গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪২ পিএম
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪১ পিএম
বাংলাদেশের মোটর রেসিংয়ে অভিক আনোয়ার
বাংলাদেশের মোটর রেসিংয়ে অভিক আনোয়ার যেন ওয়ান ম্যান আর্মি। মোটর রেসে বাংলাদেশকে দিচ্ছেন নেতৃত্ব। তার হাত ধরেই আন্তর্জাতিক কার রেসিং প্রতিযোগিতায় একের পর এক সাফল্য অর্জন করে বাংলাদেশ। সম্প্রতি আবুধাবিতে ৬ ঘণ্টার এন্ডুরেন্স মোটর রেসে তৃতীয় হয় অভিক আনোয়ারের দল, দুবাইতে ‘এন্ডুরেন্স’ মোটর রেসিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হন অভিক আনোয়ার। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে গতির ঝড় তোলা এই তরুণকে নিয়ে লিখেছেন গোলাম কিবরিয়া
ইয়াস মারিনা সার্কিটের আলোঝলমলে রাত, গর্জে ওঠা ইঞ্জিনের শব্দ আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ছয় ঘণ্টার এক কঠিন লড়াই- এই মঞ্চেই বাংলাদেশের মোটরস্পোর্ট ইতিহাসে যোগ হলো নতুন এক গর্বের অধ্যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ‘ষষ্ঠ মিশেলিন ৬ আওয়ার্স আবুধাবি এন্ডুরেন্স রেস’-এ তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশি মোটর রেসার অভিক আনোয়ারের দল।
এই এন্ডুরেন্স রেসিং কোনো সাধারণ প্রতিযোগিতা নয়। ৬০টি রেসিং গাড়ি, প্রায় ২০০ জন ড্রাইভার এবং ছয় ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা- যেখানে একটি গাড়ি চালাতে হয় তিন থেকে চারজন ড্রাইভারকে পালাক্রমে। এমন কঠিন নিয়মের এই আন্তর্জাতিক আসর অনুষ্ঠিত হয় গত ১০ জানুয়ারি, শনিবার, আবুধাবির বিখ্যাত ইয়াস মারিনা সার্কিটে। আয়োজন করে বিশ্বখ্যাত রেসিং অর্গানাইজার ক্রেভেন্টিক।

অভিকের সঙ্গে রেসে পাকিস্তানের ফাহাদ খান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আহমেদ আল খাজা ছিলেন। রেসের শুরু এবং শেষ- সবচেয়ে চাপের দুই পর্বেই গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নেন অভিক নিজেই। প্রায় আড়াই ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে তিনি দলের জন্য গড়ে দেন দৃঢ় ভিত্তি।
এই রেসের গুরুত্ব আরও বাড়ে অংশগ্রহণকারীদের কারণে। বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশের শতাধিক শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ড্রাইভার এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিড়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে পোডিয়ামে ওঠা নিঃসন্দেহে এক বিরল অর্জন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, অভিক আনোয়ারের দল যে গাড়ি নিয়ে রেস করেছে, সেটি কার্যক্ষমতার দিক থেকে ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ল্যাপ টাইমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে প্রায় তিন সেকেন্ড পিছিয়ে ছিল গাড়িটি। তবু নিখুঁত রেসিং কৌশল, সঠিক সময়ের সিদ্ধান্ত এবং অটুট মানসিক দৃঢ়তায় এই সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে পরিণত করেন অভিক ও তার সহচালকরা। ফলাফলÑ রেস শেষে তৃতীয় স্থান।
দুবাই থেকে অভিক আনোয়ার বলেন, ‘এটা খুবই সম্মানজনক একটি রেস। এত ভালো ড্রাইভারদের সঙ্গে একই প্রতিযোগিতায় শীর্ষ তিনে থাকা শুধু আমার নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্জন।’

