঘুরে এসে লিখেছেন ভূ-পর্যটক মহুয়া রউফ
এডিনবরার প্রিন্সেস স্ট্রিটে স্কার্ট পরিহিত পুরুষটিকে দেখে এগিয়ে গেলাম। যেই না বললাম তোমার স্কার্টটি তো ভারি সুন্দর, সে একরকম তেড়ে এলো আমার দিকে। বলল, এটি স্কার্ট নয়, এটি ‘কিল্ট’, আমরা স্কটিশ পুরুষরা গর্বের সঙ্গে এটি পরি। ‘কিল্ট’ আমাদের জাতিগত পরিচয়।
আমি শুধু তার এটুকু ইংরেজিই বুঝেছি। এ কথার আগে-পরে-মাঝে তিনি আরও কঠিন আর দুর্বোধ্য উচ্চারণে ইংরেজি বাক্য ব্যয় করলেন আমার জন্য। সিনেমার মতো সাব-টাইটেল না পেলে বা কেউ তরজমা করে না দিলে সেসব বোঝা আমার পক্ষে অসম্ভব। এমন শক্ত ইংরেজি খোদ আমেরিকানরা বুঝবে কি না সন্দেহ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা পর্যটককে বললাম, ওর অনেক কথাই আমি বুঝিনি। তিনি আমায় ভোলাবার জন্য বললেন, ‘আরে যে জাতি শুধু তাদের সম্মতিসূচক ‘ইয়েস’ শব্দটা বিশ উপায়ে উচ্চারণ করে তুমি কিনা সে স্কটিশের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছ? তার চেয়ে হেঁটে হেঁটে এ প্রস্তর শহর দেখ।’ আমি সান্ত্বনা খুঁজে পেলাম এই চির অচেনার কথায়। আমার চেপে ধরা নিঃশ্বাস ছেড়ে শান্ত হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম এডিনবরার রাস্তায়।

ঘাড় উঁচু করে সামনে তাকালেই দেখছি দূরে উঁচুতে একটি বিশাল ঘড়ি- যেন শহরের লাইট হাউস। শহরের সব হিসেব রাখছে সে! কোথায় যেন শুনেছি এ ঘড়ি ইচ্ছে করে দুই মিনিট এগিয়ে রাখা হয়, পাছে কারও ট্রেন মিস না হয়। তবে নববর্ষের রাতে নাকি ঠিকঠাক সময় দেখায়।
পাথুরে রাস্তা ধরে হাঁটছি। রাস্তা এত বেশি উঁচু, হাঁটছি বললে ভুল হবে- নগরের রাস্তায় ট্র্যাকিং করছি অথবা মনে হচ্ছে সিঁড়ি বাইছি। এ রাস্তা কোনো সাধারণ শিলা দিয়ে তৈরি নয়, ৩৫০ মিলিয়ন বছর আগের আগ্নেয়গিরির অবশেষ এটা। এ কারতেই এ পাথরগুলো কালচে, রুক্ষ আর শক্ত। আগ্নেয় শিলার পাহাড়ের মেরুদণ্ড বরাবর তৈরি হয়েছে এ শহর। আশপাশের বাড়িগুলোর দুপাশে সরু রাস্তা আর গলি। এ শহরে কোনো সমতল নেই। চারদিকে তাকালে একনজরে দুর্গ মনে হয়। এডিনবরা খুবই প্রাচীন শহর। এখানে পাহাড়ের ওপর একটা প্রাকৃতিক দুর্গ ছিল। নাম ছিল ‘Din Eidyn’। সপ্তম শতকে অ্যাংলো-স্যাক্সনরা এ দুর্গ দখলে নিয়ে নাম বদলে দিল। নাম হয়ে গেল ‘Edin-burh’। ‘burh’ শব্দের মানে দুর্গ অর্থাৎ সুরক্ষিত শহর। সময়ের পরিবর্তে ধীরে ধীরে এ শহর একটি স্থায়ী নাম পেলÑ Edinburgh। এই দুর্গকে ঘিরেই এখানে যত বসতি, বাণিজ্য আর দখলদারিত্ব। শহরটাও হয়েছে উঁচু দুর্গের মতো শক্ত। হেঁটে হেঁটে আমি ক্লান্ত আর অবসন্ন। কিছু পেটে না পড়লে এখানে বেহুঁশ হয়ে পড়ব। কোনো কিছু না বুঝেই ঢুকে পড়লাম এক খাবার দোকানে। বললাম, তোমাদের জনপ্রিয় ঐতিহ্য খাবার হ্যাগিস আছে?
