× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হোম মেইড কলার চিপসে আত্মনির্ভরতার গল্প

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:০৩ পিএম

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:০৭ পিএম

হোম মেইড কলার চিপসে আত্মনির্ভরতার গল্প

খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদে সকাল নামে এক ভিন্ন আবহে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে নীড়ে ফেরা পাখির কিচিরমিচির, কুয়াশার চাদরে ঢাকা সবুজ পাহাড় আর বাতাসে ভেসে আসা কাঁচা কলার ঘ্রাণ, এই প্রকৃতির মাঝেই জন্ম নেয় অনেক না বলা গল্প। তেমনই এক অনুপ্রেরণার গল্প লিখে চলেছেন পাহাড়ের এক সংগ্রামী নারী, উদ্যোক্তা লাকী চাকমা।

খাগড়াছড়ি জেলা সদরের কলেজপাড়া এলাকার সাধারণ একতলা ঘরের ছাদে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু কলার চিপস তৈরি করছেন না, গড়ে তুলছেন আত্মনির্ভরতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পাহাড়ের সহজলভ্য কাঁচা কলাকে পুঁজি করে হোম মেইড কলার চিপসের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন স্থানীয় নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক। 

ছাদের রান্নাঘরেই স্বপ্নের কারখানা

সম্প্রতি খাগড়াছড়ি শহরের কলেজপাড়া এলাকার তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য। একতলা ঘরের ছাদে বসানো হয়েছে চুলা। চুলার ওপর হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটছে তেল। একের পর এক তেলের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে পাতলা করে কাটা, মসলা মাখানো কাঁচা কলার টুকরো। কিছুক্ষণ পরই সোনালি রঙের ঝরঝরে চিপস উঠে আসছে হাঁড়ি থেকে।

চিপস তৈরিতে ব্যস্ত এই নারীর নাম লাকী চাকমা (৩৫)। চাকরির পাশাপাশি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজ উদ্যোগে এভাবেই কলার চিপস তৈরি করে আসছেন তিনি। ঘরের ছাদ আর ছোট একটি রান্নাঘরই এখন তার উৎপাদন কেন্দ্র। তিনি চাকরির ফাঁকে ছুটির দিনগুলোতে এই ঘরের ছাদে এই কলার চিপস তৈরি করেন। 

এই কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন দুজন নারী কর্মচারী। কেউ ভাজা চিপস বয়ামে ভরছেন, কেউ আবার কাঁচা কলা পাতলা করে কেটে দিচ্ছেন। উৎপাদন বেশি হলে বাড়তি কর্মচারীও রাখতে হয়। বর্তমানে প্রায় সময় চারজন কর্মচারী প্রয়োজন হয়। এই ছাদের ছোট পরিসরই আজ অনেকের জীবিকার অবলম্বন।

ছোট ঘর, বড় স্বপ্ন

২০২৪ সালের মে মাস। হাতে বড় কোনো পুঁজি ছিল না। আধুনিক কোনো কারখানা ছিল না। ছিল শুধু পাহাড়ে সহজলভ্য কাঁচা কালা আর নিজেকে প্রমাণ করার অদম্য ইচ্ছা। লাকী চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে সারা বছর কলা পাওয়া যায়। বাংলা কলা বা কাঁঠালি কলা খুবই সুস্বাদু। আমি ভেবেছি, এই কলাকে যদি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, তাহলে অবশ্যই গ্রহণযোগ্যতা পাবে। সেই বিশ্বাস থেকেই কাজ শুরু করি।’

শুরুর দিকে একাই সব কাজ করতেন তিনি, কলা সংগ্রহ, খোসা ছাড়ানো, ভাজা, মসলা মেশানো থেকে শুরু করে প্যাকেটজাতকরণ। ধীরে ধীরে তার পরিশ্রম আর মানের স্বীকৃতি পেতে শুরু করে।

ঘরোয়া উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান

আজ লাকী চাকমার হোম মেইড কলার চিপসের উদ্যোগে নিয়মিত তিনজন শ্রমিক কাজ করছেন। উৎপাদন বাড়লে অস্থায়ীভাবে আরও লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। একটি ছোট রান্নাঘর ও বাড়ির ছাদে তৈরি অস্থায়ী রান্নাঘর এখন হয়ে উঠেছে স্থানীয় কর্মসংস্থানের একটি কেন্দ্র।

বর্তমানে এই উদ্যোগ থেকে তার মাসিক আয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এই আয় শুধু তাকে স্বাবলম্বী করেনি, বরং তার পরিবার ও আশপাশের অনেক মানুষের জীবনেও এনে দিয়েছে স্বস্তি ও আশার আলো। সরেজমিনে কথা হয় এখানে কর্মরত পূর্ণিমা ও সুবর্ণাদের সঙ্গে। তারা জানান, কলেজপড়ুয়া মেয়েরাও ছুটির সময় মায়ের সঙ্গে কাজে যোগ দেন। দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান তারা। পাশাপাশি উদ্যোক্তা লাকী চাকমা সকাল ও দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও করে দেন।

সুবর্ণা দে বলেন, এখানে কাজ করে দৈনিক মজুরি পাই। এতে সংসার মোটামুটি চলে যায়।

স্বাদ, স্বাস্থ্য আর বিশ্বাসের মেলবন্ধন

লাকী চাকমার কলার চিপসের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে এর প্রস্তুত প্রণালীর কারণে। কাঁচা কলা প্রথমে হলুদ মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়, যাতে আঠা দূর হয়। এরপর ফ্রেশ তেলে ভেজে তেল ঝরিয়ে নিজস্বভাবে তৈরি ছয় ধরনের মসলা ও হালকা মরিচ মিশিয়ে প্যাকেটজাত করা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর মানের দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। এটা হোম মেইডÑ এই বিশ্বাসটাই যেন ক্রেতারা পান।’

এই যত্ন, আন্তরিকতা আর স্বচ্ছতাই তার পণ্যে এনে দিয়েছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা।

অনলাইন-অফলাইনে ছড়াচ্ছে সুখ্যাতি

খাগড়াছড়ির গণ্ডি পেরিয়ে উদ্যোক্তা লাকী চাকমার কলার চিপস এখন পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। অনলাইনে অর্ডার নেওয়ার পাশাপাশি অফলাইনে অনেক ক্রেতাই সরাসরি এসে কিনে নিচ্ছেন। নিয়মিত ক্রেতা লাকি চাকমা বলেন, এই চিপসের স্বাদ একেবারেই ঘরোয়া। বাজারের চিপসের চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। আরেক ক্রেতা বলেন, অনলাইনে অর্ডার দিলে সময়মতো ডেলিভারি পাই। প্যাকিংও খুব সুন্দর।

নারীর ক্ষমতায়নে বাস্তব উদাহরণ

খাগড়াছড়ি জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সুষ্মিতা খিসা উদ্যোক্তা লাকী চাকমার উদ্যোগকে নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, ‘লাকী চাকমার মতো নারীরা প্রমাণ করছেন, ঘরে বসেই স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। হোম মেইড ফুড প্রসেসিং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’

সামনে এগোনোর স্বপ্ন

এখানেই থেমে থাকতে চান না উদ্যোক্তা লাকী চাকমা। তার স্বপ্ন আরও বড়, উৎপাদন বাড়ানো, আধুনিক প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং আরও মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা।

তিনি বলেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণ পেলে এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিতে পারব। তখন এখানে আরও অনেক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা