নুসরাত মুনা
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:৪৪ পিএম
বাংলাদেশে গ্রীষ্ম-বর্ষা মিলিয়ে মশার উপদ্রব যেন বছরের বেশিরভাগ সময়ই স্থায়ী। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এই ক্ষুদ্র পোকা। এখনও টেলিভিশন খুললে প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া যায়। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ আজ শুধু আরাম বা স্বস্তির বিষয় নয়, বরং একটি জরুরি স্বাস্থ্য সুরক্ষা। বাজারে প্রচুর স্প্রে, কয়েল বা মেশিন পাওয়া গেলেও এদের বেশিরভাগেই রাসায়নিক থাকে, যা শিশু নিরাপদ বা পরিবেশবান্ধব নয়। ফলে দিন দিন মানুষ প্রাকৃতিক বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় মশা-প্রতিরোধী গাছ।
প্রকৃতির কিছু গাছের স্বাভাবিক সুবাস ও উপাদান মশাকে দূরে রাখে। এগুলো সহজলভ্য এবং বাড়িতে সামান্য যত্নেই টবে চাষ করা যায়। বারান্দা, জানালা বা ছাদে এসব গাছ রাখলে মশার সংখ্যা চোখে পড়ার মতো কমে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন কোন গাছ মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর এবং কীভাবে এগুলো ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ লাভ পাওয়া যায়।
তুলসী
প্রাচীন ঔষধি গাছের আধুনিক ব্যবহার হলো তুলসী। দক্ষিণ এশিয়ার ঘরে ঘরে পরিচিত একটি ঔষধি গাছ। তবে এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো, তুলসীর তীব্র এবং ঘন সুবাস মশা সহ্য করতে পারে না। তুলসীর শুধু ফুল নয়, ঘ্রাণ ছড়ায় পাতাও। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তুলসী পাতার সুগন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে মশার উপস্থিতি কমায়। তুলসী খুব দ্রুত জন্মায় এবং খুব বেশি পানি বা সারও লাগে না। বারান্দার রোদেলা অংশে একটি বড় টবেই এটি সহজে বাড়তে পারে। তুলসী ঘরকে শুধু মশামুক্তই রাখে না, বরং পরিবেশে একটি সতেজ, পরিষ্কার অনুভূতি নিয়ে আসে।

লেমনগ্রাস বা সিট্রোনেলা
মশা দূর করার প্রকৃতির সেরা উপায় লেমনগ্রাস। মশা তাড়ানোর নামে যেসব স্প্রে বা মোমবাতি বাজারে পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগেই থাকে সিট্রোনেলা অয়েল। এই তেল আসে লেমনগ্রাস থেকে। এর স্বাভাবিক গন্ধ মশার কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর। কিন্তু মানুষের কাছে এটি সতেজ ও শীতল অনুভূতি দেয়। লেমনগ্রাস দ্রুত বড় হয় এবং ঝোপের মতো আকৃতি নেয়, তাই বাগান বা টব দুভাবেই ভালোভাবে মানিয়ে যায়। আপনি চাইলে এর পাতা চায়েও ব্যবহার করতে পারেন। এর হারবাল ঘ্রাণ বারান্দা বা জানালার কাছে ছড়িয়ে দিলে মশা আর পোকামাকড় কাছে আসে না।
পুদিনা
ছোট গাছেই বড় কাজ। পুদিনার গন্ধ আমাদের কাছে যতটা মনোরম, মশার কাছে ঠিক ততটাই বিরক্তিকর। রান্নাঘরের জানালার পাশে বা শোবার ঘরের বারান্দায় পুদিনা রাখলে মশার সংখ্যা অনেকটাই কমে। এটি খুব দ্রুত ছড়ায়, তাই ছোট একটি ডাঁটা থেকে সহজেই নতুন গাছ তৈরি হয়। পাশাপাশি সালাদ, ডাল, পানীয় বা চায়ে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এটি বাড়িতে রাখার আরও একটি বড় সুবিধা।
গাঁদা ফুল
