× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভূতের কুয়ো

মাসুম বিল্লাহ

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:১৩ পিএম

ভূতের কুয়ো

এক গরমের ছুটিতে আমি ও আমার বাবা-মা মিলে নানাবাড়ি বেড়াতে গেছি। শহর থেকে অনেক দূরে, ধূপছায়া গ্রাম। আমরা ট্রেনে করে যাচ্ছিলাম। পথে যেতে যেতে ছোট ছোট নদীর ওপর দিয়ে ছুটে চলছিল গাড়ি।

দূরে একটা একটা করে অচেনা গ্রাম, ফসলের মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছে আমাদের ট্রেন। জানালা দিয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। খুব ভালো লাগছিল। 

সন্ধ্যা পেরিয়ে নানাবাড়ি পৌঁছে গেলাম। আমার নানি ছিলেন গল্পের জাহাজ। তিনি অনেক গল্প জানতেন। তার নাম দিয়েছিলাম, ‘গল্পবলা বুড়ি’। আমি সবসময় নানির কাছে গল্প শোনার বায়না ধরতাম, ‘নানি, গল্প শোনাও’। সেবার নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে আমি নানিকে বললাম, ‘এবার একটা সত্যি ভূতের গল্প শোনাও।’ 

নানি পান চিবোতে চিবোতে বলল, ‘ভয় পাবি না তো, ভাই?’

‘না, আমি মোটেও ভয় পাই না, তুমি জলদি বলো।’ আমি নানিকে বলি। 

‘দেখিস, ভয়ের চোটে রাতে বিছানায় হিসু করে দিস না যেন।’ নানি হাসেন। 

‘না। না। তুমি বলো।’ 

নানি আরেকটা পান মুখে পুরে বলেন, আচ্ছা, শোন তাহলেÑ 

আমাদের পুরনো বাড়ির পেছনে একটা কুয়ো ছিল, আমরা বলতাম ‘পাতকুয়ো’। কিন্তু এখন গ্রামের সবাই ওটাকে বলে ‘ভূতের কুয়ো’! সেই কুয়ো থেকে রাতে গোঙানির শব্দ শোনা যায়। কেউ কুয়োর কাছে গেলেই ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায়। সবসময় কুয়োর চারপাশে কুয়াশা ঘিরে থাকে। এমনকি একবার এক লোক কুয়োর কাছে সাহস করে গিয়েছিল, পরে সে আর ফিরে আসেনি।

তারপর?

তারপর নানি আর কিছু বলতে চাননি। নানি ভেবেছিলেন যে, আমি ভয়ে কাঁপছি। তাই আর কিছু বলেননি। কিন্তু আমি ভয়ে নয় কৌতূহলে কাঁপছিলাম।


পরদিন সকালে দেরি করে ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙলে আমি মনে মনে ঠিক করি, বিকালে আমি কুয়োর কাছে যাব। কথাটা প্রথমে নানিকে বলতেই তিনি ‘না, না’ করে ওঠেন, ‘ওরে আমার পাগলা নাতির দেখি বেজায় সাহস!’ 

মা-বাবাও খুব রাগ করলেন। আমাকে বারবার সাবধান করে দিলেন, ‘খবরদার, এ কথা আর কখনও মুখেও এনো না।’

আমি মাথা নাড়লাম। কিন্তু আমার মনে কুয়োর রহস্য ঘুরপাক খেতে থাকে। বিকাল হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলাম। মন ছুটে গেছে কুয়োর কাছে।


খুব মনে আছে সেদিনের সেই সন্ধ্যা অদ্ভুত রকম নীরব ছিল। পাখিরাও গান বন্ধ করে দিল। আমি চুপি চুপি বাসার পেছন দিয়ে কুয়োর দিকে এগিয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে কুয়োর কাছে যেতেই দেখি নানির কথাটা সত্যি! কুয়োর চারপাশে মেঘের মতো কুয়াশা।

হঠাৎ-ই একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলামÑ 

সাহস করে কুয়োর কাছে এগিয়ে গেলাম। কুয়োর ভেতর উঁকি দিইÑ 

দেখি, একটা পুরনো টিনের বালতি নিজে নিজে ওপরে উঠছে। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে গেল। এক মুহূর্তে ঘুরে পেছনে সরে এলাম।

‘তুমি কে?’

হঠাৎ কেউ যেন ফিসফিসিয়ে বলল।

ঘাড় ঘুরিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার পিলে চমকে উঠল। দেখি একটা ছোট্ট ছেলে! কুয়োর ইটের দেয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ছেলেটির মুখে কাদামাটি আর শ্যাওলার দাগ। ঠোঁট কেটে রক্ত বের হচ্ছে। কিন্তু ছেলেটির মুখে মিষ্টি হাসি খেলা করছে।

সাহস নিয়ে বললাম, ‘আমি রায়ান...তুমি কি ভূত?’ 


ভূতের মতো ছেলেটি ফিসফিস করে বলল, ‘আমি একসময় এই গ্রামেই থাকতাম। একদিন খেলতে খেলতে এই কুয়োয় পড়ে গিয়েছিলাম। কেউ দেখেনি, কেউ আসেনি ... কেউ শোনেনি... আমার ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার...। এখন আমি এখানে একা একা খেলি!’


ছেলেটির কথা শুনে আমার চোখে জল এসে গেল। বললাম, ‘প্রতিবছর আমাদের দেশে এ রকম করে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে পানিতে ডুবে মারা যায়, সাঁতার জানত না বলে...ওদের মতো তুমিও কি... ’ আমি আর কথাটা শেষ করতে পারলাম না।

ছেলেটি বলল, ‘এটা তুমি ঠিক বলেছে রায়ান।’

‘তোমার নাম কী?’ আমি জানতে চাই। 

‘আগে নাম ছিলÑ বাবলু! এখন আর আমার কোনো নাম নেই। অবশ্য সবাই আমাকে এখন ‘কুয়োর ভূত’ বলে ডাকে।’ ছেলেটি আবারও মিষ্টি করে হাসল।

‘তুমি ভূত নয়, কিন্তু তুমি একা। আমি তোমার সঙ্গে গল্প করতে চাই। খেলতে চাই।’ আমি খুব ভালোবাসা নিয়ে বললাম।

আমার কথা শুনে ছেলেটির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। পরে আস্তে আস্তে করে বলল, ‘তুমি কি সত্যি বলছ?

‘হ্যাঁ।’ আমি মাথা কাত করে বলি।

‘তাহলে কাল বিকালে আবার এসো। আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্য...।’

পরদিন। আমি সবাইকে নিয়ে কুয়োর কাছে গেলাম। কিন্তু কেউ কিছু দেখতে পেল না। কুয়োটা ছিল খালি। পুরনো সেই টিনের জং পরা বালতিটা এক পাশে পড়ে আছে।

কিন্তু আমি জানিÑ 

সেই ছোট্ট ভূত-ছেলেটা এখানে আছে। সে এখন আর একা নয়। সে বিকালে আমার সঙ্গে গল্প করে, খেলে। আমি ওর জন্য বিস্কুট আর চকলেট নিয়ে আসি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা