ভিয়েতনামের লোকগল্প
রূপান্তর : নিজাম বিশ্বাস
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৮ পিএম
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক, দশম শ্রেণি, ভিকারুননিসা, নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
এক দেশে বাস করত এক ধনী জমিদার। লোকটি ছিল পাজির পাজি। নানা ছলচাতুরী করে সে কাজের লোকদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। জমিদারের ছিল অপরূপ সুন্দরী এক কন্যা।
সেই জমিদারের বাড়িতে খোয়াই নামের এক ছেলে ছিল। দিনরাত সে কঠোর পরিশ্রম করত। দেখতে দেখতে ছেলেটিও কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিয়েছে। জমিদার তাকে নিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে থাকতÑ এমন পরিশ্রমী যুবক যদি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, তবে তার কী হবে। তাই একদিন সে খোয়াইকে ডেকে বলল,
‘তুমি যদি এভাবে কাজ করে যাও, তবে আমার মেয়েকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দেব।’
খোয়াই সরল মনে জমিদারের কথা বিশ্বাস করল। আনন্দে তার পরিশ্রম দ্বিগুণ হয়ে গেল। দেখতে দেখতে তিন বছর কেটে গেল। এদিকে জমিদারের মেয়েও বড় হয়েছে। একদিন পাশের গ্রামের এক প্রবল ধনী লোক জমিদারের মেয়েকে তার ছেলের বউ করার জন্য প্রস্তাব দিল। সেই প্রস্তাবে জমিদার রাজি হয়ে গেল। ঢোল-ঢাল বাজিয়ে শুরু হলো বিয়ের প্রস্তুতি।
খোয়াইকে জমিদার মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল। অথচ খোয়াই বুঝতে পারল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে জমিদারের কাছে গিয়ে সে বলল, ‘আপনার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি ভাঙছেন কেন?’
খোয়াইর এভাবে কথা বলা জমিদারের মোটেও ভালো লাগল না। জমিদার তার দিকে তেড়ে আসল। কিন্তু খোয়াইয়ের সুঠাম শরীর আর তেজদীপ্ত চোখের দিকে তাকিয়ে জমিদার থেমে গেল। তারপর কাঁচুমাচু করে বলল,
‘তুমি ভুল বুঝছ। এ তো তোমারই বিয়ের আয়োজন। তবে শর্ত আছে তোমাকে একশ গাঁটওয়ালা একটি বাঁশ খুঁজে আনতে হবে। আর সেই বাঁশ কেটে বিয়ের ভোজের জন্য চপস্টিক বানাতে হবে। তবেই আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দেব।’
খোয়াই সরল মনে আবারও দুষ্ট জমিদারের কথা বিশ্বাস করল। শর্ত পূরণ করার জন্য সে জঙ্গলে গেল। এক দিন, দুদিন, তিন দিন কেটে গেল। এক বন থেকে আরেক বন সে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াল। কিন্তু কোথাও একশ গাঁটের বাঁশ পেল না। হতাশায় জঙ্গলের ভেতর এক জায়গায় সে বসে পড়ল। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ল।
হঠাৎ সে দেখল, এক বৃদ্ধ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাথাভর্তি সাদা চুল, মুখে গোলাপি আভা, চোখে দারুণ মায়া। বৃদ্ধ বললেন, ‘তোমার এত দুঃখ কিসের?’
খোয়াইর মুখে সব কথা শুনে বৃদ্ধ বললেন, ‘যাও, বাঁশের একশটি গাঁট কেটে এনে এখানে রাখো।’
খোয়াই তাই করল। বাঁশের টুকরোগুলো এনে মাটিতে ছড়িয়ে রাখল। বৃদ্ধ টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘জোড়া লাগো! জোড়া লাগো!’
মুহূর্তের মধ্যেই বাঁশের টুকরোগুলো একে অপরের সঙ্গে জুড়ে একশ গাঁটের একটি বাঁশে পরিণত হলো। খোয়াই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। কৃতজ্ঞতা জানাতে যেই না সে বৃদ্ধের দিকে ঘুরে তাকাল, দেখল বৃদ্ধটি নেই। সে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তখন সে বুঝতে পারল, এ স্বয়ং বুদ্ধ ছিলেন।
সেই বাঁশ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে খোয়াই পড়ল আরেক বিপদে। এত লম্বা বাঁশ কাঁধে নেওয়া যায় না। বারবার গাছের সঙ্গে আটকে যায়। আবার সে মাটিতে বসে কাঁদতে শুরু করল। বুদ্ধ এবারও আবির্ভূত হয়ে জানতে চাইল, ‘কাঁদছ কেন?
এত্ত বড় বাঁশ কাঁধে নিয়ে যাওয়া যায় না শুনে বুদ্ধ বললেন, ‘খুলে যাও! খুলে যাও!’
অমনি বাঁশটি আবার একশ টুকরো হয়ে গেল। বুদ্ধ অদৃশ্য হয়ে গেলেন। খোয়াই বাঁশের টুকরোগুলো বেঁধে বাড়ির দিকে রওনা দিল। বাড়িতে এসে দেখে দুই পরিবারের লোকজন বিয়ের খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত। পাশের গ্রামের ধনী লোকটির পরিবার এসেছে বরযাত্রী নিয়ে। খোয়াই ছুটে গেল জমিদারের কাছে। জমিদার বলল,
‘আমি তো বলেছিলাম একশ গাঁটের বাঁশ আনতে, একশটা বাঁশের টুকরো নয়!’
এ কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। তাকে নিয়ে চলল ঠাট্টা-মশকরা। খোয়াই শান্ত গলায় বলল,
‘বাঁশ আছে। উঠোনে এসে দেখ।’
জমিদার বাঁশের কাছে যেতেই খোয়াই ফিসফিস করে বলল,
‘জোড়া লাগো! জোড়া লাগো!’
মুহূর্তে বাঁশের টুকরোগুলো একে অপরের সঙ্গে জুড়ে গেল। আর বাঁশের এক প্রান্তে জমিদার আটকে গেল। সে ছুটতে চাইল, কিন্তু পারল না। ধনী লোকটি তাকে ছাড়াতে এগিয়ে এলো। সে বাশ ছোঁয়ামাত্রই খোয়াই আবার বলল,
‘জোড়া লাগো! জোড়া লাগো!’
এবার ধনী লোকটিও আটকে গেল বাঁশের সঙ্গে। তার ছেলে এগিয়ে এলো। সেও আটকে গেল। অন্যরা তাদের টেনেহিঁচড়ে যত ছাড়াতে চাইল, ততই তারা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। বিয়ের আসরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কেউ আর হাসল না। সবাই মিলে এবার খোয়াইয়ের কাছে ক্ষমা চাইল।
খোয়াই শর্ত দিল, জমিদারের মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে, তাহলে সবাই মুক্তি পাবে। জমিদার রাজি হলো। খোয়াই তখন বলল, ‘খুলে যাও! খুলে যাও!’
বাশের গাঁট থেকে মুক্ত হয়ে ধনী লোক ও তার ছেলে দৌড়ে পালাল। তারপর খোয়াই বসল বরের পিঁড়িতে।