মাহবুবা মিতু
প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:২৯ পিএম
শিশুর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো স্কুলে প্রথম ভর্তি। এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের ঘটনা নয়, বরং শিশুর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানসিক বিকাশের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ঘরের নিরাপদ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে একটি নতুন জগতে পা রাখার এই যাত্রায় শিশু নতুন মানুষের সঙ্গে মিশবে, নিয়ম-কানুন মানতে শিখবে, স্বাধীনভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত হবে এবং জ্ঞান অর্জনের আনন্দ অনুভব করবে। কিন্তু এই পরিবর্তন শিশুর জন্য সহজে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য অভিভাবকদের আগে থেকেই সচেতন প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
স্কুলে ভর্তির আগে সঠিক প্রস্তুতি না থাকলে শিশু প্রথম দিনগুলোতে ভয়, উদ্বেগ বা বিচ্ছেদের দুঃখ অনুভব করতে পারে, যা তার স্কুলের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে যথাযথ প্রস্তুতির মাধ্যমে শিশু স্কুলকে একটি মজার ও নিরাপদ জায়গা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, যার ফলে তার শিক্ষাজীবনের ভিত্তি মজবুত হয়। তাই স্কুলে ভর্তির আগে শিশুর প্রস্তুতি যতটা সম্ভব সুসংগঠিত ও মনোযোগী হওয়া খুবই জরুরি। এই প্রস্তুতি শুধু শিশুকেন্দ্রিক নয়, অভিভাবকদের মানসিক প্রস্তুতিও অন্তর্ভুক্ত করে কারণ তাদের আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মনোভাব শিশুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বাচ্চার স্কুলে ভর্তির আগে কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও দৈনন্দিন রুটিনের দিক থেকে তা বিস্তারিতভাবে জানব, যাতে শিশুর স্কুল যাত্রা সুন্দর ও স্মরণীয় হয়ে ওঠে সে সম্পর্কে চলুন জেনে নেওয়া যাক।
মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতি

ভর্তির প্রক্রিয়া শুধু পড়াশোনার দক্ষতার মূল্যায়ন করে না, বরং এটি একটি শিশুর মানসিক এবং সামাজিক প্রস্তুতির ওপরও জোর দেয়।
বিচ্ছেদভীতি কাটানো
শিশুকে আপনার থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করানো জরুরি। অল্প সময়ের জন্য নানি-দাদি বা অন্য বিশ্বস্ত কারও কাছে রেখে দেখুন। খেলার ছলে তাকে বোঝান যে আপনি ফিরে আসবেন। এতে স্কুলে দীর্ঘ সময় থাকার মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হবে।
স্বাবলম্বী হতে শেখানো
ছোট ছোট কাজ, যেমন- নিজের খেলনা গোছানো, জুতা পরা, হাত ধোয়ার মতো ছোটখাটো কাজ নিজে করতে শেখান। এটি তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করবে। শিক্ষকের সাহায্য ছাড়া নিজের প্রয়োজন মেটাতে শেখা স্কুলের জন্য অপরিহার্য। শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলার সাধারণ নিয়ম- সালাম, হ্যালো, ধন্যবাদ, দয়া করে, সরি এগুলো বলার অভ্যাস করান।
শেয়ারিং ও অপেক্ষা করা
খেলার সময় অন্যদের সঙ্গে জিনিসপত্র ভাগ করে নেওয়া এবং নিজের পালা আসার জন্য অপেক্ষা করতে শেখানো সামাজিক দক্ষতার অংশ। এই শিক্ষা তাকে ক্লাসরুমে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
প্রাকশিক্ষা প্রস্তুতি
স্কুলে ভর্তি মানেই বই মুখস্থ করানো নয়, বরং শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। ভর্তি পরীক্ষায় এই সাধারণ দক্ষতাগুলো দেখা হয়। মৌলিক ধারণাÑ বর্ণ ও সংখ্যা জ্ঞান, আকৃতি ও রঙ সম্পর্কে ধারণা, নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বর শেখানো জিজ্ঞাসা করলে যেন বলতে পারে।
টিপস
টিপস
পড়া শেখানোর জন্য ফ্ল্যাশকার্ড, রঙিন ব্লক বা শিক্ষামূলক ভিডিও ব্যবহার করুন। জোর করে নয়, খেলার ছলেই শেখান।
রুটিন মেনে চলা
স্কুল মানেই একটি নির্দিষ্ট রুটিন। আগে থেকেই শিশুকে এই অভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত করানো প্রয়োজন।
ঘুমের রুটিন
ভর্তির কয়েক মাস আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা এবং ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
খাওয়ার রুটিন
টিফিন বা মধ্যাহ্নভোজের সময় একা বসে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন।
বাথরুমের অভ্যাস
টয়লেট ব্যবহারের নিয়ম এবং হাইজিন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল করুন। প্রয়োজনে শিক্ষকের সাহায্য চাইতে শেখান।
শারীরিক ও স্বাস্থ্য প্রস্তুতি
স্কুলে ভর্তির আগে প্রয়োজনীয় টিকা ও হেলথ চেকআপ করান। ভর্তি হওয়ার আগে চোখ পরীক্ষা করানোও খুব জরুরি, যাতে দেখা-সংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকলে সময়মতো সমাধান করা যায়। বাচ্চাকে স্বাস্থ্যকর টিফিনের অভ্যাস গড়ুন ফল, বাদাম, স্যান্ডউইচ। প্রতিদিন খেলাধুলা করে শারীরিক স্ট্যামিনা বাড়ান, যাতে স্কুলে ক্লান্ত না হয়।
ভর্তির দিনের প্রস্তুতি
ভর্তি বা পরীক্ষার দিন শিশু যেন ভীত বা অস্বস্তি বোধ না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সম্ভব হলে আগে থেকেই স্কুলটি একবার ঘুরে দেখান। খেলার মাঠ বা শ্রেণিকক্ষ দেখলে তার মনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। এ ছাড়াও স্কুলের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইতিবাচক গল্প বলুন। তাকে বোঝান যে স্কুলে নতুন বন্ধু হবে এবং মজার মজার জিনিস শিখতে পারবে।
বাচ্চার স্কুলে ভর্তির আগের এই প্রস্তুতির যাত্রা শুধু শিশুর জন্য নয়, পুরো পরিবারের জন্যই একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। যতই আমরা আগে থেকে মানসিক, সামাজিক, শারীরিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে প্রস্তুতি নিই, ততই শিশুর প্রথম স্কুল যাত্রা সহজ, আনন্দময় এবং স্মরণীয় হয়ে ওঠে। এই প্রস্তুতি শিশুকে কেবল স্কুলের নিয়ম-কানুনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় না, বরং তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস, কৌতূহল এবং নতুন কিছু শেখার উত্তেজনা জাগিয়ে তোলে। মনে রাখবেন, কোনো শিশুই একদিনে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে ওঠে না। কখনও কখনও প্রথম কয়েক দিন কান্না, অনীহা বা অস্বস্তি হতেই পারে, এটি একেবারেই স্বাভাবিক। অভিভাবক হিসেবে আমাদের কাজ হলো ধৈর্য ধরে পাশে থাকা, উৎসাহ দেওয়া এবং শিশুর গতিতে এগোনো। সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে যখন শিশু স্কুলের দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তখন তার চোখে-মুখে যে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠবে, সেটিই হবে আমাদের সব প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।