শাকেরা বেগম শিমু
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:০০ পিএম
পৃথিবী বিচিত্রময় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। এ ধরণীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে কত নয়নাভিরাম দৃশ্য। যে সৌন্দর্য দেখলে চোখ-মন জুড়িয়ে যায়। সেজন্য আমরা মানুষ প্রতিনিয়তই সুযোগ পেলে চলে যাই দূরে সুন্দর কোথাও ভ্রমণ করতে। এতে যেমন মনের একঘেয়েমি ভাব দূর হয়, তেমনি নতুন জায়গার পরিবেশ ও প্রকৃতি দর্শনে নতুন অভিজ্ঞতা এবং আনন্দ লাভ হয়।
মনের কালিমা সব মুছে গিয়ে মন প্রফুল্ল ও চনমনে হয়ে ওঠে। সেজন্যই আমরা সবাই মিলে এক দিন মনস্থির করলাম যে, আমরা ‘ওহাইও’ স্টেটে বেড়াতে যাব। আমরা থাকি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট বা অঙ্গরাজ্যে, যেটা একেবারে কানাডার বর্ডারের পাশে অবস্থিত। আর এর অপর পাশেই রয়েছে ‘ওহাইও’ অঙ্গরাজ্য। যেখানে বেড়াতে যাব বলে ঠিক করেছি। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ। আমরা সবাই চলে গেলাম দূরে ওহাইও অঙ্গরাজ্যে বেড়াতে।
যাওয়ার দিন : আমরা সবাই চলতি বছরের জুন মাসে ওহাইও যাওয়ার জন্য দিন ঠিক করি। সেদিন ছিল শনিবার। তাই অফ ডে হওয়ায় আমাদের অনেকটা সুবিধাই হয়েছিল। সেদিন আমরা সবাই সকাল ১০টায় ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। ততক্ষণে বড় আপা ও দুলাভাই ওরাও এসে গেছেন তিন পিচ্চি ইউসুফ, ইয়ামিন ও মারইয়ামকে নিয়ে। ওরাও খুব উৎফুল্ল ছিল যাওয়ার জন্য। আমরা সবাই নিজেদের গাড়িতে উঠে পড়লাম ওহাইও যাওয়ার উদ্দেশ্যে। আমি বরাবরই জানালার পাশে সিট নিই। গাড়িতে ড্রাইভিং সিটে ছিল আমার ছোট ভাই সাদী। আমার ছোট হলেও ভাইদের মধ্যে সেই ছিল অগ্রজ হাওয়ার গতিতে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি।
চল্লিশ মিনিটের মতো ড্রাইভ করার পর আমরা শহর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম গ্রামাঞ্চলে। মানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামাঞ্চল আর কী। এখানে আমাদের দেশের মতো দরিদ্র এলাকা না, বরং সে গ্রামাঞ্চলগুলোও অনেক আধুনিক ছিল। তবে শহরের মতো আকাশচুম্বী দালান আর বিল্ডিং অফিস কোম্পানি এসব নেই। সেখানে ছিল স্নিগ্ধ প্রকৃতির ছোঁয়া।

যেতে যেতে পথের দুপাশে আমরা প্রকৃতির সৌন্দর্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিপাটি পরিবেশ উপভোগ করতে লাগলাম। রাস্তার দুপাশে বেশিরভাগই ছিল ধান ও ভুট্টাক্ষেত। আছে গমক্ষেত, আপেল বাগান, নাশপাতি বাগান, ক্রিসমাস ট্রির সারি ইত্যাদি। মেশিন দিয়ে ধান ও ভুট্টার গাছগুলো এমন সমানতালে কাটা হয়েছে, দেখে যেন মনে হচ্ছে প্রকৃতি কোনো সবুজ রঙের সিঁড়ি তৈরি করে রেখেছে তার নিজ হাতে। সড়কের দুপাশে আরও কিছু গাড়ি, জিপ, ট্রাক, লরি ইত্যাদি একটু পরপর নিজেদের মতো আসা-যাওয়া করছে। এখানে আছে বিশুদ্ধ নির্মল পরিবেশ, দখিনা বাতাস আর একটু পরপর বিশাল ভুট্টা বা ধানক্ষেত। এই ধান ও ভুট্টাই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান খাদ্যশস্য, তাই এখানে এসবের চাষও হয় সবচেয়ে বেশি। যেতে যেতে দূরে কিছু জলাশয় চোখে পড়ল, যেগুলোর পানি ছিল নির্মল, স্বচ্ছ ও টলমলে। সে জলে ফুটে রয়েছে বিভিন্ন জলজ ফুল। পানি এতই পরিষ্কার যে, এর নিচের বালু পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আরও আধাঘণ্টা ড্রাইভ করার পর আমরা চলে এলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য ওহাইওর মেট্রোপার্কে!
