মাহবুবা মিতু
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৯ পিএম
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ইলেকট্রিক হিটারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শহুরে জীবনে, যেখানে গ্যাস বা কাঠের আগুন ব্যবহারের সুযোগ কম, সেখানে ইলেকট্রিক হিটারই সবচেয়ে প্রচলিত সমাধান। কিন্তু ভুল হিটার কিনলে বিদ্যুৎ বিল আকাশছোঁয়া হয়ে যায়, আবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও থাকে। তাই কেনার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভালোভাবে জেনে নেওয়া খুবই জরুরি। নিচে মূল ফিচারে হিটার কিনার আগে যা জানা জরুরি তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
হিটারের ধরন
আপনার প্রয়োজন এবং ঘরের আয়তন অনুযায়ী সঠিক প্রযুক্তির হিটার বেছে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানত তিন ধরনের হিটার জনপ্রিয়Ñ
ফ্যান হিটার : এতে একটি কয়েল গরম হয় এবং ফ্যানের সাহায্যে সেই গরম বাতাস সারা ঘরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি খুব দ্রুত ঘর গরম করতে পারে, তবে ফ্যানের শব্দ হতে পারে।
ইনফ্রারেড বা কোয়ার্টজ হিটার : এটি বাতাসের বদলে সরাসরি সামনে থাকা বস্তু বা ব্যক্তিকে গরম করে। ছোট ঘর বা নির্দিষ্ট জায়গায় বসে কাজ করার জন্য এটি সেরা।
অয়েল ফিল্ড হিটার : এর ভেতরে তেল থাকে, যা গরম হয়ে দীর্ঘক্ষণ তাপ ধরে রাখে। এটি বড় ঘরের জন্য উপযুক্ত এবং এতে অক্সিজেন কমে যাওয়ার ভয় থাকে না। তবে এটি ঘর গরম করতে কিছুটা সময় নেয়।
ওয়াটেজ ও ঘরের আয়তন
হিটার কত দ্রুত গরম করবে তা নির্ভর করে তার ওয়াটেজের ওপর। সাধারণ নিয়ম হলো প্রতি ১ বর্গফুট জায়গার জন্য ১০ ওয়াট শক্তির প্রয়োজন। অর্থাৎ আপনার ঘর যদি ১০০ বর্গফুটের হয়, তবে ১০০০ ওয়াটের হিটার যথেষ্ট। বেশি ওয়াটের হিটার মানেই বেশি বিদ্যুৎ খরচ, তাই ঘরের মাপ অনুযায়ী সঠিক ওয়াটেজ বেছে নিন।
গুরুত্বপূর্ণ ফিচার
হিটার ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’ উচিত একজন সচেতন ব্যবহারকারীর প্রথম ভাবনা। তাই কেনার সময় নিচের ফিচারগুলো আছে কি না দেখে নিনÑ
অটোকাট অফ : হিটার অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
টিপ-ওভার সুইচ : হিটারটি যদি কোনো কারণে উল্টে যায়, তবে দুর্ঘটনা এড়াতে এটি সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবেন।
কুল-টাচ বডি : হিটারের বাইরের অংশ যেন স্পর্শ করলে হাত পুড়ে না যায়, বিশেষ করে বাড়িতে শিশু বা পোষা প্রাণী থাকলে এটি খুব জরুরি।
থার্মোস্ট্যাট : হিটারে থার্মোস্ট্যাট আছে কি না যাচাই করুন। থার্মোস্ট্যাট থাকলে ঘর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পর হিটারটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাপমাত্রা কমলে আবার চালু হবে, যা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে।
অসিলেশন : যে ফিচার বিশিষ্ট হিটার ৬০–৯০° ঘুরে পুরো ঘরে গরম করবে।
রিমোট কন্ট্রোল : এ ফিচার বিছানা বা নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে হিটার নিয়ন্ত্রণ করার সুবিধা।
পোর্টেবলিটি : হিটারটি হালকা ওজনের এবং এক ঘর থেকে অন্য ঘরে নেওয়ার প্রয়োজন হলে চাকা বা হ্যান্ডেল আছে কি না দেখে নিন।
ওয়ারেন্টি : হিটার কিনার আগে অন্তত ১ বছরের ওয়ারেন্টি আছে কি না, তা কেনার আগে নিশ্চিত করুন।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব : কিছু হিটার ঘরের অক্সিজেন কমিয়ে দেয় বা আর্দ্রতা শোষণ করে নেয়, যা শ্বাসকষ্ট বা ত্বকের শুষ্কতার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ফ্যান হিটার বা হ্যালোজেন হিটারে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। যাদের অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্ট আছে, তাদের জন্য অয়েল-ফিল্ড রেডিয়েটর সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ এটি বাতাস শুকিয়ে ফেলে না।
শব্দ ও বহনযোগ্যতা : আপনি যদি শোবার ঘরে বা পড়ার ঘরে হিটার ব্যবহার করতে চান, তবে নিঃশব্দে কাজ করে এমন হিটার বেছে নিন।
বিদ্যুৎ খরচ : ইলেকট্রিক হিটারের বিদ্যুৎ খরচ গণনা করা সহজ, হিটারের ওয়াট × ব্যবহারের ঘণ্টা ÷ ১০০০ = কিলোওয়াট-ঘণ্টা। এই সংখ্যাকে ইউনিট বিদ্যুতের দাম দিয়ে গুণ করলে দৈনিক খরচ বের হবে। সাধারণত ১৫০০-২০০০ ওয়াট হিটার প্রতি ঘণ্টায় ১.৫-২ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
দাম ও ব্র্যান্ড : বাজারে বিভিন্ন দামের হিটার রয়েছে। সস্তা বা নিম্নমানের হিটার না কিনে একটু বেশি খরচ হলেও ভালো ব্র্যান্ডের এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ফিচারযুক্ত হিটার কেনাই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। সস্তা হিটারে নিরাপত্তা ফিচার কম থাকতে পারে বা গুণগত মান নিম্ন হতে পারে। নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ড যেমনÑ ওয়ালটন, ভিশন, ফিলিপস, হোমল্যান্ড, মিয়াকো, প্যানাসনিক, সিঙ্গার ইত্যাদি থেকে কেনা নিরাপদ।
ইলেকট্রিক হিটার কেনার সময় শুধু দাম বা ডিজাইন দেখে নয়, আপনার কক্ষের আকার, প্রয়োজনীয়তা, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য এবং শক্তি সাশ্রয়ের বিষয়টি প্রাধান্য দিন।