মো. নাঈম ইসলাম, শেরপুর
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১২ এএম
প্রবা ফটো
ফসলের দেবতা ও সূর্যদেবতাকে ধন্যবাদ জানাতে উদযাপন করা হয় ‘ওয়ানগালা’ উৎসব। শেরপুরের গারো পাহাড়ে গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবে গারোরা নতুন শস্য দেবতাদের কাছে উৎসর্গ করে এবং কৃতজ্ঞতা জানায়। গতকাল শুক্রবার শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়ে তিন দিনব্যাপী ওয়ানগালা উৎসবের উদ্বোধন করেন ঢাকার আর্চবিশপ কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি রোজারিও।
উৎসবের উদ্বোধন করে কার্ডিনাল বিশপ প্যাট্রিক ডি. রোজারিও বলেন, ‘যখনি আমরা উৎসবে মিলিত হই; তখন সেই উৎসবটা নদীর মোহনা হিসেবে কাজ করে। সেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কালপ্রবাহ মিলিত হয় এ মোহনায়। উৎসব মিলনের মোহনায়; আর সেই অনুভূতিতে মরিয়মনগর ধর্মপল্লী একত্রিত হচ্ছেÑ হবে আর আগামী তিনটি দিনের সমস্ত অনুষ্ঠান পালন করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠিকতা নয়, এটা জীবনের উদযাপন। জীবনের যা কিছু আছে, যা কিছু ছিল তারই অভিব্যক্তি, তারই প্রকাশ, তারই উদযাপন। কাজেই বাইর থেকে আমদানি করা কোনোকিছু নেই এখানে। এখানে আমাদের জীবনের যা বিশেষত্ব, যা পরম্পরাগতভাবে আমরা পেয়েছি। আমাদের পূর্বে যারা চলে গেছেন এবং এখন যারা আছেন। সেটি উদযাপন করছি এবং সেটা উদযাপনের সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চারিত করছি। অর্থাৎ ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জীবনযাত্রা, জীবনপ্রণালি, জীবনপদ্ধতি। আরও অনুপ্রাণিত করছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যেন তারাও তাদের জীবনকে উদযাপন করে।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মরিয়মনগর মিশনের পাল পুরোহিত ফাদার লরেন্স রিবেরু। এতে বক্তব্য দেন মরিয়মনগর ধর্মপল্লীর প্যারিস কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অনার্শন চাম্বুগং।
ভক্তরা জানায়, গারোদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ‘ওয়ানগালা’। ‘ওয়ানা’ শব্দের অর্থ দেবদেবীর দানের দ্রব্যসামগ্রী আর ‘গালা’ অর্থ উৎসর্গ করা। দেবদেবীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও মনোবাসনার নানা নিবেদন হয় এ উৎসবে। সাধারণত বর্ষার শেষে ও শীতের আগে, নতুন ফসল তোলার পর এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এর আগে নতুন খাদ্যশস্য ভোজন নিষেধ থাকে এ সম্প্রদায়ের জন্য। তাই অনেকেই একে নবান্ন বা ধন্যবাদের উৎসবও বলে থাকেন। আবার ওয়ানগালা উৎসব একশ ঢোলের উৎসব নামেও পরিচিত। গারোদের বিশ্বাস,‘মিসি সালজং’ বা শস্য দেবতার ওপর নির্ভর করে ফসলের ভালো ফলন। নতুন ফল ও ফসল ঘরে উঠবে, তার আগে শস্য দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই হবে। তাই শস্য দেবতাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ও নতুন ফসল খাওয়ার অনুমতির জন্য নেচে-গেয়ে উদযাপন করা হয় ঐতিহ্যবাহী ওয়ানগালা উৎসব। একই সঙ্গে পরিবারে ভালোবাসা, আনন্দ ও সব পরিবারের মঙ্গল কামনা করা হয় শস্য দেবতার কাছে।
এদিন শস্য দেবতাকে উৎসর্গ শেষে দেশ ও জাতির উন্নতি ও শান্তির জন্য প্রার্থনায় অংশ নেন গারোরা। পরে শিশু-কিশোরদের নতুন শস্য দিয়ে তৈরি মিষ্টি খাইয়ে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি।
স্থানীয় মরিয়মনগর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ২১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া তিন দিনের উৎসবটি চলবে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত। ওয়ানগালা উৎসবের আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, এ বছর উৎসব উপলক্ষে কিশোর-কিশোরীদের চিত্রাঙ্কন, ছড়া (মান্দি ভাষায়), নৃত্য, মিস ওয়ানগালা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা ও খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে বাণী পাঠ (মান্দিতে), খামালকে খুখুব ও থক্কা প্রদান, জনগণকে থক্কা দেওয়া, পবিত্র খ্রিস্টযাগ, দান সংগ্রহ, আলোচনা সভা, প্রার্থনা ও নকগাথা অনুষ্ঠান।
ওয়ানগালা উৎসব কমিটির আহ্বায়ক মরিয়মনগর ধর্মপল্লীর পালপুরোহিত ফাদার ফাদার লরেন্স রিবেরু সিএসসি জানান, ‘১৯৮৫ সাল থেকে মরিয়মনগর সাধু জর্জের ধর্মপল্লীর উদ্যোগে ওয়ানগালা উৎসব পালন করা হচ্ছে। প্রাচীনকাল থেকে গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্ম ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে তুলে ধরাই এর মূল লক্ষ্য।’