আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:০৩ পিএম
আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৯ পিএম
ছবি : ওমেগা হোম সল্যুশন
সাজানো-গোছানো যেকোনো কিছুই মানুষের মনকে শান্ত রাখে। সারাদিন পর কাজ শেষে যে ঘরে ফেরা হয় সে ঘরটাও যদি গোছানো থাকে, তাহলে মানসিক প্রশান্তি বজায় থাকে। ঘর সাজাতে বর্তমানে মিনিমালিজমের দিকে আগ্রহী অনেকেই। নান্দনিক ও আধুনিক সব ফার্নিচার হয়ে উঠেছে ঘর সাজানোর অন্যতম অনুষঙ্গ।
যেকোনো বাসায় গিয়ে ফার্নিচার দেখে পরিবারের সদস্যদের রুচিবোধ প্রকাশ পায়। আসবাবপত্র ছাড়া কোনো ঘরই সম্পূর্ণ হয় না। বাসার সাজসজ্জা বা ডেকোরেশনের ক্ষেত্রে আসবাবপত্র কেবল বসার বা জিনিস রাখার উপকরণ নয়, ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও চিন্তাশীলতা প্রকাশের মূল ভিত্তি। আজকাল ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে কেবল প্রয়োজন মেটানোই শেষ কথা নয়, এটি হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত জীবনশৈলী এবং রুচির এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। আধুনিক আসবাবপত্র এই ব্যাপারটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। সরল ডিজাইন, বহু-কার্যকারিতা এবং ন্যূনতম বাহুল্য এর মাধ্যমে আধুনিক ফার্নিচার আপনার ঘরকে দিতে পারে এক নতুন ও প্রাণবন্ত চেহারা।
কেন আধুনিক ফার্নিচার বেছে নেবেন?
আগের যুগে নকশা করা ফার্নিচারের বেশ চল ছিল। বলাবাহুল্য সেসব ফার্নিচার দেখতে ছিল নান্দনিক, নজরকাড়া। তবে দেখতে সুন্দর হলেও বর্তমানের ব্যস্ত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেগুলো পরিচর্যা খুব একটা সহজ বিষয় নয়। তাই যুগের হাওয়ার বদলে ফার্নিচারেও এসেছে পরিবর্তন। ব্যবহার উপযোগিতা, নকশা সবকিছু মিলিয়ে ফার্নিচার হয়ে উঠেছে আধুনিক। এমন আধুনিক ফার্নিচারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সৌন্দর্য ও ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। আরও যে সকল কারণে আধুনিক ফার্নিচার বেছে নেওয়া হচ্ছে-
ন্যূনতম ডিজাইন : আধুনিক ফার্নিচারে কারুকাজ বা অতিরিক্ত অলংকরণ কম থাকে। এর সরল নকশাগুলো ঘরকে দেয় এক প্রশান্ত অনুভূতি।
স্থান সাশ্রয় : ছোট অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটের জন্য আধুনিক ফার্নিচার খুবই উপযোগী। সোফা-কাম-বেড, ফোল্ডিং টেবিল, বা দেয়ালের সঙ্গে জুড়ে থাকা শেল্ফের মতো আসবাবপত্র ঘরের জায়গা বাঁচায়।
টেকসই ও আরামদায়ক : সাধারণত উন্নত মানের উপাদান, যেমন- প্রক্রিয়াজাত কাঠ, ধাতু, চামড়া এবং হাই-ডেনসিটি ফোম ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং আরাম নিশ্চিত করে।
বহু-কার্যকারিতা : একটি আসবাব একাধিক কাজে ব্যবহার করা যায়। যেমনÑ একটি কফি টেবিলকে স্টোরেজ ইউনিট হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার সোফাকে চাইলে বেড বানিয়েও ব্যবহার করা যায়।
ঘরের কোথায় কেমন ফার্নিচার
