বিয়েতে আয়োজনের কমতি থাকে না কখনোই। আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতি, মন ভোলানো নানা স্বাদের খাবার, উপস্থিত অতিথিদের জন্য নানা আয়োজনÑ সবকিছুতেই থাকে বাড়তি নজরদারি। এত সবকিছুর মাঝে সবার নজর থাকে কনের দিকে। কারণ বিয়ের আয়োজনটাই যে তাকে ঘিরে! কনে কেমন পোশাক পরেছে, পোশাকের সঙ্গে অনুষঙ্গ কী, ব্যাগের কেমন নকশাÑ এসব নিয়ে আলোচনার অন্ত থাকে না।
বিয়েতে কেমন ব্যাগ
শাড়ি বা লেহেঙ্গার সঙ্গে মিলিয়ে কনেদের হাতে শোভা পায় নানা ধরনের ব্যাগ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ব্যাগ হচ্ছেÑ ক্লাচ ব্যাগ, স্লিং ব্যাগ, বটুয়া, ট্রেন্ডি পার্স। এ ধরনের ব্যাগগুলো দেখতে বেশ নজরকাড়া, পোশাকের সঙ্গেও মানানসই। এসব ব্যাগে সাধারণত হ্যান্ড এম্ব্রয়ডারি, ফুলের কাজ অথবা পার্ল বিডের কাজ করা থাকে। বটুয়াগুলো সাধারণত সিল্কের হয়, যেগুলোতে নিখুঁতভাবে হাতের কাজের স্পর্শ থাকে। মেটাল বিডওয়ার্ক দিয়ে যে ব্যাগগুলো তৈরি করা হয় সেগুলো বিয়ের দিন বা রিসিপশনে সহজেই মানিয়ে যায়। লালের ওপর জরির কাজ করা ব্যাগগুলোও অনেকেরই পছন্দ।
শাড়ি-ব্যাগের যুগলবন্দি
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন্ড বদলায়, পুরনোকে পেছনে ফেলে ফ্যাশন দুনিয়ায় আসে নতুন নতুন পছন্দ। এই ট্রেন্ডের ধারা শুধু পোশাকে নয়, জুতো, ব্যাগসহ বিভিন্ন এক্সেসরিজে দেখা যায়। কনের পোশাকে ও ব্যাগেও এই পরিবর্তন লক্ষণীয়। বিয়ের আসরে কনে চায় তার পরিহিত পোশাক ও অনুষঙ্গ যেন বিয়ের পুরো আয়োজন জুড়ে তার গল্পই বলে। আর এটা সম্ভব তখনই যখন কনের হাতে থাকা ব্যাগ আলাদাভাবে সবার নজর কাড়ে। পোশাক ও সাজসজ্জা তো বটেই, নিজেকে আলাদাভাবে মেলে ধরতে ব্যাগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গতানুগতিক ব্যাগের ফ্যাশন থেকে বের হয়ে কনেরা এখন বেছে নিচ্ছে ভিন্ন কিছু। এই ভিন্নতার মধ্যে রয়েছে ব্যাগে নিজের নাম লেখা, শাড়ির নকশার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাগের একই রকম নকশা, কনের সাজ, জামদানি প্রিন্ট নকশা, জামাই বউয়ের ছবি কাস্টমাইজ করে নেয়া। ভাবুন তো, কনে যে শাড়িটি পরে আছে, একই রকম ব্যাগ হাতে নিয়ে সে বসে আছেÑ ব্যাপারটা কী অদ্ভুত সুন্দর না?

