জুয়েল সাহা বিকাশ, ভোলা
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫৯ পিএম
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:০৬ পিএম
নদী ভাঙনে সব হারিয়ে কাঞ্চন মুন্সি পরিবার নিয়ে তেরপালের ঝুপড়িতে
‘স্যার আগে আমার সুন্দর বসতঘর আছিল। ফসলি জমি আছিল। সংসারের কোনো অভাব আছিল না। কোনো সময় ভাবি নাই এমন কইরা স্ত্রী, সন্তান ও ছেলে বউ-নাতী লইয়া নদীর পারে তেলপালের ঘরে মাটিতে ঘুমাইতে হইবো’ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পরেন কাঞ্চন মুন্সি। তিনি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন সাগর মোহনার ঢালচর ইউনিয়নের ভদ্রপাড়া এলাকার মেঘনা নদীর তীরে বসবাস করেন। বাঁশের কঞ্চি ও তেরপল দিয়ে ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে স্ত্রী, তিন সন্তান ও এক ছেলে বউ ও নাতি নিয়ে বসবাস করছেন।
কাঞ্চন মুন্সি জানান, তিনি চার সন্তানের জনক। এক মেয়ে ও তিন ছেলে তার। আগে তার ভালো বসতঘর, ফসলি জমি ছিল। কিন্তু মেঘনা নদী তার বসতভিটা, ফসলি জমি নিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ৪ বার ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন তিনি। গত ১০ দিন আগে তিনি মেঘনা নদীর পাশে সন্তানদের নিয়ে ওই আশ্রয়টি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। নদীভাঙনের কারণে দেনায় জর্জড়িত তিনি। বর্তমানের দুই সন্তান নিয়ে সাগর মোহনার মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে কোনোরকম খেয়ে বেঁচে আছেন।
তিনি আরও জানান, কোনো জমিজমা নাই। টাকাও নাই। তাই বাধ্য হয়ে বাঁশ কাইটা কঞ্চি দিয়া ও তেরপল দিয়া কোনো রকম তাঁবুর মতো ঘর নির্মাণ করাই থাকতেছি। প্রচণ্ড শীতে মাটিতে ঘুমাতে হয় আমাগোরে। কি করমু আমাগো গরিবের তো আর কোনো জায়গা নাই। এহন যেখানে থাকতেছি এইডা আবার পরের জমি। উডাই দিলে কই যামু জানি না। সরকার যদি আমারে একটু জমি দিতো তাইলে ধার-দেনা ও ঋণ নিয়া ঘর উঠাইয়া থাকতে পারতাম।

তার স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, নদী আমাগো জমি, ঘর সব নেওয়ার পর থেকে কয়েকবার ঋণ কইরা আমার স্বামী অন্য জমিতে ঘর তুলছিল। তাও আবার নদী নিয়ে গেছে। এখন তো আমরা নিঃস্ব। কি আর করমু। এহন শীতের মধ্যে মাটিতে ঘুমাতে হয়। সরকার তো আমাগো দিকে চায় না।
কাঞ্চন মুন্সির ছেলে বউ শিরিনা বেগম বলেন, বাবা-মা শ্বশুড়ের জমি-জমা ও সুন্দর ঘর দেইখা বিয়ে দিছে। এখন তো সব নদীতে লইয়া গেছে। আমরা এহন নদীর পারে তেরপালের তাঁবুর মতো ঘরে থাকি। শীতের মধ্যে মাটিতে ঘুমাই। ছোট একটা অবুঝ শিশু নিয়ে ঘুমাইতে হয়। সবাই এক সঙ্গে থাকি।
অন্যদিকে সব হারিয়ে ঢালচর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তি নগর এলাকার বন বিভাগের বাগানে ঝুঁকি নিয়ে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন জেলে মো. হুমায়ুন কবীর। তিনি জানান, এই পর্যন্ত মেঘনা নদীর ৮-১০ বার ভাঙনের কবলে পড়েছেন। বাবা-দাদার জমি, বসতঘর ও নিজের জমানো টাকাÑ সবই হারিয়েছেন মেঘনা নদীর ভাঙনের কারণে। তাই জমি কেনার টাকা না থাকায় বন বিভাগের বাগানের এক ফাঁকে টিন, বাঁশ ও তেরপালের বেড়া দিয়ে ঝুঁপড়ি ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। শীতে কষ্ট পাচ্ছেন। বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় ঘরে পানি ঢুকে সব ভিজে যায়। তিনি আরও জানান, বন বিভাগের বাগানে বসবাস করায় রাতের বেলায় সাপ, বন্যপ্রাণীর আতঙ্কে থাকতে হয়। এ ছাড়া বন বিভাগ প্রতিদিনই তাদের এখান থেকে উঠে যেতে বলে। ঢালচর ইউনিয়নের সরকারি খাসজমি আছে কিন্তু আজ পর্যন্ত কাউকে বন্দোবস্ত দেয়নি। যার কারণে জমিগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। অথচ আমরা গরিবরা জমির অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। তাই সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন সরকারি জমি আমাদের বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য।
স্থানীয় মো. শাহে আলম ফরাজী ও ইউসুফ শিকার জানান, ঢালচর ইউনিয়নের হাজার হাজার সরকারি খাসজমি পরিত্যক্ত পড়ে থাকলেও ভূমিহীনদের মাঝে দেওয়া হচ্ছে না। আর জমির অভাবে ভূমিহীনরা সব হারিয়ে কারও আশ্রয় হয়েছে রাস্তার পাশে, কারও নদীর তীরে, আবার কারও আশ্রয় হয়েছে বন বিভাগের বাগানে। তেরপল ও বাঁশ দিয়ে কেউ মাথার গোঁজার আশ্রয় করেছেন, কেউবা বাঁশ ও টিন দিয়ে কোনোরকম ঘর তুলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাও প্রতিদিনই তাদের সরে যেতে বলা হচ্ছে। চরম জীবন ঝুঁকি নিয়ে মানুষ বছরের পর বছর বসবাস করছে। কিন্তু কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।
তারা আরও জানান, ঢালচর ইউনিয়নের বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই ভূমিহীন। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ করছি ঢালচরের ভূমিহীন মানুষের মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য।
ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানান, ঢালচরের ভূমিহীন মানুষ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাসজমি পাওয়ার জন্য আবেদন করলে তা যাচাই-বাছাই করা হবে। যাচাই-বাছাইতে যারা খাসজমি পাওয়ার যোগ্য হবে আমরা তাদের মাঝে খাসজমি বন্দোবস্ত দিব।