গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৪০ পিএম
২০২৫- বাংলাদেশি পর্বতারোহণের ক্যালেন্ডারে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায়। চলতি বছর শুধু এভারেস্টেই নয়, বিশ্বের আরও দুই ৮ হাজারি শৃঙ্গ এবং হিমালয়ের একাধিক কৌশলগত চূড়ায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ উড়েছে বিজয়ের ভাষা হয়ে। ব্যক্তিগত স্বপ্ন থেকে সংঘবদ্ধ অভিযানের শক্তি- সব মিলিয়ে ২০২৫ ছিল দেশের পর্বতারোহীদের জন্য সীমা ভাঙার বছর।

সমুদ্রপাড় থেকে সর্বোচ্চ শিখরে ‘সি টু সামিট’
২৫ ফেব্রুয়ারি, ইকরামুল হাসান শুরু করেন এক অসম্ভবকে সম্ভব করার হাঁটা- কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের লবণাক্ত ঢেউ ছুঁয়ে। ‘সি টু সামিট’ নামের এই অভিযানে ভারত পেরিয়ে ৩১ মার্চ তিনি প্রবেশ করেন নেপালে, আর ২৯ এপ্রিল পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে। শারীরিক অভিযোজন, কৌশলগত প্রস্তুতি ও মানসিক দৃঢ়তার দীর্ঘ পরীক্ষার পর ১৯ মে, নেপালের সময় সকাল ৬টা ৩০মিনিটে তিনি দাঁড়িয়ে যান ৮,৮৪৯ মিটারের চূড়ায়। ৮৪ দিনের পথচলায় প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার হেঁটে এই অভিযান হয়ে ওঠে বাংলাদেশের জন্য এক নজিরবিহীন পর্বতারোহণ-ওডিসি।

অন্নপূর্ণায় প্রথম বাংলাদেশি
বিশ্বের দশম উচ্চতম কিন্তু সবচেয়ে নিষ্ঠুর পর্বতগুলোর একটি- ৮,০৯১ মিটারের অন্নপূর্ণা-১। ৭ এপ্রিল, প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এর শীর্ষে পা রাখেন বাবর আলী। পেশায় চিকিৎসক, নেশায় উচ্চতার অভিযাত্রী বাবর আলী ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক। অন্নপূর্ণার আগেই তিনি এভারেস্ট ও লোৎসে জয় করে ইতোমধ্যে নিজের নাম তুলেছিলেন দেশের পর্বতারোহণের দুর্লভ তালিকায়; কিন্তু অন্নপূর্ণা ছিল তার সবচেয়ে নীরব-গর্জন করা বিজয়।

অক্সিজেনহীন ৮ হাজারি জয়- মানাসলুতে নতুন ব্যাকরণ
২০১১ সালে এম এম মুহিতের প্রথম মানাসলু জয়ের ১৪ বছর পর ২০২৫-এ আবারও মানাসলুর বরফে আঁকা হয় বাংলাদেশের পদচিহ্ন। ২৫ সেপ্টেম্বর ৮,১৬৩ মিটারের চূড়ায় পৌঁছান তৌফিক আহমেদ তমাল, আর ২৬ সেপ্টেম্বর একই শৃঙ্গ স্পর্শ করেন তানভীর আহমেদ ও বাবর আলী। ‘মানাসলু অ্যাসেন্ট: ভার্টিক্যাল ডুয়ো’ অভিযানে সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে বাবর আলীর হাত ধরে- কৃত্রিম অক্সিজেনের সহায়তা ছাড়াই ৮ হাজারি চূড়ায় ওঠা, যা বাংলাদেশি পর্বতারোহণে যুক্ত করে নতুন সক্ষমতার ভাষা। তমাল ও তানভীরের জন্য এটিই ছিল প্রথম ‘৮ হাজারি’, প্রথম আকাশছোঁয়া স্বপ্ন পূরণের শৃঙ্গ।
হিমলুং হিমালে নিম্নি
পর্বতকে এবার কণ্ঠ বানালেন নুরুননাহার নিম্নিÑ উদ্দেশ্য নারীদের স্তন ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি। ১৫ দিনের অভিযানে ৩ নভেম্বর ৭,১২৬ মিটারের হিমলুং হিমালের চূড়ায় পৌঁছে তিনি গড়েন নিজের প্রথম ৭ হাজারি জয়ের গল্প। বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের তত্ত্বাবধানে এই সাফল্য তাকে এগিয়ে দিচ্ছে পরবর্তী লক্ষ্যÑ এভারেস্ট।

নিশাত মজুমদারের নেতৃত্বে ‘সুলতানাজ ড্রিম’
বছরের শেষভাগে আরেকবার চোখ ফেরে নারী অভিযাত্রীদের দিকে। ‘সুলতানাজ ড্রিম’ সাহিত্যকর্মের চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া ‘সুলতানাজ ড্রিম আনবাউন্ড’ অভিযানে নিশাত মজুমদারের নেতৃত্বে তিন নারী ১৫ ডিসেম্বর জয় করেন ৬,০৫৯ মিটারের চুলু ফার ইস্ট। এটি ছিল শুধু শৃঙ্গ জয় নয়—বাংলাদেশি নারীদের পর্বতারোহণ-আকাঙ্ক্ষার এক সাহসী সাংস্কৃতিক পুনর্লিখন।
এ ছাড়া পর্বতারোহী প্রবল বর্মণ শুরু করেন ‘সেভেন সামিট’ অভিযান। প্রথম ধাপে ৯ জুন আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত কিলিমানজারো জয় করেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন চিন্ময় সাহা। ৪ নভেম্বর আহসানুজ্জামান তৌকির জয় করেন ৬ হাজার ৮১২ মিটার উচ্চতার আমা দাবলাম। ২০ নভেম্বর ৬ হাজার ৪৭৬ মিটার উঁচু মেরা পিকে পৌঁছান ইমতিয়াজ ইলাহী ও শাহনাজ আক্তার। ২০২৫-এ বাংলাদেশের পর্বতারোহীরা শুধু উচ্চতা স্পর্শ করেননি; তারা স্পর্শ করেছেন সামর্থ্য, ধৈর্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের নতুন সীমানা। সমুদ্র থেকে শৃঙ্গ, ক্লাব থেকে বিশ্বমঞ্চ, সাহিত্য থেকে বরফশীর্ষÑ এই বছর দেখিয়েছে বাংলাদেশের পর্বতারোহণ আর কেবল অভিযান নয়, এটি এখন এক সম্ভাবনার আন্দোলন।