পৌঁছে যাওয়ার পর : আমরা মেট্রোপার্কে পৌঁছে যাওয়ার পর একটা ভালো জায়গা দেখে আমাদের গাড়িগুলো পার্কিং করে রাখি। তারপর সবাই গাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাবার, বসার জন্য বড় চাদর, মিনারেল ওয়াটারÑ এসব কিছু নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলাম।
বেরিয়ে দেখি কী এক অপরূপ সৌন্দর্যের বাহার, সবুজ প্রকৃতি, ক্রিসমাস গাছের সারি, নানা রঙের ফুলের গাছ; যেগুলোতে ফুল ফুটে রয়েছে। সেখানে রয়েছে গোলাপ, রুয়েলিয়া, পর্তুলিকা, রক্তজবা, রঙ্গন, গ্লাডিওলাস ও নাম না জানা আরও বিভিন্ন ফুল। নিচে ঘাস কাটার মেশিন দিয়ে ঘন সবুজ ঘাসের গালিচা বিছানো মনে হচ্ছিল যেন সেখানেই একটু শুয়ে পড়ি। পার্কের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদীর ধারা। কোথা থেকে যে এর আগমন তা কেউ জানে না। তা শুধু বয়ে চলছে তো চলছেই যেন এর কোনো শেষ নেই। সাদীকে জিজ্ঞেস করলাম কিরে এই সুন্দর নয়নাভিরাম পার্কের নামটা কী? সাদী জানাল এটা হচ্ছে : ‘ওয়াইল্ডউড প্রিজার্ব মেট্রোপার্ক!’ ওহাইওর সবচেয়ে সুন্দর পার্কগুলোর অন্যতম এটি। এতে কী নেই বলো! শতবর্ষী গাছগাছড়া, যেগুলো দাঁড়িয়ে আছে প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি থেকে, পাহাড়ি নদী, বিশাল সবুজ মাঠ দেখলে মনে হবে যেন তেপান্তর, ঝিলভর্তি শাপলার ফুল, আরও অজস্র রকমের ও রঙের বিদেশি ফুলের বাগান। স্থানে স্থানে ঝিলের ওপর লাগোয়া ওয়াটার ফলস, যেখানে রংধনু এসে ধরা দেয়, আপেল, নাশপাতিসহ হরেক রকম ফলের গাছ, যেখানে হাত দিয়ে ফল পেরে খাওয়া যায়। এটা যতটা না খাওয়ার এর চেয়ে বেশি আনন্দের।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে সাদীর কথাগুলো শুনছিলাম আর মুগ্ধ হয়ে সে শতবর্ষী মেট্রোপার্কের সৌন্দর্য অবলোকন করছিলাম। এমন সময় আমরা একটি সুন্দর জায়গা দেখে ফটাফট কয়েক কপি ছবি তুলে নিলাম। সিঙ্গেল, যৌথ সবাই মিলে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ফটো তোলা হয়ে গেলে এই সুন্দর প্রাকৃতির সম্পদে ভরপুর জায়গাটার কয়েকটা ভিডিও ও করে নিলাম। যেন এই মনোরম সময়টা স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে পারি। ইতোমধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আমরা দেখলাম সামনেই বিশাল বড় আটচালা ছাউনি, যেখানে বসার জন্য বেঞ্চ-টেবিলসহ বারবিকিউ করার জন্য চুলাও রয়েছে।