সে বলল, অপেক্ষা করলে আমরা তৈরি করে দিতে পারি। মনে মনে বললাম আমার সময়ের অভাব নাই, অনন্তকাল অপেক্ষায়ও আমার ক্লান্তি নেই।
স্কটিশ হ্যাগিস শব্দটা কেমন ভয়ংকর ভয়ংকর শোনায়, তাই না? এটি বানানোর কায়দাও বেশ অদ্ভুত বলে আমি শুনেছি। ভেড়ার হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ, ফুসফুস সব কুচি করে এর সঙ্গে নানা রকম মসলা মিশিয়ে সিদ্ধ করে পরে সেগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ভেড়ার ভুঁড়ির ভেতর। ব্যস, তৈরি হয় হ্যাগিস। আমার কল্পনায় ভয়ংকর একটি খাবার আমার সামনে আসার আলামত টের পাচ্ছি। স্কটল্যান্ডের জাতীয় কবি রবার্ট বার্নস এ খাবার নিয়ে একটি কবিতাও লিখেছেন। এটি নাকি তাদের আত্মসম্মানের প্রতীক। ওদের যেখানে সম্মান, আমার সেখানে আতঙ্ক।

ওয়েটার খাবার সামনে এনে রাখতেই বললাম, ভেড়ার শরীরের ভেতরের রক্ত ছাড়া আর সব আছে এতে, তাই তো? সে হেসে বলল, তুমি তো খুব রসিকতা জানো! মনে মনে বললাম, দেশ বিদেশে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছি, এখানে ওখানে একটু রসিকতাও যদি না করলাম, আমার চলবে কীভাবে! আমিও মানুষ।
আকাশের সূর্যটাকে মাড়িয়ে দিয়েছে মেঘের দল, হালকা একটু বৃষ্টিও শুরু হলো। আমি ব্যাগ থেকে ছাতা বের করলাম। স্কটিশরা বিশ্বাস করে বৃষ্টি তাদের শুধু আবহাওয়া নয়, তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। সামনে রাস্তা আরও উঁচু। রাস্তার পাশে দোকানে আড্ডা আর হুইস্কি খুলে বসেছে নর-নারীরা। গম্ভীর কাউকে দেখলেই তাদের আমি স্কটিশ মানছি, কারণ ওরা এমনই। আমি পিছলে যেতে যেতে খানিক দাঁড়ালাম। রাস্তায় ধারে এক পথ-বাদক ব্যাগপাইপ বাজিয়ে চলছে, তার পরনেও কিল্ট। মৃদু বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দুই মিনিট ব্যাগপাইপ শুনলাম।
ব্যাগপাইপ আবারও পিচ্ছিল ভেজা রাস্তা ধরেছি। আমার গন্তব্য কেলটন হিল। পথ একেবারে সোজাÑ যাকে বলে নাক বরাবরÑ রাস্তা ভেজা না হলে চোখ বন্ধ করে হাঁটা যেত। কেলটন হিলের কাছে গিয়ে দেখি পর্যটকরা দলবেঁধে উঠছে চূড়ায়। পাখির দৃষ্টিতে এডিনবরা দেখতে চাইলে এ পাহাড়ের চূড়ায় আসতে হয়। আমি না হয় পাখিই হব আজ!
কানাডার মট্রিল শহরের কথা মনে পড়ছে। সেখানেও এক পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পুরো মট্রিল শহর দেখেছিলাম। কেলটন হিলে উঠে প্রথম নজরে এলো গ্রিক মন্দিরের মতো একটা কিছু। অনেক পিলার একটার পর একটা দাঁড়িয়ে। কাছে এগিয়ে গেলাম। স্কটল্যান্ডে এসে এথেনস আর মট্রিল দুই শহরের জন্য স্মৃতিকাতর হচ্ছি। এটি আসলে মন্দির নয়, অসম্পূর্ণ স্মৃতিসৌধ। এটি যুদ্ধের মৃত সৈনিকদের জন্য বানানোর কথা ছিল। মাঝপথে অর্থের অভাবে কাজ বন্ধ হয়। স্থানীয়রা এটা নিয়ে তামাশা করেÑ বলে এটা এডিনবরার লজ্জা। এর নকশা হয়েছিল এথেন্সের পার্থেনন মন্দির দেখে। কিন্তু পর্যটকের স্রোত দেখে বুঝতে পারছি সময়ের প্রবাহে এ লজ্জাই হয়ে উঠেছে শহরের সবচেয়ে আইকনিক ছবি।
দূরে দাঁড়িয়ে আছে আরেক খোলা স্তম্ভওয়ালা গোল স্মৃতিস্তম্ভÑ যার নাম ‘দুগাল্ড স্টুয়ার্ট মনুমেন্ট’। এটিও দেখতে গ্রিক মন্দিরের মতো। দুগাল্ড স্টুয়ার্ট ছিলেন স্কটল্যান্ডের দার্শনিক। ক্যালটন হিল থেকে দূরের ‘ফার্থ অব ফোর্থ’ দেখা যাচ্ছে। এটি একটি মোহনা যেখানে রিভার ফোর্থ উত্তর সাগরে মিশেছে।
সূর্য অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। চারপাশ নিঃশব্দ হলো। পেছনে শহরের পাথর, দুর্গ, গলি, শতাব্দীর জমে থাকা নীরবতাÑ আর সামনে ‘ফার্থ অব ফোর্থ’-এর ধীরে বয়ে চলা পানি। দূরে দাঁড়িয়ে আছে লাল রঙের ফোর্থ ব্রিজ, যার নিচে বইছে লোনা হাওয়া। ভ্রমণে নিজেকে মাঝে মাঝে পাখির মতো বন্য মনে হয়।