এই ভাবনা আমাদের কাছে খানিকটা জটিল লাগলেও বর্তমানে এমন ধরনের ব্যাগ নিয়ে কাজ করছেন আবিহা তাহসিন চৌধুরী। অনলাইনে তার উদ্যোগের নাম সারল্য। এই উদ্যোগে নানা নকশার ব্যাগ পাওয়া যায়। তবে এই ব্যাগগুলো অন্যান্য ব্যাগের মতো নয়, পুরোটাই কাঠের তৈরি। ব্যাগের ওপরে হুক লাগানো থাকে, যার সঙ্গে চেইনও দেওয়া থাকে। চাইলে কেউ ক্লাচ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাগÑ গ্রাহকদের মাঝে এই চাহিদা কেমন সেটা সম্পর্কে জানতে চাইলে আবিহা তাহসিন বলেন, ‘আমাদের কাছে ব্যাগ কাস্টমাইজ করার অনেক অনুরোধ আসে। বেশিরভাগ কাস্টমাইজেশনের অনুরোধ থাকে বিয়ের শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে করার, সেক্ষেত্রে শাড়ির হুবহু নকশা সারল্যর ব্যাগে ইলাস্ট্রেট করা হয়। কাস্টমারের প্রয়োজন অনুযায়ী সাইজেও বিভিন্ন তারতম্য থাকে।’ বিয়েতে শুধু কনেই যে এমন কাস্টমাইজড ব্যাগ ক্যারি করেন তা কিন্তু নয়। যদি বিয়ের আয়োজনে অতিথি হয়েও উপস্থিত হোন, নিজের পছন্দের রঙ ও নকশা দিয়ে চাইলে আপনি নিজেও ব্যাগ কাস্টমাইজ করতে পারেন। বিয়েতে অন্য সবার মাঝে আপনি যে আলাদাভাবে নজর কাড়বেন তা কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না।
সারল্যতে মূলত হ্যান্ড ক্র্যাফটেড কাঠের ব্যাগে হাতে এঁকে বা ডিজিটাল প্রিন্ট করে বিভিন্ন রঙিন এবং দেশীয় নকশার কাজ করা হয়। শুরু থেকেই সারল্যর নকশাগুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হতো দেশীয় সংস্কৃতি, শিল্প তুলে ধরার। বিজয় দিবস, ভাষা দিবস, নববর্ষ ইত্যাদি ঘিরে বিভিন্ন নকশা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করে দেশি শাড়ির নকশাগুলো। জামদানি থেকে শুরু করে মণিপুরি, তন্তুজ, বেনারসি কাতান সবই ফুটে উঠে সারল্যর ব্যাগে। সারল্যর বিশেষত্ব হলো ক্রেতারা এখানে নিজের পছন্দ মতো কাস্টমাইজ করে নিতে পারে।
শুধু কি বিয়ের শাড়ি বা বিয়ের মৌসুম ঘিরেই সারল্যর এমন আয়োজন থাকে? এমন প্রশ্নের জবাবে আবিহা জানালেন, সারল্যতে শুধু বিয়ের মৌসুম ঘিরেই কাজ করা হয় এমন নয়। বরং সারা বছর নানা আয়োজন ঘিরেও তাদের উপস্থিতি থাকে। পছন্দের কোনো ছবি বা নিজেদের ছবি দিয়েও প্রিয়জনকে চমকে দেয়া যায়। অনেক গ্রাহকের কাছে সারল্যর ব্যাগ শুধু ব্যাগ নয়, বরং স্মৃতি হিসেবে সংগ্রহে রাখতে ভালোবাসেন তারা। কেউ যদি নিজেদের বিশেষ কোনো মুহূর্ত বা ছবি কাস্টমাইজ করতে চান সেটাও সারল্যতে করা সম্ভব।
দেশে বিয়ের মৌসুমে সারল্যর কাজের চাপ অন্যান্য সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিগত ৩ বছর ধরে সারল্যর চাহিদা দেশের সঙ্গে বিদেশেও ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে ইউএসএ, কানাডা আর অস্ট্রেলিয়া থেকে অনেক প্রিঅর্ডারে ব্যাগ এর অর্ডার থাকে। সুভেনিয়ার হিসেবেও সারল্যর ব্যাগ প্রবাসী গ্রাহকদের কাছে অনেক জনপ্রিয়।
কাস্টমাইজ ছাড়াও যেমন ব্যাগ
কাস্টমাইজ করা কাঠের ব্যাগ যেমন নজর কাড়ে, তেমনই অন্যান্য ব্যাগ দিয়েও শাড়ি ও ব্যাগের যুগলবন্দি করা সম্ভব। বিয়ের কনেরা নানা ধরনের ব্যাগ ক্যারি করতে পারেন বিয়ে বা রিসেপশনে।
