রওনক জাহান পুষ্প
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৯ পিএম
ছবি - হেনা বাই মনি
মেহেদি পরা আমাদের অনেকেরই খুব প্রিয় শখের একটি। ভিন্ন ভিন্ন নকশায় টুকটুকে করে হাত রাঙানো, তাও কোনো সাইড-এফেক্ট ছাড়া, কে না পছন্দ করবে! এ ছাড়া আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে বেশ অনেক দিন ধরেই জড়িয়ে আছে মেহেদি। ঈদের আগে মেহেদি গাছের পাতা বেটে হাতে গোল করে দেওয়া, আঙুলে বা নখে দেওয়া, হলুদের রাতে ঘটা করে বিয়ের কনেকে মেহেদি পরানো আর সঙ্গে কচি কাঁচাদের আবদার, যে তাদেরও কনের মতো পরিয়ে দিতে হবে! সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেহেদি পরায়ও পরিবর্তন এসেছে। বাটা মেহেদির জায়গা দখল করে নিয়েছে টিউব আর কোণ মেহেদি। বিশেষ করে সূক্ষ্ম নকশা করা যায় বলে কোণ মেহেদিই সবার বেশি পছন্দ।
তারই সঙ্গে রয়েছেন মেহেদি আর্টিস্টরা। একসময় বাসায় কে ভালো মেহেদি দিতে পারে, তার কাছে সবাই ছোটাছুটি করত, একজনের কাছে লাইনও পড়ে যেত বিশাল। কিন্তু এখন প্রফেশনাল মেহেদি আর্টিস্টরা যেমন তাদের ট্যালেন্ট কাজে লাগাতে পারছেন, একই সঙ্গে আপনি পেয়ে যাচ্ছেন দক্ষ হাতের করা নিজের পছন্দমতো ডিজাইন।
বাজারে বিভিন্ন ধরনের মেহেদি পাওয়া গেলেও একটু ভালো মানের প্রিমিয়াম ও নিরাপদ মেহেদি যারা পছন্দ করেন, অর্গানিক মেহেদি তাদের চাহিদার শীর্ষে। শুকনো মেহেদি পাতার গুঁড়োর সঙ্গে অল্প কিছু অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে বানানো হয় অর্গানিক মেহেদি। সাধারণত মেহেদি আর্টিস্টরা নিজেরাই নিজেদের অর্গানিক মেহেদি কোণ বানান এবং সেগুলো দিয়েই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ ছাড়া বাজারে বিভিন্ন দামের কোণ মেহেদি পাওয়া যায়।
মেহেদি আর্টিস্টরাও শুধু মেহেদি আর্টিস্ট নন, তারা একই সঙ্গে ডিজাইনার, প্ল্যানার এবং সেই প্ল্যানকে বাস্তবে রূপ দিয়ে থাকেন। হাতে করা মেহেদিতে সামান্য একটু ভুলও পুরো ডিজাইন নষ্ট করে দিতে পারে। তাই তাদের ধৈর্য, চোখের মাপ আর হাতের ওপর কন্ট্রোল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
কেমন ডিজাইন জনপ্রিয়
মেহেদি ডিজাইনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ডিজাইন। ডিজাইন অনুযায়ী মেহেদি হাতে ফুটে ওঠে ও রঙ ধরে। চিকন ডিজাইন যেমন সূক্ষ্ম কিন্তু গাঢ় লাল রঙ হয়, একটু ঘন ডিজাইনের মেহেদি হয় খয়েরি ধাঁচের রঙ। এ ছাড়াও হাত ও পছন্দ অনুযায়ী মেহেদির ডিজাইনও চেঞ্জ হয়।
‘হেনা বাই মনি’ ফেসবুকে মেহেদি আর্ট ও অর্গানিক মেহেদি কোণের পেজ হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। এর ফাউন্ডার ও মেহেদি আর্টিস্ট দেওয়ান মনি জানান, কাস্টমাররা এখন কিছুটা আরবীয় ধাঁচের ডিজাইনের পাশাপাশি পাকিস্তানি ও ফ্লোরাল ধাঁচের ডিজাইনও বেশ পছন্দ করছেন। বিয়ের কনেরা মূলত হাতভর্তি ব্রাইডাল ডিজাইনই করেন। ঈদ বা অন্যান্য উৎসবে হালকা ডিজাইন যেমন মান্ডালা, স্ট্রিং টাইপের হালকা ডিজাইন, নন-ব্রাইডাল চাঁদ তারা এসব চলে। এ ছাড়া এখন শুধু ঈদই নয়, বেবি শাওয়ার অথবা অন্য কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানেও অনেকে মেহেদি পরতে পছন্দ করেন। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় মেহেদি নিয়ে কাজ করছেন মনি। কোভিডের সময় থেকে মেহেদি বানানো ও মেহেদি আর্টের সঙ্গে আছেন তিনি। স্টুডেন্ট অবস্থায় হাতখরচ বাড়ানোর জন্য শুরু করলেও এখনও বেশ ভালোই সাড়া পাচ্ছেন।
