শাকিব হুসাইন
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:২৭ এএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
‘হা-হা হাচ্চো হা-হা হাচ্চো’ জোরেশোরেই হাচ্চি দিয়ে বসল রঙচঙয়ে গামছাটি। সবে তো গোসল সেরে রোদে এলো বলে। পাশের দড়িতে দুলছিল লম্বা হাতাওয়ালা চকচকে শার্টটি। বেশ ঘুমঘুম আয়েসে ছিল। গামছার হাচ্চিতে তড়াক করে উঠল জেগে। বিগড়ে গেল মেজাজখানাও।
লম্বা লম্বা হাত দুখানা দুলিয়ে দুলিয়ে বলল, তোমার বাপু রোদে এলেই হাচ্চি আর হাচ্চি। তা বলি কী, ছোট করেই তো দিতে পারো নাকি?
গামছাটাও কম না। রেগেমেগে বলল, তা ভেজো তো সপ্তায় দুয়েক দিন। আমার মতো প্রতিদিন ভিজে দেখো দিকিনি।
শার্টটা লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে রইল। বলল না একটা কথাও।
টুপ্পুদের উঠোনে ওরা রোদ মাখছিল। দুইটা দড়ি। একটাতে লম্বা হাতাওয়ালা শার্ট, নীলবুড়ো লুঙ্গি আর লালবুড়ি শাড়ি। আরেকটায় রঙচঙয়ে ওই গামছাটি, ছোট্ট হাতু টি-শার্ট। ওর হাত ছোট্ট ছোট্ট তো। আর বকবকানি রুমালটা।
এবার রুমালটা বকবকানি শুরু করল। কুট্টুস করে বলল, গামছা দাদার পিছু লাগতে এসো না বাপু। গামছা দাদার যে দিনে কত কাজ। সে খবর কি রাখো?
লালবুড়ি শাড়িটি মিহি স্বরে বলে উঠল, রাখি বাপু রাখি। আমি সবার খোঁজখবর রাখি। আমি তো...
‘থামো তো হে শাড়ি’, ঠুস করে কথা কেড়ে নিল ছোট্ট হাতু টি-শার্টটি।
‘হয়েছে বাপু হয়েছে। বয়স তো কম হলো না। সারাদিন তো এই কোণে ওই কোণে থাকো পড়ে। রঙচঙ তো সব যায় যায়। দিনকে দিন হচ্ছো তো বেহাল। মাঝেসাঝে আসো তো একটু রোদ নিতে। আর তুমি কিনা রাখো সবার খোঁজখবর! বলতে বলতে দমফাটা হাসি দিল গামছাটি। গামছার সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট হাতু টি-শার্ট আর বকবকানি রুমালটাও হো হো করে হেসেই পড়িমরি খায় বইকি।
নীলবুড়ো লুঙ্গি এতোক্ষণ চুপ ছিল। শাড়িকে নিয়ে মজা নিতে পারল না। ওদের তিনজনকে বলল, অমন করে হেসো না বাপু। বড়দের কথায় অমনে হাসতে হয় না।
লুঙ্গির কথায় সায় না দিয়ে আরো জোরে জোরে হাসতে লাগল ওরা। কেউ হা হা, কেউ হি হি তো কেউ হো হো করে।
হঠাৎ করে আকাশ হয়ে এলো কালো। রোদদের ঘিরে নিল দুষ্টু কালো মেঘেরা। টুপ্পুর মা তড়িঘড়ি করে এলো উঠোনে। পাঁজা করে নিয়ে গেল ঘরে ওদের। শুরু হলো বৃষ্টি। টিপটিপ থেকে টপটপ, টপটপ থেকে ঝমঝম...ঝমঝম বৃষ্টি। চলল টানা সপ্তাখানেক। তারপর দুষ্টু মেঘেরা চলল দলবলসমেত। রোদ উঠল। চনমনে রোদ। টুপ্পুর মা ওদের দড়িতে মেলে দিল। সবাই এলো। এলো না শুধু লালবুড়ি লাল শাড়িটি।
রোদে এসেই বকবকানি শুরু হলো রুমালের। ‘আহ্, কতদিন পর নরম রোদ মাখছি। তা সবাই দেখছি আছে। লালবুড়ি লাল শাড়ি এলো না যে! অভিমান করে বসল নাকি?’ টিপ্পনী কেটে রুমালটি বলল আর হি হি করে হাসল।
গামছাটি তখন বলল, অভিমান কি হে, দেখো গিয়ে কোন ভাগাড়ে পড়ে আছে। বয়স তো আর কম হলো না! পেকে তো থুরথুরে হলো বইকি। বলতে বলতে হো হো করে হেসে উঠল।
তক্ষুনি আবার এলো টুপ্পুর মা। হাতে মোটা লাল কাপড়। এ মা, না না, লালবুড়ি লাল শাড়িটি এলো যে। বেশ মুটিয়ে এসেছে তো। গায়ে কী সুন্দর সুন্দর ফুল, পাখি, নদী, চাঁদ, টুপ্পুর হাসিহাসি মুখ আঁকা।
বকবকানি রুমালটি বলল, তা অমন মুটিয়ে গেলে কী করে বাপু? ছিলে তো বেশ ফিনফিনে।
নীলবুড়ো লুঙ্গি হেসেই ফেলল। হেসে হেসে বলল, আরে বোকা, ও তো আর শাড়ি নেই রে। হয়েছে এক কাঁথা। নকশিকাঁথা। যার গায়ে থাকে গ্রামবাংলার রূপকথা। থাকে কত লোককথা।
লালবুড়ি লাল শাড়িটির মুখ তখন হাসির রেখায় ভরে উঠেছে। নকশিকাঁথা দেখে রঙচঙয়া গামছাটি হাঁ করে রইল। ছোট্ট হাতু টি-শার্ট ও বকবকানি রুমালটাও। একপানে তাকিয়ে রইল লালবুড়ির দিকে। না না, লালবুড়ি নকশিকাঁথার পানে...।