প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১২:১৬ পিএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:৫৯ পিএম
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের মধ্য দিয়ে দেশে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯২ সালের এই আইনে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিবন্ধিত হয় রাজধানীর বসুন্ধরা অঞ্চলে অবস্থিত ‘নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং পরে ঢাকার তুরাগ নদের তীরে অবস্থিত ও ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি)’। এরপর থেকে একে একে রাজধানী ঢাকাসহ ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে আরও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে সরকার অনুমোদিত ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে আছে- ৫৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
ইউজিসির বিভিন্ন সময়ের তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে জানা গেছে, নানা সংকটের মধ্য দিয়ে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর একতরফা ভূমিকা ছিল। এরপরে সেশনজট মুক্তভাবে ১৯৯৬ সালে সরকার অনুমোদিত প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের গ্র্যাজুয়েটরা পাস করার পর পরই তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বেতনে চাকরি পাওয়ায় এবং ১৯৯৮ সালে ১৯৯২ সালের আইন সংশোধন করার ফলে বাড়তে থাকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা- যা রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে। শিক্ষাবিদদের মতেÑ এগুলো গড়ে উঠেছিল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকল্প হিসেবে নয়, বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় উৎসাহিত হয়েছিল। মূলত দুটি কারণে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ ঘটেছিল, এক : উচ্চশিক্ষার বর্ধিত চাহিদা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না, এবং দুই : সরকারি তহবিলের অভাব অর্থাৎ দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদা পূরণে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, সরকারের পক্ষে বাজেটে তা বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব না হওয়া।
বর্তমানে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় রাজধানীর বাইরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত আসনের কারণে, নিজের এলাকায় থেকে তুলনামূলত কম খরচে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এবং সেশনজটমুক্ত সময়োপযোগী শিক্ষা, আধুনিক অবকাঠামো ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার কারণে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে ঢাকার বাইরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে ঠিক কতজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে- তার কোনো হিসাব ইউজিসির কাছে পাওয়া যায়নি। এর কারণ হিসেবে ইউজিসি বলছেÑ শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া কঠিন। কারণ এই সংখ্যা পরিবর্তনশীল। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যার হিসাব গুছিয়ে আনার চেষ্টা করছি। অন্যদিকে ঢাকার বাইরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান, অবকাঠামোগত ও শিক্ষার সার্বিক পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অভিভাবকতুল্য এ সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানান- ঢাকার বাইরের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ও নান্দনিক ক্যাম্পাস আছে। এর মধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান থেকে শুরু করে সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি বেশ ভালো, আর কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলক পিছিয়ে আছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স খুব বেশি নয়। ঢাকার বাইরের বিছু বিশ্ববিদ্যালয় খুব ভালো সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং ভালোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে খুব ভালোভাবেই। তাদের শিক্ষার মান, গবেষণা ও অন্যান্য বিষয়ে আস্তে আস্তে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ শক্ত অবস্থান তৈরির দিকে যাচ্ছে। এদের শিক্ষকদের অনেকের পিএইচডি ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এদের পাবলিকেশন, গবেষণা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসনীয়, যা আমাদের শিক্ষার বিস্তারে আশার সঞ্চার করে। আর কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে যারা অনেকটা পিছিয়ে আছে। যাদের মধ্যে অনেকের ২০১০ সালের আইন অনুযায়ী ন্যূনতম সংখ্যক শিক্ষক, অধ্যাপক নেই; কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই এবং বেতন-ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচণ্ড রকমের কার্পণ্য রয়েছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকার কারণে নিয়মিত ক্লাস ও অন্যান্য কাজ-কর্মে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ল্যাব সুবিধা ও ক্যাম্পাসের ভেতরে সবুজ অংশের ঘাটতিও রয়েছে। এদেরকে বলছি আপনার শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি করেন, বেতন-ভাতা ঠিক মতো দেন, ল্যাব ও অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অর্থে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা পালন করুন। তবে কাউকে নিরুৎসাহিত করছি না।’
তিনি বলেন, ‘অর্থাৎ যারা ভালো করছে তাদেরকে কীভাবে আরও ভালোর দিকে এগিয়ে নেওয়া যায় সেই চিন্তাভাবনা আছে, তেমনই যেসব বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে আছেÑ তাদেরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করছি। বিশেষ করে যারা পিছিয়ে আছে; তাদের কোন কোন ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে তা ২০১০ সালের আইন অনুযায়ী ধরে ধরে পূরণ করার তাগিদ দিচ্ছি। আমরা আশা করছি ধাপে ধাপে ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একসময় সামনের সারিতে চলে আসবে।’
ঢাকার বাইরে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে : বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তালিকা ঘেঁটে ঢাকার বাইরের ৫৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পাওয়া গেছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে; স্থায়ী ক্যাম্পাস ও পর্যাপ্ত শিক্ষক-কর্মকর্তা ও গবেষণাগার, ল্যাব, লাইব্রেরি ও অন্যান্য সুবিধাসহ শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ আছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিশ্ববিদ্যালয় হলো: চট্টগ্রামের ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রাম ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি এবং প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি। খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলোজি, সিলেটের মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বগুড়ার পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, নারায়ণগঞ্জের গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জের হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, শরীয়তপুরের- জেডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশালের গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ও ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ, রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কিশোরগঞ্জের ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ফেনীর ফেনী বিশ্ববিদ্যালয় ও ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (নাটোরে অবস্থিত), বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (কুমিল্লায় অবস্থিত)। এ ছাড়াও ফরিদপুরে (টাইমস বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ), কক্সবাজারে (কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি), গাজীপুরে (জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ) এবং বান্দরবানে (বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়সহ) বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আরও কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে; যেগুলো উচ্চশিক্ষা বিস্তারে অবদান রেখে চলেছে বলে জানা গেছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে শিক্ষাবিদরা বলছেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত থাকার কারণে প্রতিবছর ভর্তি পরীক্ষায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিলেও আসন পায় কেবল অল্পসংখ্যক। অন্যদিকে এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যাপ্ত আসন ও বিষয়ভিত্তিক ভর্তির সুযোগ দেয়। ফলে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথ যেমন প্রশস্ত হচ্ছে, তেমনই সেশনজটমুক্ত, নিরাপদ ও রাজনীতিমুক্ত পরিবেশে আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। বলা যায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা পদ্ধতি, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান ও চাকরির প্রস্তুতির জন্য যা প্রয়োজন তা পূরণ করার চেষ্টারত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন দেশের উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।