আধুনিক ফার্নিচারকে ঘরের বিভিন্ন অংশে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে সহজ কয়েকটি পন্থা আছে যেগুলো মেনে সহজেই ঘর গোছানো যায়।
বসার ঘর
এল-শেপড সোফা : এ ধরনের সোফা বেশ আরামদায়ক এবং কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে এখানে বসতে পারেন। এটি ঘরের কোণগুলোকেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করে।
ভাসমান শেল্ফ : দেয়ালের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে বলে মেঝের জায়গা নষ্ট হয় না। বই বা সজ্জার জিনিস রাখার জন্য এটি একটি দারুণ আধুনিক সমাধান।
সেন্ট্রাল কফি টেবিল : মেটাল বা কাচের তৈরি সরল, জ্যামিতিক আকারের একটি কফি টেবিল ঘরের কেন্দ্রবিন্দুতে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দিতে পারে।
শোয়ার ঘর
স্টোরেজযুক্ত খাট : বক্স বা ড্রয়ারসহ খাট কাপড়চোপড় বা অন্য জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করে এবং ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখে।
কমপ্যাক্ট ড্রেসিং ইউনিট : আয়না, ছোট স্টোরেজ এবং একটি বসার স্থানযুক্ত আধুনিক ড্রেসিং টেবিল ইউনিট খুব কম জায়গায় সুন্দরভাবে ফিট হয়ে যায়।
স্লিম ওয়্যারড্রোব : স্লাইডিং দরজাসহ বড় কিন্তু স্লিম আকারের ওয়্যারড্রোব আধুনিক বেডরুমের জন্য আদর্শ।
খাবার ঘর
কাচ বা কাঠের ডাইনিং টেবিল : সরল নকশার লম্বা আয়তাকার বা গোলাকার কাচের টপযুক্ত ডাইনিং টেবিল ঘরকে মার্জিত দেখায়।
বিপরীত রঙের চেয়ার : ডাইনিং টেবিলের রঙের সঙ্গে বিপরীত বা হালকা রঙের আধুনিক ডিজাইনের চেয়ার ব্যবহার করলে ঘরটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
রঙ ও সাজসজ্জা
আধুনিক ফার্নিচারের সঙ্গে মানানসই রঙ ও সজ্জা ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। রঙের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।
নিরপেক্ষ রঙ : সাদা, ধূসর, বেইজ এবং কালোÑ এই নিরপেক্ষ রঙগুলো আধুনিক ফার্নিচারের মূল ভিত্তি। তবে আপনি চাইলে একটি উজ্জ্বল রঙের আসবাবপত্র (যেমন : নীল বা হলুদ সোফা) ব্যবহার করে একটি ফোকাস পয়েন্ট তৈরি করতে পারেন।
আলোর ব্যবহার : আধুনিক হ্যাংগিং লাইট (ঝুলন্ত বাতি), ফ্লোর ল্যাম্প বা ট্র্যাক লাইট ব্যবহার করুন। আসবাবপত্রের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে আলোর ভূমিকা অপরিহার্য।
টেক্সচার যুক্ত করুন : আধুনিক আসবাবপত্রের সরলতা বজায় রাখতে কিছু টেক্সচারযুক্ত জিনিস যোগ করতে পারেন। যেমনÑ জ্যামিতিক নকশার কার্পেট, মখমলের কুশন বা লিনেন কাপড়ের পর্দা। অনেকে ঘর সাজাতে বোহো ডেকোরেশন বেশ পছন্দ করছেন ইদানীয়।
আসবাবপত্র সাজানোর কৌশল
আসবাবপত্রগুলো কোনটা, কোথায়, কীভাবে রাখা হচ্ছে তার ওপরে ঘরের সৌন্দর্য অনেকটাই নির্ভর করে। শুধু দামি, আধুনিক আসবাব থাকলেই ঘর ভালোভাবে সাজানো যাবে, না থাকলে যাবে না, এমন কোনো কথা নেই। আসবাবপত্রের অবস্থান দক্ষতার সঙ্গে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, খেয়াল রাখতে হবে কোনো ঘরকে যেন বেশি আসবাবপত্র থাকার কারণে ফার্নিচারের দোকান বলে মনে না হয়। শুধু দামি আসবাবপত্রই আকর্ষণীয় নয়। ছিমছাম, সুন্দর ডিজাইনের আসবাব সবার কাছেই আকর্ষণীয়। পুরো ঘর ফার্নিচার দিয়ে যেন ঠাসা না থাকে। ঘরের ভেতর বাধাহীনভাবে চলাচল করার মতো যথেষ্ট জায়গা থাকতে হবে।
