প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫১ পিএম
আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রাশিয়ার ক্যামচাটকা উপদ্বীপের উপকূলে গত ৩০ জুলাই ৮ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয় এবং রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের উপকূলীয় এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আধুনিক ভূকম্পবিদ্যার (সিসমোলজি) ইতিহাসে এই ভূমিকম্পটিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ১৯০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা তথ্য অনুযায়ী, মাত্রার দিক থেকে এটি ষষ্ঠ অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে।
ইতিহাসের ৫টি শক্তিশালী ভূমিকম্প
আধুনিক যুগে রেকর্ড করা ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে রাশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটির চেয়ে শক্তিশালী ছিল মাত্র ৫টি ভূমিকম্প। সেগুলো হলো-
১. চিলি (১৯৬০) : এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এটি। ১৯৬০ সালে চিলির ভালদিভিয়ায় আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৫। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যানুযায়ী, এতে ১ হাজার ৬৫৫ জন নিহত হন এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন।
২. আলাস্কা (১৯৬৪): শক্তিশালী ভূমিকম্পের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ১৯৬৪ সালের আলাস্কা ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৯ দশমিক ২।
৩. জাপান (২০১১): জাপানের তোহোকু ভূমিকম্পটি রয়েছে তালিকার তৃতীয় স্থানে। এই ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট বিধ্বংসী সুনামি ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক কেন্দ্রে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
৪. সুমাত্রা (২০০৪): চতুর্থ অবস্থানে আছে ২০০৪ সালের ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ভূমিকম্প, যার মাত্রা ছিল ৯ দশমিক ১। এই ভূমিকম্প ও পরবর্তী সুনামিতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
৫. রাশিয়া (১৯৫২): এবারের ভূমিকম্পের আগেও ১৯৫২ সালে রাশিয়ার ক্যামচাটকা উপদ্বীপের কাছে ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। হাওয়াই দ্বীপে বিশাল সুনামি সৃষ্টি করা সেই ভূমিকম্পটি রয়েছে তালিকার পঞ্চম স্থানে। ইউএসজিএসের তথ্য মতে, এর ফলে ‘হাওয়াইয়ে সৃষ্ট হওয়া বিশাল সুনামিতে এক মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়।’
এর আগে শক্তিশালী ভূমিকম্পের তালিকায় ২০১০ সালের চিলি এবং ১৯০৬ সালের ইকুয়েডর উপকূলের ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ওপরের দিকে ছিল। তবে রাশিয়ার সাম্প্রতিক ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পটি এখন সেই তালিকায় ষষ্ঠ স্থান দখল করেছে।
ভূমিকম্প থেকে কীভাবে সুনামির সৃষ্টি হয়?
পৃথিবীর উপরিভাগ বা ভূত্বক অখণ্ড কোনো অংশ নয়; এটি অনেকগুলো বিশাল খণ্ডে বিভক্ত, যেগুলোকে ‘টেকটোনিক প্লেট’ বলা হয়। এগুলো দেখতে অনেকটা পাজল বা ধাঁধার টুকরোর মতো। এই প্লেটগুলো স্থির নয়, খুব ধীরগতিতে নড়াচড়া করে—বছরে হয়তো কয়েক সেন্টিমিটার, যা আমাদের নখ বাড়ার গতির সঙ্গে তুলনীয়।
যখন দুটি প্লেট একে অপরের দিকে বা পাশ দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন ঘর্ষণের ফলে কখনো কখনো সেগুলো ‘আটকে’ যায়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে প্রচণ্ড চাপ বা শক্তি জমতে থাকে। একসময় এই চাপ সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেলে প্লেটগুলো হঠাৎ ঝাঁকুনি দেয় বা পিছলে যায়। এই সময় বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, যা আমরা ভূমিকম্প হিসেবে অনুভব করি।
এই ঘটনা যদি সমুদ্রের তলদেশে ঘটে, তবে প্লেটের স্থানচ্যুতির কারণে উপরের পানি সজোরে ধাক্কা খায় এবং বিশাল ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এই ঢেউ বা জলোচ্ছ্বাসই সুনামি হিসেবে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসে।
হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূকম্পবিদ্যা ও টেকটোনিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেলেন জানিশেভস্কি বিবিসিকে বলেন, ‘সুনামির ঢেউ সাধারণত জেট বিমানের গতিতে ছুটে চলে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে উপকূল পর্যন্ত পৌঁছাতে সুনামির ঢেউয়ের ঠিক ততটাই সময় লাগে, যতটা সময় একটি প্লেনের লাগে।’
সব ভূমিকম্প সুনামি সৃষ্টি করে না
যুক্তরাষ্ট্রের ওশানিক অ্যান্ড এটমোস্ফিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত কোনো ভূমিকম্পের মাত্রা ৮-এর বেশি না হলে তা বিপজ্জনক দূরবর্তী সুনামি সৃষ্টি করতে পারে না।
সংস্থাটি বলছে, সমুদ্রতলের স্থানচ্যুতির পরিমাণ, ভূমিকম্প যে অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে তার আয়তন এবং ভূমিকম্পের ওপরের পানির গভীরতা — এসবই সৃষ্ট সুনামির আকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এনওএএ আরো বলছে, সাত মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের ফলে বেশির ভাগ সুনামি সৃষ্টি হয়, যেগুলো সমুদ্রের নিচে বা খুব কাছাকাছি স্থানে ঘটে এবং পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ১০০ কিমি বা ৬২ মাইলের কম গভীরতায় হয়।
গ্লোবাল হিস্টোরিক্যাল সুনামি ডাটাবেইস অনুযায়ী, ৮৯ শতাংশ সুনামি সৃষ্টি হয়েছে বড় ভূমিকম্প বা ভূমিকম্প-সৃষ্ট ভূমিধসের মাধ্যমে।
সূত্র : বিবিসি