হট এয়ার বেলুনে
ইসতিয়াক আহমেদ
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:০৮ এএম
ঘুরে ঘুরে ঘুরাঘুরি করতে করতে আমরা বেড়িয়ে পড়েছিলাম হিমালয়কন্যা নামে খ্যাত মেঘের কোলে, পাহাড়ঘেঁষা এক দেশ নেপালের পথে। এই ট্রিপ শুধু একটা ভ্রমণ ছিল না- ছিল নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের সময়। যে ট্রিপে কখনও ৫০০০ ফিট ওপর থেকে প্যারাসুটে চেপে নেমে পড়েছিলাম আমরা, কখনো-বা বেলুনে চড়েই উঠে পড়েছিলাম ৪০০০ ফিট ওপরে। এমন সব অ্যাডভেঞ্চারের ভরপুর ছিল যে ট্রিপ। সেই ট্রিপের পোখারায় করা অ্যাডভেঞ্চার অ্যাকটিভিটিগুলোর গল্প বলব আজ।
আমাদের পোখারায় দ্বিতীয় সকাল ছিল সেই দিন। ঘুম থেকে উঠলাম যখন, তখনও ঠিক সকাল হয়নি। কিন্তু জলদি আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। একটু পরেই হোটেলে গাড়ি আসবে, আমাদের নিতে। আজ পোখারার ওয়েদারটা একটু বেশিই খারাপ। বৃষ্টি বৃষ্টি একটা ভাব আর প্রচণ্ড মেঘ। কিন্তু এতকিছু মাঝেও ৬টা বাজতেই আমরা সবাই নেমে পড়লাম হোটেলের রিসেপশনে। কারণ ইতোমধ্যে চলে এসেছে আমাদের জন্য নির্ধারিত গাড়ি। আমরা আজ করব হট এয়ার বেলুন অ্যাকটিভিটিটি। টিম ঘুরুঞ্চির ৬ জন আমরা এ যাত্রায় উঠে পড়লাম গাড়িতে। আমাদের সঙ্গে আরেকটি বাংলাদেশি পরিবার। দুজন বাচ্চাসহ সব মিলে ১০ জন আজকের দিনের সেকেন্ড হট এয়ার বেলুন ফ্লাইটের জন্য পথ চলা। গাড়িতেই দিয়ে দিলো একটি ফর্ম। বলতে পারেন বন্ড সাইনের ব্যাপার-স্যাপার। যা কোনো প্রকার দুর্ঘটনা ঘটলে অন্যকারও কোনো দায় নেই তার স্বীকারোক্তিপত্র। তবে হ্যাঁ, প্রায় ২০ হাজার ডলারের ইনস্যুরেন্স কাভারেজ পাবেন সেই যাত্রায়।

পথ ঘুরেই চললাম আমরা টেকঅফ সাইটের দিকে। ফেওয়া লেকের পশ্চিম পাশে সমতল ভূমিতেই যার কি না টেকঅফ পয়েন্ট। আমরা যখন পৌঁছালাম ওয়েদার এখন বেশ খারাপ। আকাশজুড়েই মেঘ আর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি। ইতোমধ্যেই চোখে ধরা দিলো হট এয়ার বেলুন তার ফাস্ট ফ্লাইট নিয়ে। এই হট এয়ার বেলুনের ফ্লাইট সাইট মূলত লাউরুক পাম ভ্যালির ২ কিলোমিটারের মধ্যেই। হট এয়ারের প্রায় সবকিছুই নির্ভর করে বাতাসের ওপর, তাই সময়ভেদে ও পরিস্থিতির ওপর পরিবর্তন হয় অনেক কিছু।
মূলত সকালে দুটি আর বিকালে একটি মোট তিনটি ফ্লাইট পরিচালিত হয় ড্রাই সিজেনে প্রতিদিন। তবে হ্যাঁ, যদি কি না ওয়েদার ভালো থাকে তবেই। যদি চান তবে ৫০% অ্যাডভান্স করেই বুক করতে পারবেন আর বাকি টাকা ফ্লাইটের আগেই প্রদান করতে হবে। খানিক বাদেই নেমে পড়ল ফাস্ট ফ্লাইট। এবার আমাদের ওঠার পালা। একজন নামলেই তবে কি না উঠতে পারেন আরেকজন। ১০ জন বাংলাদেশি আমরা, সঙ্গে আমাদের টার্কিস পাইলট।