‘হেনা বাই আয়েশা’-এর ফাউন্ডার ও মেহেদি আর্টিস্ট আয়েশা সিরাজ জানান, মেহেদির ডিজাইন যতটা ইন্ট্রিকেট আর চিকন হয়, কাস্টমার তত পছন্দ করেন। মেহেদির ডিজাইনের সূক্ষ্মতা আসলে অর্গানিক মেহেদির কোয়ালিটি ও কোণের ওপর নির্ভর করে। এজন্যই বেশিরভাগ মেহেদি আর্টিস্টরা নিজেদের বানানো কোণ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। আয়েশা জানান, বিয়ের প্রোগ্রামে পালকি, ময়ূর, হাত ভরা ইন্ট্রিকেট ডিজাইন এ রকম রাজকীয় ও ঘন ডিজাইন বেশি চলে। আবার ঈদ উপলক্ষে চাঁদ তারা ধরনের ডিজাইন বেশি চলে। কখনও কখনও স্পেশাল কোনো উপলক্ষ থাকলে সে অনুযায়ীও ডিজাইন হয়। মূলত ছোট, টিনএজার ও তরুণী বয়সিরাই মেহেদি পরতে বেশি আগ্রহী থাকেন, সময় কম থাকলে হালকা ডিজাইনেও তারা খুশি থাকেন। আয়েশা ছোটবেলা থেকে টুকটাক মেহেদি ডিজাইন ও প্র্যাকটিস করে থাকলেও প্রফেশনালি এই কাজ শুরু করেছেন ২০২১ থেকে।
রঙ গাঢ় করার উপায়
অর্গানিক মেহেদি আসলে কেমিক্যাল মেহেদির মতো নয়, রঙ আনার জন্য এতে এক্সট্রা কোনো কেমিক্যাল বা ক্ষতিকর জিনিস ব্যবহার করা হয় না। তাই সে রকম কুচকুচে কালো রঙও পাওয়া যায় না। অর্গানিক মেহেদি সম্পূর্ণ ন্যাচারাল গাঢ় খয়েরি রঙ দিতে পারে, তবে এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে মেহেদির কোয়ালিটি, প্রি কেয়ার ও আফটার কেয়ারের ওপর।
হাতে আগে থেকেই কিছু দেওয়া থাকলে মেহেদির রঙ বসে না। তাই মেহেদি পরার আগে হাতে কোনো লোশন, ক্রিম বা অন্য কিছু লাগানো থাকলে সেটাকে ভালোভাবে মুছে শুকিয়ে নিয়ে তারপর মেহেদি পরা শুরু করতে হয়। অর্গানিক মেহেদিতে ভালো রঙ পাওয়ার জন্য হাতে যতক্ষণ সম্ভব মেহেদি রাখা ভালো।
আয়েশা সিরাজ জানান, মেহেদি শুকানোর পর যদি চিনি, পানি আর লেবুর রসের মিশ্রণ দিয়ে মেহেদি হাতে রাখা যায়, তাহলে শুকিয়ে ঝরে যায় না এবং রঙ ভালো হয়। এ ছাড়া আরেকটি ভালো উপায় হচ্ছে মেহেদি শুকানোর পর সুতি কাপড় বা টেপ দিয়ে হাত পেঁচিয়ে রাখা। সবচেয়ে ভালো রেজাল্টের জন্য রাতের বেলা মেহেদি দিয়ে শুকিয়ে সিল করে ঘুমালে অনেকক্ষণ ধরে হাতে মেহেদি থাকে ও রঙও ভালো হয়।
দেওয়ান মনি জানান, মেহেদির রঙ অনেকটাই শরীরের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকায় মেহেদি আশানুরূপ রঙ নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে একটা ভালো উপায় হচ্ছে লবঙ্গ ভাপ দিয়ে সেঁক নেওয়া। একটা তাওয়ায় কয়েকটা লবঙ্গ সেঁকে গরম করে সেগুলো একটা পুঁটলি করে সেঁক নিলে রঙ ভালো হয় ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
কাদের কাছে পাবেন
এখন বিভিন্ন পার্লারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে নিজেদের বিজনেস পেজ থেকেও কাজ করেন মেহেদি আর্টিস্টরা। এদের মধ্যে জনপ্রিয় হেনা আর্টিস্ট্রি, হেনা বাই আয়েশা, হেনা বাই মনি। সাধারণত মেহেদি আর্টিস্টরা নিজেরাই ফ্রেশ অর্গানিক মেহেদি কোণ বানিয়ে বিক্রি করেন ও সেই কোণই নিজেরাও ইউজ করেন। বিভিন্ন উপলক্ষে ডিজাইন অনুযায়ী মেহেদি আর্টের প্রাইস ধরা হয়। ব্রাইডাল যেমন বেশ বিগ বাজেটের হয়, আবার চাইলে হালকা কিন্তু বড় ডিজাইনে বাজেট ফ্রেন্ডলি ব্রাইডাল মেহেদিও পরা যায়।