মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:২২ পিএম
অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র। মহীয়সী বেগম রোকেয়ার জন্মভিটায় প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিকেন্দ্রটি দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে অবহেলিত। নামমাত্র কার্যক্রম চলছে এখানে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে স্মৃতিকেন্দ্রে। কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি।
এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে রোকেয়া অনুরাগীদের। তবে বাংলা একাডেমির সঙ্গে সমাঝোতা চুক্তি সই করে স্মৃতিকেন্দ্রে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করার উদ্যোগ নিয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। জানা যায়, ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের খোর্দ্দ মুরাদপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী বেগম রোকেয়া। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি কলকাতায় মারা যান। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।
রোকেয়ার জীবনকর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলির অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সংস্কৃতিচর্চা এবং স্থানীয় যুবকদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে স্থানীয় অধিবাসীদের দাবির প্রেক্ষিতে রোকেয়ার জন্মভিটায় ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তৎকালীন সরকার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ২০০১ সালের ১ জুলাই বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের উদ্বোধন করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাংলা একডেমির আওতায় উদ্বোধনের পর থেকে সেখানে সীমিত পরিসরে সংগীত প্রশিক্ষণ চলে। ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর স্মৃতিকেন্দ্রের সব অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা একাডেমির কাছে হস্তান্তর করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এরপর ২০০৮ সালে এই স্মৃতিকেন্দ্রটিকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করে বিকেএমইর শ্রমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করা হয়।
স্মৃতিকেন্দ্রের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় সংগঠক রফিকুল ইসলাম দুলাল উচ্চ আদালতে রিট করলে ২০১২ সালে বিকেএমইর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি উচ্চ আদালতে রিট করলে স্মৃতিকেন্দ্রটি পুনরায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন আদালত। এরপর থেকে সংস্কৃতি বিষয় মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলা একাডেমি স্মৃতিকেন্দ্রটি পরিচালনা করছে। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের টানাটানিতে দীর্ঘদিন ধরে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। ২০১৯ সালের দিকে এখানে সীমিত পরিসরে সংগীত, চিত্রাংকনসহ কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয়। এরপর করোনার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালের দিকে আবারও সংগীত কোর্স চালু করলেও সেটি বেশি দিন চালানো সম্ভব হয়নি। রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় সংগঠকদের মনে।
দশম শ্রেণির ছাত্রী মৌমিতা ইসলাম বলে, বেগম রোকেয়ার কারণে আজ আমরা লেখাপড়া করতে পারছি। নারীরা বিভিন্ন স্থানে চাকরি করতে পারছেন। অথচ সেই রোকেয়ার প্রতি চরম অবহেলা করা হচ্ছে। জন্মভিটায় রোকেয়ার ঘরের দেয়ালগুলো বিলীনের পথে। শ্যাওলা জমে সব ইট নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই এখানে দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরিসহ এগুলোকে সংরক্ষণ করা হোক।
দর্শনার্থী মনিরুজ্জামান বলেন, পরিকল্পিত নানা অবকাঠামো দিয়ে সজ্জিত স্মৃতিকেন্দ্রটি। কিন্তু এখানে নেই কোনো কার্যক্রম। ভবনের প্রায় সব কক্ষগুলোই তালাবদ্ধ। বেশিরভাগ কক্ষের দরজা, জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। অবকাঠমো আছে, জনবল আছে, নেই শুধু কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ। সরকার এত বড় অবকাঠামো কেন অযত্নে-অবহেলায় ফেলে রেখেছে জানি না। আমরা তাই এই স্মৃতিকেন্দ্রে বছরব্যাপী নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক। আমরা যেন ঘুরতে আসলে এখানে ভুতুড়ে পরিবেশ না পাই।
রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, আমরা ভেবেছিলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ স্মৃতিকেন্দ্রের উন্নয়ন করবে। কার্যক্রম চালু করতে পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। প্রতি বছর রোকেয়া দিবসে প্রশাসনের কর্মকর্তারা রোকেয়ার দেহাবশেষ ভারত থেকে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কোনো চিঠি চালাচালিও পর্যন্ত আমরা শুনি নাই। আমরা মনে করি, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণেই রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের প্রতি এত অবহেলা।
বাংলা একাডেমির সহপরিচালক ও রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের ইনচার্জ আবিদ করিম মুন্না বলেন, রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের উন্নয়নে নানা কার্যক্রম চলছে। ৯ ডিসেম্বর থেকে এখানে শিশুদের চিত্রাঙ্গন, সংগীত ও নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণের উদ্বোধন হবে। এ ছাড়া রোকেয়ার জীবনের ওপর বই নিয়ে লাইব্রেরিকে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিদিনই এখানে দর্শনার্থী ও বই পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী বলেন, ৯ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা চুক্তি সই হবে। এরপর থেকে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ রোকেয়াকে নিয়ে নানা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। আশা করছি এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে যাবে। সেইসঙ্গে স্মৃতিকেন্দ্রে যদি অবৈধ কোনো স্থাপনা থাকে, তা প্রশাসনের সহযোগিতায় উচ্ছেদ করা হবে। স্মৃতিকেন্দ্রটি পর্যটকবান্ধব করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দের জন্য পরবর্তীতে আবেদন করা হবে।
উল্লেখ্য, রোকেয়া দিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমি দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করবে। মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) সকালে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটার বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, দুপুরে আলোচনা সভা এবং বিকালে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্গন, সংগীত ও নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে। এ ছাড়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে দিনব্যাপী কর্মসূচিতে রয়েছে র্যালি, আলোচনা সভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভা ও প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করবেন কবি আব্দুল হাই শিকদার। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব। প্রধান আলোচক থাকবেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম লুৎফর রহমান ও গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হোসেন উদ্দিন শেখর।