থেমে থাকার সুযোগ নেই। এই সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই অভিক এখন প্রস্তুত হচ্ছেন আরও বড় পরীক্ষার জন্য। ১৭ জানুয়ারি দুবাইয়ে অনুষ্ঠেয় ২৪ আওয়ার্স এন্ডুরেন্স রেসিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন তিনি। সেখানে টানা ২৪ ঘণ্টা ধরে চলবে রেস, ছয়জন ড্রাইভার পালা করে চালাবেন একটি গাড়ি।
গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর দুবাইয়ে ‘এন্ডুরেন্স’ মোটর রেসিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন অভিক আনোয়ার। গালফ প্রো চ্যাম্পিয়নশিপে ৩ নম্বর রাউন্ডে আয়োজকেরা প্রথমবারের মতো এন্ডিউরেন্স রেসিং চালু করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন গড়পড়তা রেসিং ড্রাইভার ও একজন সেরা রেসিং ড্রাইভারের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। অভিক আনোয়ারের সঙ্গে আরও তিনজন ক্রু (পিট ক্রু) ছিলেন এবং গাড়িতে ড্রাইভার হিসেবে অভিক আনোয়ার একাই ছিলেন। অতিরিক্ত পয়েন্ট সংগ্রহ করে অভিক আনোয়ার ও তার দল গালফ প্রো চ্যাম্পিয়নশিপে পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষস্থান অর্জন করেন। গালফ প্রো চ্যাম্পিয়নশিপ মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র ট্যুরিং কারের রেসিং প্রতিযোগিতা। এতে অংশ নেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রেসাররা। এই এন্ডিউরেন্স রেসে মোট ৯টি গাড়ি অংশ নেয় এবং ১২ থেকে ১৪ জন ড্রাইভার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অংশগ্রহণকারী ড্রাইভাররা এসেছিলেন রাশিয়া, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ভারত, জর্ডান, মিসর ও বাংলাদেশ থেকে।
অধিকাংশ গাড়িতে ছিল দুই ড্রাইভারের দল, আবার কিছু গাড়িতে ছিল একক ড্রাইভার দল। এই রেস অনুষ্ঠিত হয় দুবাই অটড্রোম সার্কিটে। রেসার ৫.৩৯ কিলোমিটার ল্যাপের রেসে অংশ নেন। প্রায় দুই ঘণ্টার রেসে মোট ৪৭টি ল্যাপ সম্পন্ন করেন রেসাররা; যা প্রায় ২৫০ কিলোমিটারের বেশি রেসিং দূরত্বের সমান। রেসের মোট দূরত্ব ছিল প্রায় একটি ফর্মুলা ওয়ান রেসের সমান। এ কারণেই প্রতিযোগিতাটি আরও কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে ওঠে। অভিক আনোয়ার বলেন, ‘এই এন্ডিউরেন্স রেস শুধু আমাদের রেসিং দক্ষতার প্রমাণই নয় বরং একটি বাংলাদেশি দল হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করার ঐতিহাসিক সাফল্য।’
বাংলাদেশের মোটর স্পোর্ট এখনও নবীন পর্যায়ে। সেই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিক আনোয়ারের এই সাফল্য শুধু একটি ট্রফি নয়, বরং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প। সামনে আরও বড় লিগ, আরও কঠিন চ্যালেঞ্জÑ আর লাল-সবুজের পতাকা তুলে ধরার আরও বড় স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন অভিক আনোয়ার।

গতিময় জীবন
১১ বছর বয়সেই গাড়ি চালানো শিখেছেন অভিক। আর রেসিং? টিভিতে নিয়মিত রেসিং দেখতেন। ফরমুলা ওয়ান ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে মাইকেল শুমাখার ও মিকা হ্যানিকেনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখে রেসিংয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় তার। এভাবেই ২০০৭ সালে রেসিংয়ের শুরু। ঢাকায় স্কলাস্টিকা স্কুলের পাঠ চুকিয়ে তখন তিনি কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক করছেন। তারপর প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করলেন অভিক। আর সেটা বেশ ব্যয়বহুল। টাকা জোগাড়ের জন্য তীব্র ঠান্ডায় পিৎজা ডেলিভারির কাজও করেছেন বলে জানান অভিক। নিজের মতো করেই অভিক শিখলেন রেসিং।
২০১৪ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে র্যালি ক্রস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিলেন। হলেন চ্যাম্পিয়ন। ২০১৫, ২০১৬-তেও চ্যাম্পিয়ন। তখন অভিকের মনে হলো, এবার বাইরে যাওয়া যাক। ভারত থেকে পরীক্ষা দিয়ে রেসার লাইসেন্স নিলেন। ২০১৭ সালে ভারতে প্রথম রেসে অংশ নিলেন অভিক। সেটা ছিল ইন্টারন্যাশনাল মোটর স্পোর্টসের আয়োজন। হলেন চতুর্থ। পরের দুই বছরে কোনো রেসিংয়েই তিনের মধ্যে পৌঁছাতে পারেননি অভিক। ২০১৯ সালে আবার এল সাফল্য। কীভাবে সম্ভব হলো? অভিক বলেন, ‘সেবার রেসিংয়ের আগে মোবাইল, ফেসবুকÑ সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করলাম। আসলে খুব গভীর মনোযোগের প্রয়োজন। কার রেসিংয়ে রিফ্লেক্স খুব গুরুত্বপূর্ণ।’