পুরো সেটআপটা বেশ পেশাদারভাবে করা হয়। পাইলট আগে থেকেই সব সেফটি ব্রিফিং দিয়ে দেয়- কীভাবে দাঁড়াতে হবে, কখন বসে পড়তে হবে, আর ল্যান্ডিংয়ের সময় কীভাবে ব্যালান্স রাখতে হবে। তারপরেই শুরু হয় সেই মুহূর্ত… আগুনের শব্দে ধীরে ধীরে মাটি ছাড়ে আমাদের বেলুন।
Hot Air Balloon হলো অন্যতম নিরাপদ অ্যাকটিভিটিগুলোর মধ্যে একটি। এই ফ্লাইট মিনিমাম ৮ জন নিয়ে সহজেই উঠে পড়ে প্রায় ৪০০০ ফিট ওপরে। সাধারণ ফ্লাইট টাইম হয় ৩০ মিনিটের। কিন্তু এ যাত্রায় আমাদের ফ্লাইট টাইম যে অনেক দীর্ঘ হবে তা আগেই বলে দিয়েছিল পাইলট। ৪০০০ ফিট উপর থেকে পোখারা পুরো একটা বার্ডস আই ভিউ সঙ্গে অন্নপূর্ণা ও ফিসটেল এর অসাধারণ এক ভিউও পাওয়া সম্ভব। কিন্তু আজ ওয়েদার খারাপের জন্য অনেক কিছুই আমাদের কপালে নেই। এই বেলুন রাইডের সময়টা তেমনই একটা মুহূর্ত। আকাশে ভেসে থেকে বুঝলাম, শান্তি মানে আসলে কী। এই হট এয়ার বেলুনে যদি চড়তে চান তবে গুনতে হবে ১২০ ডলার। যদিও বিদেশিদের জন্য সেই খরচ ১৫০ ডলার। বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় ৩০ ডলার কম আমাদের জন্য। মূলত বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসেই ভিন্ন ভিন্ন লেয়ার ভিন্ন ভিন্ন পথে চলে। আর তাই ব্যবহার করে ঘুরে বেড়ায় হট এয়ার বেলুন।

প্রায় ৪০০০ ফিট উচ্চতায় এখন আমরা। নিচে ফেওয়া লেকের নীল জল চিকচিক করছে, দূরে দেখা যাচ্ছে ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা, আর এক পাশে মহামহি অন্নপূর্ণা রেঞ্জ। এই নীরবতা, এই ভেসে থাকা অনুভূতিÑ এটা শুধু রাইড না, এটা যেন স্বপ্নে আকাশে ভেসে থাকা।
-692d22793552d.jpeg)
এটা সত্যি একটা লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স। চারপাশে শুধু শান্তি, নীরবতা আর অসীম আকাশ। নিচের পোখারা শহরটা এখন মনে হচ্ছে একটা ছোট্ট খেলনার মতো। যারা পোখারা আসবেন, তাদের বলবÑ Hot Air Balloon Ride মিস করবেন না কখনোই।
সকালের ঠান্ডা হাওয়া, মেঘের ভেতর দিয়ে ওঠা সূর্য আর হিমালয়ের নিচে ভেসে থাকা এই মুহূর্তগুলো… এগুলোই আপনাকে পোখারাকে চিরদিন মনে করিয়ে দেবে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ভেসে থাকার পর শুরু হলো ধীরে ধীরে নামার পালা। পারফেক্ট ল্যান্ডিং সাইট খুঁজে। পাইলট নিখুঁতভাবে বেলুনটাকে মাঠে নামিয়ে দিলেন। পুরো অভিজ্ঞতা ছিল শান্ত, নিরাপদ এবং রোমাঞ্চকর। ল্যান্ডিংটা একদম স্মুথ ছিল! আর এখন মনে হচ্ছে, আমাদের জীবনের অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা হয়ে রয়েছে এই হট এয়ার বেলুনের এই রাইডটি।
নেপালের হট এয়ার বেলুন নিয়ে দরকারি তথ্য
ফ্লাইট শেষে পাইলট নিজ হাতে আমাদের সবাইকে প্রদান করলো সার্টিফিকেট। জীবনের অভিজ্ঞতার মুকুটে যা যুক্ত করল আরেকটি পালক। অসাধারণ এক অনুভূতি নিয়ে এবার আমাদের ফিরে চলার পালা। পাইলটকে সঙ্গে নিয়েই চললাম আমরা হোটেলের পথে।