ছাউনির নিচে : কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের সঙ্গে করে আনা বিরিয়ানি, কোল্ড ড্রিংকস, ফল ও চিপস দিয়ে চমৎকার ভোজে আমাদের লাঞ্চটা সেরে নিলাম। এর পর সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম শিশুদের খেলার জায়গা যেখানে সেদিকে। সেখানে আছে দোলনা, বিভিন্ন জীবজন্তুর আদলে বানানো সিঁড়ি, বাস্কেটবল খেলার মাঠ, ব্যাটমিন্টন খেলার ব্যবস্থা, স্থানে স্থানে বসার জন্য সিঁড়ি, গাছের সঙ্গে ঝোলার জন্য ঝুলন্ত রশিসহ আমাদের বড়দেরও খেলা করার বিভিন্ন উপকরণ।
পানির ফোয়ারায় রংধনু : এই কয়েক ঘণ্টায় আমাদের প্রয়োজনীয় সব কাজ প্রায় শেষ হয়ে এলো। আর অর্ধেক পার্কও ঘুরে দেখা হয়ে গেল। এখন শুধু বাকি রইল খরস্রোতা নদী, কৃত্রিম ঝিল ও বিদেশি বৃক্ষ ও ফুলগাছ সমান সাইজে কেটে বানানো সবুজের অপার সৌন্দর্য দেখার পালা। ততক্ষণে বেলাও পড়ে এসেছে। আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম। তখনই চোখে পড়ল খরস্রোতা নদীটি! যার ওপরে ছোট্ট একটা ব্রিজ। আমরা ব্রিজের ওপরে উঠে নিচের দিকে তাকিয়ে স্রোতস্বিনীর ঢেউ দেখতে লাগলাম। তখনই দেখি স্বচ্ছ পানিতে ছোটাছুটি করছে অনেকটা মাছ, বেশ বড় আকারের মাছগুলো। নিচে বালু পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আমাদের দেশে হলে একটা মাছও হয়তো পাওয়া যেত না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কোনো পশুপাখিকে কষ্ট দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এগুলো শুধু সৌন্দর্য দেখার উদ্দেশ্যে এখানে রাখা হয়েছে। নদী পেরিয়ে এসে দেখলাম কৃত্রিম ঝিল; যার মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে একটি পানির ফোয়ারা। রোদের আলোয় সে ফোয়ারা মুক্তার মতো ঝিকমিক করছিল। আর সেটা লক্ষ করতে গিয়ে আমরা আরেকটি জিনিস লক্ষ করলাম। ওই পানির ফোয়ারার মধ্যে দেখা যাচ্ছে ‘রংধনু’! কয়েক রঙের মিশ্রণে রোদ ও আলোর মিলনে সেটিও ঝকমক করছিল তখন! তা দেখে আমরা সবাই ক্যামেরা নিয়ে এর ছবি তুলতে লেগে গেলাম। পানির মধ্যেই কত রকম সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করলাম! খরস্রোতা নদীতে মাছেদের ঘাই, ঝিলভর্তি ফোটা শাপলা ফুল বা কৃত্রিম পানির ফোয়ারাতে ধরা পড়া রংধনুর রঙগুলো! সবই ক্যামেরাবন্দি করা হলো।
বিদায়বেলা : সব রকম সৌন্দর্য মনপ্রাণ ভরে উপভোগ করার পর আমরা বাসার পথ ধরলাম। আমাদের জিপে ফিরে এসে গাড়ি স্টার্ট দিই আপন ঠিকানা মিশিগান অঙ্গরাজ্যে ফেরার উদ্দেশ্যে। প্রতিবেশী এই অঙ্গরাজ্য ওহাইও ভ্রমণটা সবাই মনপ্রাণ দিয়ে উপভোগ করলাম।