ক্লাচ ব্যাগÑ ক্লাচ ব্যাগ ক্যারি করাও সহজ, আবার ছোট জিনিস রাখতেও কোনো অসুবিধে হয় না। চাইলে শাড়ির সঙ্গে কনট্রাস্ট কাপড় দিয়ে তৈরি করিয়ে নেওয়া যায় ডিজাইনার ক্লাচ ব্যাগ। এতে ফ্যাশনও টিকে থাকবে, আবার প্রয়োজনও মিটবে। বক্স ক্লাচ এখন ফ্যাশনে ইন। ছোট ছোট বক্স ক্লাচ জাস্ট একটা দারুণ স্মার্ট লুক এনে দেবে বিয়ের দিন। বেনারসি থেকে শুরু করে সব রকম সাজের সঙ্গেই ট্রাই করতে পারেন এই বক্স ক্লাচ। এমনকি রিসেপশনের দিন যদি ওয়েস্টার্ন গাউন পরেন, সেক্ষেত্রেও বক্স ক্লাচ মানাবে। বর্তমানে বিভিন্ন মার্কেট এমনকি অনলাইনেও নানা রঙের, বিভিন্ন আকৃতি আর নকশার বক্স ক্লাচ পাবেন। কোনোটি হ্যান্ড এম্ব্রয়ডারি আবার কোনোটি ফুলের কাজ অথবা কোনোটি পার্ল বিডেড। তাই বিয়ের দিন কনের হাতে বক্স ক্লাচ রাখলে সবারই নজর কাড়বে।
স্লিং ব্যাগ- বিয়ের কনেদের জন্য স্লিং ব্যাগ দারুণ একটি অপশন বটে। তবে এখানেও কমফোর্টেবল হওয়াটাই আসল কথা। সরু চেনের মধ্যে ছোট স্লিং ব্যাগ ব্রাইডাল কালেকশনের যে কোনো দোকানে পেয়ে যাবেন। এই ধরনের ব্যাগে জায়গা বেশি থাকে। ফলে দরকারি যে কোনো মেকআপ আইটেম বা ছোট কোনো উপহারও রাখা যেতে পারে। তবে বিয়ের দিনের জন্য এই ব্যাগ তেমন একটা মানানসই নয়, বরং বউভাতের সন্ধ্যায় আধুনিক সাজের সঙ্গে স্লিং ব্যাগ ক্যারি করতে পারেন। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করে ট্র্যাডিশনাল ঘরানার স্লিং ব্যাগ বেছে নিন। এর ওপরে সিকুইন ওয়ার্ক কিংবা মিরর ওয়ার্ক করা থাকলে আরও ভালো হয়।
বটুয়া ব্যাগ- বটুয়া ব্যাগ বিয়ে বা রিসেপশনে বহু মহিলা ক্যারি করেন। জারদৌসি কাজের হোক বা তসরের কাপড়ের ওপর কাঁথা প্যাচ ওয়ার্কে বটুয়া, সবটাই ট্রেন্ডি। শুধু যে রঙের পোশাক পরছেন, তার সঙ্গে মানানসই ব্যাগ নিন। তবে এই ব্যাগ দড়ি টেনে বন্ধ করতে হয়। চেন থাকে না। ফলে সাবধানে জিনিস রাখতে হবে সাবধানে।
ট্রেন্ডি পার্স- বিয়ে নয়, বিশেষত রিসেপশনে ট্রেন্ডি পার্স ক্যারি করেন অনেকে। পার্স হাতে থাকলে এক হাত ভর্তি থাকবে সব সময়। বিয়ের দিন যেহেতু অনেক নিয়ম পালন করতে হয়, তাই সে দিন হাতে পার্স না রাখাই ভালো। রিসেপশনে সেই অর্থে কোনো নিয়মের কড়াকড়ি নেই। তাই হাতে পার্স রাখতে পারেন নতুন কনে।
ট্র্যাডিশনাল পোটলি ব্যাগ
এই ধরনের ব্যাগ বিয়ের দিন বেনারসির সঙ্গে স্টাইল করা যায়। জমকালো শাড়ির সঙ্গে বেশ মানাবে এই ব্যাগ। বিশেষ করে ব্রাইডাল পোটলি ব্যাগে এমব্রয়ডারি ওয়ার্ক অথবা মিরর এমবেলিশমেন্ট থাকলে তো কোনো কথাই নেই। বেনারসির সঙ্গে মিলিয়ে মনোক্রম্যাটিক টোনের ব্যাগ বেছে নেওয়া যায়। আবার ব্যাগে কনট্রাস্টের ছোঁয়াও রাখা যায়। তবে এই বিশেষ দিনে খুব বড় আকারের পোটলি ব্যাগ না নেওয়াই ভালো। লাল বেনারসির সঙ্গে লাল অথবা গোল্ডেন ব্রোকেডের পোটলি হাতে নিতে পারেন কনে। যদি ব্লাউজ কনট্রাস্ট কালারের পরেন, তাহলে ব্লাউজের কালারের ব্রোকেডের পোটলিও বেশ ভালো লাগবে।