শোয়ার ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে বিছানার আকার ও অবস্থান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বিছানার প্রতি পাশে অন্তত দুই ফিট জায়গা খালি রাখা প্রয়োজন। এতে বিছানা গোছাতে সুবিধা হয়। বিছানা রাখতে হবে দরজার অন্তত ৩ ফিট দূরে। ঘরের জানালা ঘেঁষে বিছানা বা অন্য কোনো আসবাবপত্র রাখা অনুচিত। এতে ঘরে আলো-বাতাস প্রবেশে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।
বিছানা যদি ঘরের তুলনায় একটু বড় হয়, তাহলে ঘরে খোলা জায়গা বের করা একটু কঠিন। তবে অন্য আসবাবগুলো বুদ্ধি করে নির্বাচন করতে পারলে ঘরটাকে সুন্দর দেখাবে। এক্ষেত্রে অন্য ফার্নিচারগুলোর হতে হবে তুলনামূলকভাবে কম চওড়া।
ডাইনিং রুমের ক্ষেত্রে, ডাইনিং টেবিলের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। টেবিলটা এমনভাবে রাখতে হবে যেন, প্রতি পাশের দেয়াল থেকে টেবিলের মধ্যে অন্তত ৩৬ ইঞ্চি দূরত্ব থাকে। এতে সবার জন্যই চেয়ারগুলো ভালোভাবে টেনে আরামে বসা সম্ভব হবে।
ড্রয়িংরুমের ক্ষেত্রে দামি জিনিসপত্রের চেয়ে একটি আন্তরিক পরিবেশ থাকা বেশি জরুরি। সোফাগুলো এমনভাবে রাখতে হবে যেন ওই রুমে বসে থাকা প্রতিটি মানুষ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে গল্পগুজব করতে পারে।
ডাইনিং স্পেস ছোট হলে ভাঁজ করা যায় এমন ফার্নিচার বা মাল্টিপারপাস টেবিল ব্যবহার করা যেতে পারে। দেয়ালের পাশে ছোট সাইজের টেবিল রাখলে জায়গা বাঁচে। টেবিলের ওপরে হালকা ডেকোরেশন বা ছোট ফুলদানি রাখলে পরিবেশ সুন্দর লাগে। আলো ঠিকমতো থাকলে ছোট ডাইনিংও আকর্ষণীয় দেখাবে।
স্মার্ট স্টোরেজ আইডিয়া
ছোট বাসায় অনেক সময় জিনিস গুছিয়ে রাখার জায়গা পাওয়া যায় না। কিন্তু একটু পরিকল্পনা করলে সমাধান পাওয়া যায় সহজেই। দেয়ালের ফাঁকা জায়গায় শেলফ লাগিয়ে বই, শোপিস বা টব রাখা যায়। দরজার পেছনে ঝুলন্ত ব্যাগ বা অর্গানাইজার ব্যবহার করলে জামাকাপড়, ছোটখাটো জিনিস সহজে গুছিয়ে রাখা যায়। বিছানার নিচেও বক্স বা ড্রয়ার রাখা যায়, যেটা অনেকটা অদৃশ্য স্টোরেজ তৈরি করে দেয়। রান্নাঘরের মতো জায়গায়ও ঝুলন্ত শেলফ বা র্যাক ব্যবহার করা খুব কাজে আসে। এতে মেঝে খালি থাকে, আবার জিনিসও গুছিয়ে রাখা যায়।
ছোট ফার্নিচার ব্যবহার করে জায়গা বাঁচানো
ঘর ছোট হলে বড় সাইজের সোফা, ভারী ওয়্যারড্রোব বা বড় টেবিল রাখা উচিত নয়। এগুলো ঘরকে ভরাট এবং চাপা ভাব দেয়। তার বদলে মিনিমাল সাইজের হালকা ফার্নিচার নির্বাচন করুন। যেমনÑ দুই সিটের ছোট সোফা, প্লাই বা লাইটউডের টেবিল, ওয়াল মাউন্টেড ওপেন শেলফ। ছোট ফার্নিচার শুধু জায়গা বাঁচায় না, বরং ঘরকে খোলা ও ফ্রেশ দেখায়। আপনি চাইলে মেঝেতে কুশন সিটিংও রাখতে পারেন। এটি স্টাইলিশ এবং সাশ্রয়ী দুইই।
ছবি : ওমেগা হোম সল্যুশন