সৌন্দর্য ও সুরক্ষা একসঙ্গে দেয় গাঁদা ফুল। গাঁদা ফুলের উজ্জ্বল কমলা বা হলুদ রঙ যেমন দৃষ্টি কাড়ে, তেমনি এর তীব্র গন্ধ মশার জন্য অপছন্দনীয়। বাড়ির গেটের কাছে, বাগানে, ছাদের কোণে বা ঘরের প্রবেশ পথে গাঁদার টব রাখলে মশা ভেতরে ঢোকার সম্ভাবনা কমে। গাঁদা খুব সহজে জন্মে এবং দীর্ঘদিন ফুল ধরে রাখে। ফলে এটি শুধু মশা কমায় না, ঘরের সৌন্দর্যও বাড়িয়ে তোলে।
রোজমেরি
রোজমেরি শুধু রান্নার মসলা নয়, এর সুগন্ধ মশাও দূরে রাখে। রোজমেরির তীক্ষ্ণ সুবাস মশা দূরে রাখতে খুব কার্যকর। এটি সাধারণত রোদে ভালো বাড়ে, তাই বেলকনি বা রৌদ্রযুক্ত জানালার পাশে রাখাই ভালো। রান্নায়, বিশেষ করে মাংস বা স্যুপে, এটি ব্যবহার করা যায়। ফলে ঘরে রোজমেরি রাখলে একসঙ্গে লাভ হয় দুই দিকেই সুগন্ধ ও সুরক্ষা।
ল্যাভেন্ডার
সুবাসিত ঘর ও মশামুক্ত পরিবেশ দেয় ল্যাভেন্ডার। এর সুগন্ধ মানুষের জন্য শান্তিদায়ক, কিন্তু মশার কাছে এটি বিরক্তিকর। ল্যাভেন্ডার গাছ ঘরে রাখলে মশা ও পোকামাকড় কমে। শোবার ঘরে ল্যাভেন্ডার রাখলে ঘুমও ভালো হয়, কারণ এর প্রাকৃতিক সুবাস শরীর ও মনকে শান্ত করে।
বেসিল
বেসিল বিশ্বজুড়ে রান্নায় ব্যবহৃত হলেও এর সুবাস মশা দূর করতেও খুব কার্যকর। বিশেষত ‘সুইট বেসিল’ এবং ‘থাই বেসিল’ প্রজাতির গন্ধ মশাকে বিরক্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বেসিল পাতার প্রাকৃতিক তেল মশা তাড়ানোর ক্ষমতা রাখে। বেসিল সূর্যপ্রিয়, তাই রোদেলা বারান্দা বা জানালার পাশে রাখলে দ্রুত বাড়ে। টবে খুব সহজে চাষ করা যায় এবং বাড়ির রান্নাঘরেও সহজে ব্যবহার করা যায়। ফলে এটি একসঙ্গে সৌন্দর্য, সুবাস ও সুরক্ষা দেয়।
গাছগুলো কীভাবে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ উপকার পাবেন
মশা-প্রতিরোধী গাছের আসল কার্যকারিতা পেতে হলে এগুলো কোথায় ও কীভাবে রাখা হচ্ছে, সেই বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এসব গাছের সুবাস বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে কাজ করে, তাই বাড়ির জানালা, দরজা বা বারান্দার মতো বাতাস চলাচলের পথেই গাছগুলো রাখা সবচেয়ে উপযোগী। বাইরে থেকে বাতাস যখন ঘরে ঢোকে, তখন সেই সুবাসও ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে এবং মশা ভেতরে ঢোকার আগেই দূরে সরে যায়।
একসঙ্গে কয়েকটি গাছ রাখা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। একটি গাছের গন্ধ খুব দূর পর্যন্ত ছড়াতে পারে না, কিন্তু তুলসী, লেমনগ্রাস, গাঁদা বা পুদিনার মতো গাছগুলো পাশাপাশি রাখলে তাদের সম্মিলিত সুবাসে মশার উপদ্রব আরও কমে আসে। সন্ধ্যার ঠিক আগে গাছের পাতাগুলো হাত দিয়ে একটু নাড়লে সুগন্ধ আরও জোরালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা মশা প্রতিরোধে বেশ কার্যকর।
টবে যেন পানি জমে না থাকে, তা প্রতিদিন খেয়াল রাখা জরুরি। টবের নিচের প্লেটে পানি থেকে গেলে তা উল্টো মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে। তাই টবের পানি নিষ্কাশন ছিদ্র ঠিক আছে কি না এবং নিচে পানি জমছে কি না এই দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গাছ যেন অতিরিক্ত ঘন হয়ে না যায়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। খুব ঘন ঝোপে রূপ নিলে বাতাস ঢুকতে পারে না, ফলে গন্ধ ঠিকভাবে ছড়ায় না। তাই মাঝে মাঝে সাজিয়ে ছেঁটে দিতে হবে।
এভাবেই সঠিক যত্ন ও সঠিক স্থানে রাখার মাধ্যমে মশা-প্রতিরোধী গাছগুলো ঘরকে শুধু মশামুক্তই নয়, বরং মনোরম সুবাসে ভরিয়ে তুলতে পারে।