নিঝুম নিসর্গ
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:০৭ পিএম
অলংকরণ : নীলাদ্রি রাজ সাহা, শ্রেণি : সপ্তম, বি এ এফ শাহীন কলেজ, ঢাকা
আমার নাম নিঝুম নিসর্গ। এখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। ডিসেম্বর মাস এলে জানালার বাইরে কুয়াশা দেখি, আর আমার মনে পড়ে যায় ক্লাস ওয়ানের সেই বড়দিনটার কথা। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ছয় কি সাত।
ছোটবেলায় ইউটিউবে রঙিন মাছেদের ভিডিও দেখতে আমার খুব ভালো লাগত। কাঁচের স্বচ্ছ পানিতে ছোট ছোট মাছেরা লেজ নেড়ে ঘুরে বেড়াত। আমার খুব ইচ্ছা হতো, আমারও যদি একটা অ্যাকুয়ারিয়াম থাকত!
ডিসেম্বর মাস এলেই চারদিকে উৎসবের আমেজ শুরু হয়। ভিডিওতে দেখতাম সাদা দাড়ি আর লাল জামা পরা সান্টা ক্লজ দাদুকে। তিনি নাকি রাতে এসে বাচ্চাদের মনের ইচ্ছা পূরণ করেন। আমি ঠিক করলাম, এবার সান্টার কাছে উপহার চাইব।
বড়দিনের দুদিন আগে বাবার সাথে বারান্দায় একটা ছোট্ট ক্রিসমাস ট্রি সাজালাম। লাল-নীল আলো আর রঙিন কাগজে ট্রিটা জাদুর মতো ঝকঝক করতে লাগল। ২৪ তারিখ রাতে আমি একটা চিরকুট লিখলাম :
‘প্রিয় সান্টা দাদু, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমাকে কি কয়েকটা রঙিন মাছ দেবে? আমি তাদের খুব যত্ন করে রাখব।’ চিরকুটটা ট্রির ডালে গুঁজে দিয়ে উত্তেজনায় সারা রাত ঘুমাতেই পারলাম না।
পরদিন ভোরে দৌড়ে বারান্দায় গেলাম। গিয়েই আমার চোখ ছানাবড়া! চিরকুটটা সেখানে নেই, বদলে ডাল থেকে ঝুলছে স্বচ্ছ পলিথিনে ভরা একঝাঁক ছোট্ট রঙিন মাছ। আমার খুশির সীমা নেই! বাবা বললেন, ‘সান্টা তো চুপি চুপি আসে মা, ওকে কেউ দেখতে পায় না। কিন্তু ও ঠিকই জানে কার মনে কী আছে।’
মাছগুলোকে আমার ছোট্ট কাচের জারে রাখলাম। খুশিতে আমার সাহস অনেক বেড়ে গেল। ভাবলাম, সান্টা যখন মাছ দিয়েছে, তাহলে আমার প্রিয় সেই দামি বিদেশি খেলনাটাও দেবে! আমি আবার একটা চিরকুট লিখে জেদ ধরলাম যে সান্টাকে ওটা দিতেই হবে।
কিন্তু পরদিন সকালে কোনো খেলনা পেলাম না। তার বদলে ক্রিসমাস ট্রিতে একটা খাম রাখা। আমি অবাক হয়ে চিঠিটা পড়লাম। সান্টা লিখেছে, ‘প্রিয় নিঝুম, তোমার ছোট ইচ্ছাটা আমি ভালোবেসে পূরণ করেছি। কিন্তু তোমার বড় ইচ্ছাটা তোমাকে নিজেকেই পূরণ করতে শিখতে হবে। তুমি নিজে টাকা জমিয়ে খেলনাটা কিনলে অনেক বেশি আনন্দ পাবে। আমি যদি বাচ্চাদের সব উপহার এমনিই দিয়ে দেই, তবে তারা কখনও পরিশ্রমী হওয়া শিখবে না। আমি সব সময় তোমার পাশে আছি।’
চিঠিটা পড়ে আমি অনেকক্ষণ চুপ হয়ে বসে থাকলাম। মা আমাকে একটা মাটির ব্যাংক কিনে দিলেন। আমি বায়না ছেড়ে দিয়ে টিফিনের টাকা জমাতে শুরু করলাম। কয়েক মাস পর যখন নিজের জমানো টাকায় সেই বিদেশি খেলনাটা হাতে পেলাম, সেই তৃপ্তি ছিল অন্যরকম! ওটা ছিল আমার নিজের যোগ্যতায় পাওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।
আজ ক্লাস সেভেনে উঠে আমি জানি, সেই চিঠিটা সান্টা লেখেননি। লিখেছিলেন আমার বাবা-মা। তারা আমাকে শুধু মাছ বা খেলনা দিতে চাননি, শিখিয়েছিলেন সারা জীবনের এক বড় শিক্ষাÑ ‘স্বনির্ভরতা’। সান্টা শুধু উপহার দিতে আসে না, পরিশ্রম করতে এবং নিজেকে গড়তে সাহস দিতেও আসে।
ক্লাস সেভেন, রোজডেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খুলনা