আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৩ পিএম
শীতের সময় ত্বক, চুল শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এই শুষ্কতা ও রুক্ষতা কমাতে জাদুর মতো কাজ করে তেল। তবে একেক তেল কাজ করে একেকভাবে, গুণাগুণ হিসেব করলে সব ধরনের তেলেই উপকারিতা রয়েছে। শুধু জানতে হবে কীভাবে কোন তেল ব্যবহার করলে বেশি কার্যকর হবে। নানা ধরনের তেলের ব্যবহার নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
খুব বেশি আগের কথা নয়। আমাদের নানি-দাদিরাও ত্বক ও চুল ভালো রাখার জন্য নানা ব্র্যান্ডের পণ্যের বদলে তেলেই ভরসা রাখতেন। খাঁটি নারিকেল তেল, বাদাম তেল এমনকি সরিষার তেলের ব্যবহারও ছিল নিয়মিত। বর্তমানের আধুনিক সময়েও তেলের অবদান কমেনি, তবে বিজ্ঞানের সাহচর্যে তেলের তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন নানা ধরনের তেল। আগে যেখানে ৩-৪টি তেলের সন্ধান মিলত, এখন সেখানে তেলের সংখ্যা গুনেও শেষ করা যায় না। তাই বলে কি সব তেলই ব্যবহার করতে হবে? ব্যাপারটি ঠিক এমন নয় যে, ত্বক ও চুল ভালো রাখার জন্য অনেক তেলের ব্যবহার করতে হবে। এর বদলে ত্বক ও চুলের সমস্যা বুঝে তেল বেছে নেওয়াই উত্তম।
শীতে ত্বক ফেটে যাওয়া, চুল ফ্রিজি হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো বেশ ভোগান্তি দেয়। এসব সমস্যা কমাতে তেলের ব্যবহার করতে হবে জুতসইভাবে। বুঝতে হবে কোন সমস্যা কতটুকু ভোগাচ্ছে এবং কীভাবে তেল ব্যবহার করতে হবে। চলুন শীতে তেলের ব্যবহার কীভাবে আমাদের সুরক্ষিত রাখতে পারে, সে সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক।
ত্বকে তেলের কারিশমা

প্রবা ফটো
ত্বকে সরাসরি তেল লাগাতে ভয় পান অনেকে। ভাবেন ত্বক বেশি তেলতেলে বা সংবেদনশীল হয়ে যাবে। গরমের সময় তৈলাক্ত ভাব নিয়ে কিছুটা চিন্তা থাকলেও শীতে তেলের ব্যবহারে ত্বকের উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে ত্বক থাকে আর্দ্রতাপূর্ণ। যে ধরনের তেল ত্বকের জন্য উপযুক্ত-
জলপাই তেল
ত্বকে পানির পরিমাণ কমে গেলে ত্বক রুক্ষ হতে শুরু করে। নিয়মিত জলপাই তেলের ব্যবহার এই রুক্ষতা কমায়। প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ই’-এর পাশাপাশি এই তেলে ভিটামিন ‘ডি’ থাকে, যা ত্বকের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেয়। তাই অলিভ অয়েলকে সরাসরি ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কিংবা কোনো ময়েশ্চারাইজারিং লোশন বা ক্রিমের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করলে বেশ উপকার পাওয়া যায়। ত্বককে মোলায়েম করে তুলতে অলিভ অয়েলের তুলনা হয় না।
শীতে ঠোঁট ফাটার সমস্যায় কমবেশি সবাই পড়েছেন। এই সমস্যা কমাতে এক চা-চামচ অলিভ অয়েল, কয়েক ফোঁটা লেবুর রস ও আধা চামচ চিনি মিশিয়ে একটি প্যাক তৈরি করে নিন। প্যাকটি ঠোঁটে লাগিয়ে চিনি গলে না যাওয়া পর্যন্ত মালিশ করতে হবে। শুষ্ক আবহাওয়ায় দিনে একবার মালিশটি করতে পারলে নরম ও কোমল ঠোঁট পাওয়া যাবে সহজেই।
নারকেল তেল

