দীপু মাহমুদ
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:৫৭ পিএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
মেঘমেদুর গ্রামের শিশুরা রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। ওরা শুনেছে রাতে আকাশ থেকে তারা নেমে আসে। তারারা আসে গল্প শুনতে। এ কথা গ্রামের সবাই জানে। তবে কেউ কোনো দিন আকাশ থেকে তারা নেমে আসতে দেখেনি। তবু শিশুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করত গল্প শুনতে কোনো তারা নেমে আসে কি না।
এ গ্রামের মেয়ে লুমিয়া। তার বয়স আট। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওদের বাড়ির পেছনে ঘনজঙ্গল। সেখান থেকে মাঝে মাঝে অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসে। লুমিয়া বাড়ির পেছনের জঙ্গলে যেতে চায়। সে বিশ্বাস করে একদিন আকাশ থেকে তারা নেমে আসবে গল্প শুনতে। তবে বাড়ির কেউ ওকে পেছনের জঙ্গলে যেতে দেয় না। বলে, ‘সেখানে ভয়ংকর শব্দ আছে। যেও না।’
শান্ত আর সাহসী মেয়ে লুমিয়া বলে, ‘যখন কোনো শব্দ পরিচিত হয়ে যায়, তখন আর সে ভয়ংকর থাকে না। কীসের শব্দ সেটা জানতে পারলেই শব্দ আমাদের পরিচিত হয়ে যাবে।’
বাড়ির মানুষের সঙ্গে গ্রামের মানুষও লুমিয়াকে সেখানে যেতে দেয় না। তবে এক রাতে লুমিয়া চুপি চুপি বাড়ির পেছনের ঘন জঙ্গলে চলে যায়। কিছুক্ষণ আগে সে দেখেছে একটা তারা আকাশ থেকে বাড়ির পেছনের ঘন জঙ্গলে খসে পড়েছে। তখন আকাশে পূর্ণিমার বিশাল চাঁদ। গাছপালায় ভরা ঘন জঙ্গল আলো হয়ে হয়ে আছে জোছনায়।
জঙ্গলে ঢুকে লুমিয়া শুনতে পেল খুব কাতর গলায় কে যেন বলছে, ‘এখানে কেউ আছ! আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।’
লুমিয়ার ভয় পাওয়ার কথা। সে সাহসী মেয়ে। তাই ভয় পেল না। যেখান থেকে আওয়াজ আসছে লুমিয়া সেখানে এগিয়ে গেল।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে লুমিয়া। ঘন জঙ্গলের ভেতর তার সামনে ছোট্ট কিছু নড়াচড়া করছে। পুরো শরীর আকাশের তারার মতো উজ্জ্বল। চোখ দুটো গভীর নীল।
লুমিয়া বলল, ‘কে তুমি?’
ছোট্ট প্রাণী উত্তর দিল, ‘আমি তারার মেয়ে নোভি।’
লুমিয়া ভীষণ খুশি হয়েছে। সে বলল, ‘তুমি গল্প শুনতে এসেছ!’
নোভি বলল, ‘আকাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলাম। আচমকা পৃথিবীতে পড়ে গেছি। আমার ডানার আলো নিভে গেছে। আকাশে আর ফিরে যেতে পারছি না। সকালে সূর্য ওঠার আগে আমার ডানায় আলো দরকার। তা না হলে কোনোদিন আকাশে ফিরে যেতে পারব না। পৃথিবীতে থেকে যেতে হবে।’
লুমিয়ার মন খারাপ হলো। মনে হলো নোভির জন্য কিছু করা দরকার। সে বলল, ‘তোমাকে সাহায্য করব, নোভি।’
নোভি হাসছে। রিনরিন মিষ্টি ঘণ্টা বাজার মতো আওয়াজ।
লুমিয়া বলল, ‘কেমন করে সূর্য ওঠার আগে তোমার ডানার আলো জ্বালানো যাবে?’
নোভি বলল, ‘জোনাকির আলো।’
লুমিয়া বলল, ‘জোনাকির ঝাঁক আছে জঙ্গলের শেষ মাথায়। তবে অসুবিধা হচ্ছে সেখানে থাকে কালোমুখো ভয়ংকর এক পেঁচা। কিন্তু আমি জানি, ভয় পেলে আলো পাওয়া যাবে না।’
নোভিকে সঙ্গে নিয়ে লুমিয়া আলো খুঁজতে রওনা হলো। আকাশের চাঁদ আর তারারা তাদের আলো দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। অমনি তাদের পথ আটকে দাঁড়াল বিশাল কালো মুখের পেঁচা। তার চোখ রাগে লাল হয়ে আছে। কর্কশ গলায় বলল, ‘আমার জঙ্গলে কে ঢুকেছে?’
পেঁচার গলায় ভয়াবহ আওয়াজ শুনে নোভি লুকিয়ে পড়ল লুমিয়ার পেছনে।
লুমিয়া জানে ভয় পেলে আলো পাওয়া যাবে না। আলো পাওয়া না গেলে নোভি পুরোপুরি নিভে যাবে। শান্ত গলায় লুমিয়া বলল, আমরা কারও ক্ষতি করতে আসিনি। আমার বন্ধু আকাশে ফিরতে চায়। তার জোনাকির আলো দরকার।’
ভয়ংকর পেঁচা নোভির দিকে তাকাল। নোভিকে দেখে তার মুখ নরম হয়ে এল। দুঃখ পাওয়া গলায় বলল, ‘মানুষ ভয়ে আমার কাছে আসে না। তোমার অনেক সাহস। তুমি বন্ধুকে বাঁচাতে চাইছ। তুমি ভালো মানুষ।’
অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। পেঁচা তার ডানার নিচ থেকে বের করে নিয়ে এলো আলোভরা জোনাক পাত্র। বলল, ‘এটা নিয়ে যাও। তোমার বন্ধুকে বাঁচাও।’
জোনাকভরা পাত্র নিয়ে লুমিয়া আর নোভি জঙ্গল ছেড়ে ছুটে গেল খোলা জায়গায়। জোনাকভরা পাত্র খুলে লুমিয়া আলো ঢালতে থাকল নোভির ডানায়। নোভি আলো পেয়ে ঝলমল করে উঠল।
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে লুমিয়া বলল, ‘আমি পেরেছি!’
আলোতে ঝলমলে নোভি বলল, ‘আবার আকাশে ফিরে যেতে পারব।’
লুমিয়া মুগ্ধ চোখে দেখল নোভির ডানা তারার আলোর মতো ঝিকমিক করছে।
সূর্য ওঠার আগেই লুমিয়া দুহাত বাড়িয়ে নোভিকে উড়িয়ে দিল। উড়ে যেতে যেতে নোভি বলল, ‘আজ রাতে আকাশে দেখবে ভীষণ উজ্জ্বল এক তারা। সেই তারাটি তোমার জন্য আমার উপহার।’
রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে লুমিয়া অবাক হয়ে গেল। আকাশে জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল তারা। যেন হাসছে। লুমিয়ার বন্ধু নোভির উপহার।