প্রতিদিন গোসলের আগে নারকেল তেল সামান্য গরম করে হাতে-পায়ে মালিশ করলে ত্বক কোমল হয়। নারকেল তেলের সঙ্গে গ্লিসারিন, সামান্য গোলাপজল ও পছন্দমতো এসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে বডি লোশন তৈরি করে ব্যবহার করলে ত্বকের শুষ্কতা দূর হবে। নারিকেল তেল দিয়ে তৈরি বডি স্ক্রাব ত্বকের মৃতকোষ দূর করে, ডার্ক প্যাঁচও হালকা করে।
মারুলা তেল
মারুলা তেল ত্বকের পুষ্টির জন্য একটি শক্তিশালী উৎস। এতে রয়েছে ত্বকের জন্য উপকারী অ্যামিনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ভিটামিন ‘সি’ ও ‘ই’ আর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এটি উচ্চমানের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল অয়েল। এই তেলের ব্যবহারে ব্রণ, ব্ল্যাকহেডস, হোয়াইটহেডসের সমস্যা কমে যায়। পাশাপাশি সারাতে পারে অ্যাকজিমা ও সোরিয়াসিসের মতো মারাত্মক চর্মরোগ। মারুলা অয়েলকে বলা হয় এলিক্সার অব ইয়থ। অর্থাৎ যৌবনের অমৃত।
বাদাম তেল
আমন্ড অয়েল বা বাদাম তেল বেশ হালকা। ঠান্ডার সময় ত্বকে কোনো ধরনের ভারী অনুভূতি দেয় না বা ইরিটেশন হয় না। এতে আছে ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ই’, যা ত্বকের পুনর্গঠনের জন্য সুপরিচিত। এই তেলের টেক্সচার ত্বকে কোনো ধরনের চিটচিটে অনুভূতি দেয় না; যার কারণে মুখের ত্বকেও নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়। দুই হাতের তালুতে তেল নিয়ে আলত করে ঘষে রাতে ঘুমানোর আগে মুখে লাগিয়ে নিন। শুষ্কতা কমিয়ে সতেজ ও কোমল অনুভূতি দিতে এই তেলের জুড়ি মেলা ভার।
আরগান অয়েল
আরগান অয়েল সংগ্রহ করা হয় মরক্কান আরগান নাট থেকে। এই তেলে আছে প্রচুর পরিমাণে ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। এর ব্যবহারে ত্বক আর্দ্র থাকে, তৈলাক্ত ত্বকের অধিকারীরাও ব্যবহার করতে পারেন নিশ্চিন্তে। সেইসঙ্গে ত্বক নরম, কোমল ও উজ্জ্বল হয়। ময়েশ্চারাইজারের সঙ্গে ১/২ ড্রপ তেল মিশিয়ে নিলে ডিউয়ি ফিনিশ দেয়। শীতের শুষ্কতায় এই তেলের ব্যবহার বেশ ভালো কাজে দেয়।
জোজোবা অয়েল
ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধরে রাখার জন্য জোজোবা অয়েল দারুণ কাজ করে। ত্বকের প্রাকৃতিক তেল উৎপাদনে এবং ময়েশ্চার ব্যারিয়ার ধরে রাখতে এই তেল সাহায্য করে। যাদের শীতে শুষ্কতা ও ব্রেকআউটের সমস্যা বেশি হয় তাদের জন্য এই তেল চমৎকার একটি অপশন। ফেসিয়াল অয়েল হিসেবে বা লোশনে মিক্স করে নিলে এই তেলের কার্যকারিতা আরও বেড়ে যায়। রাতে ঘুমানোর আগে বা সকালে লাগিয়ে নিলে ত্বকের আর্দ্রতার ব্যালান্স থাকে।
ঝলমলে চুলের রহস্য লুকিয়ে আছে যেসব তেলে

শীতে খুশকি, ড্রাই স্ক্যাল্পের সমস্যার সঙ্গে অনেকের চুলে দেখা দিয়েছে অতিরিক্ত রুক্ষতা। সবগুলো অবস্থায়ই তেল হতে পারে সহজ সমাধান। চুলের যত্নে কোন তেলগুলোর উপকারিতা রয়েছে চলুন জেনে নেওয়া যাক।
নারকেল তেল ও টি ট্রি অয়েল
শীতের সময় স্ক্যাল্পে র্যাশ, খুশকি বা অন্যান্য সমস্যা হতে পারে। এসবের সমাধানে টি ট্রি তেল ব্যবহার করা যায়। তবে এসেনশিয়াল হওয়ার কারণে এই তেল সরাসরি ত্বকে ব্যবহার করা যায় না। তাই এই টি ট্রি তেলের সঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে নারকেল তেল। ২ টেবিল চামচ নারিকেল তেলের সঙ্গে ৫-৬ ফোঁটা টি ট্রি এসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে নিন। নারকেল তেলের মধ্যে থাকে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল অনেক উপাদান, যা টি ট্রির সঙ্গে মিশে তেলকে আরও কার্যকর করে তোলে।
অলিভ অয়েল
শীতে চুল পড়া এবং খুশকির সমস্যা নেই এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। অলিভ অয়েলে আছে ওমেগা-৩ অ্যাসিড এবং অন্যান্য নিউট্রিয়েন্টস, যা চুলের গ্রোথ বাড়াতে সাহায্য করে আর চুল পড়া কমায়। স্ক্যাল্পে যদি ইচিনেস থাকে এবং ড্যানড্রাফের প্রবলেম থাকে, তাহলে অলিভ অয়েল ব্যবহারে তা কমে যাবে। অলিভ অয়েল ড্রাই স্ক্যাল্পের সমাধান করে হেয়ার কিউটিকল সফট করে। অলিভ অয়েল, লেবুর রস এবং পানি সমপরিমাণে নিয়ে সেটা ভালোভাবে মিক্স করে হালকা ভেজা চুলে লাগিয়ে ১৫-২০ মিনিট পর তা শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। চুল জটমুক্ত ও ঝরঝরে হবে নিমিষেই।
রোজমেরি অয়েল
রোজমেরি অয়েল চুল বৃদ্ধিতে খুব ভালো কাজ করে। এতে থাকা hemisqualane হেয়ার গ্রোথ প্রোমোট করে। রোজমেরিতে আছে অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি প্রোপার্টিজ, যা মাথার তালু ঠান্ডা রাখে এবং ইচিনেস কমায়। যেহেতু রোজমেরি হেয়ার গ্রোথ স্টিমুলেশনের জন্য বিখ্যাত, এটি অ্যালোপেশিয়ার মতো রোগীদের রোজমেরি অয়েল সাজেস্ট করা হয়ে থাকে এবং রিসার্চে প্রমাণিত যে, ৬ মাসের মধ্যে রোগী এর কার্যকারিতা দেখতে পায়। এই তেল মাথাব্যথাও দূর করতে কার্যকরী।

ক্যাস্টর অয়েল
এতে আছে ফ্যাটি অ্যাসিড ও প্রয়োজনীয় নিউট্রিয়েন্টস, যা চুলে শাইনি ইফেক্ট দিতে সাহায্য করে এবং চুলের ড্যামেজ রিপেয়ার করতেও কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ক্যাস্টর অয়েল তুলনামূলক ভারী। স্ক্যাল্পের জন্য ক্যাস্টর অয়েল খুবই উপকারী। কারণ এটি অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টি ফাঙ্গাল ট্রিটমেন্ট হিসেবে কাজ করে থাকে। যাদের খুব ড্রাই ও ইচি স্ক্যাল্প, তাদের জন্য এই তেল বেশ উপযোগী। চুলে ময়েশ্চার লক করতেও ক্যাস্টর অয়েল কাজ করে ম্যাজিকের মতো। তবে যেহেতু এটি বেশ থিক টেক্সচারের, তাই অন্য লাইটওয়েট ক্যারিয়ার তেলের সঙ্গে মিক্স করে এবং শ্যাম্পুর আগে ব্যবহার করা উচিত।
অ্যাভোকাডো অয়েল
এই তেলে আছে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিডস। এর ব্যবহারে চুলের জট ছেড়ে যায়। এটি চুলের আগা ফাটার সমস্যা কমাতেও সাহায্য করে। যাদের চুল বেশি শুষ্ক ও ক্ষতিগ্রস্ত, একটুতেই জট বেঁধে যায়; তাদের জন্য দারুণ কার্যকরী।
এ ছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের তেল হেয়ার কেয়ারে ব্যবহার করা হয়, যেমন পাম্পকিন সিড অয়েল, আমন্ড অয়েল, অলিভ অয়েল ইত্যাদি। চুলের ধরন অনুযায়ী তেল বাছাই করলে তা চুলের জন্য কার্যকর হয়।
যাদের লো পোরোসিটি হেয়ার, তারা সুইট আমন্ড অয়েল, জোজোবা অয়েল, আরগান অয়েল, পাম্পকিন সিড অয়েল ব্যবহার করলে ভালো ফল পাবেন।
যাদের হাই পোরোসিটি হেয়ার, তারা কোকোনাট অয়েল, ক্যাস্টর অয়েল, আমন্ড অয়েল, আরগান অয়েল ব্যবহার করলে ভালো ফল পাবেন।
মডেল - শ্রাবন্তী ও নওশিন ছবি - মনজু আলম