আইরীন নিয়াজী মান্না
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৩২ এএম
অলংকরণ : ইবতেসাম মাহবুব ইফাজ, তৃতীয় শ্রেণি, বি এ এফ শাহীন, কলেজ, ঢাকা
নীল সাইকেলে চড়ে রায়ান উড়ে চলেছে অবিরাম। এতদিন বাসার ছাদ থেকে দূরে যে বিশাল গাছগুলো শুধু দেখেছে, আজ তাদের ওপর দিয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে সে। কী যে আনন্দ হচ্ছে ওর। আজ যে রায়ানের জন্মদিন। তাই নীল সাইকেল ওকে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে।
শহরের কোলাহল ফেলে অনেক দূরে এক নির্জন এলাকায় চলে এলো ওরা। গ্রামীণ পিচঢালা পথে চাকা ঘষে বাতাসের গতিতে ছুটে চলল জাদুর সাইকেল। রায়ানকে নিয়ে শা শা করে ছুটে চলেছে সে। আশপাশের দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠ, দূরের বাড়িঘর মুহূর্তে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ওরা। বাতাসে শা শা করে উড়ছে ওর পরনের শার্ট, মাথার চুল।
রায়ান চিৎকার করে গাইছে আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে...। ওর দেখাদেখি জাদুর সাইকেলও গেয়ে উঠল, ... গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ, আমার মন ভোলায় রে...।
রায়ান অবাক হয়ে বলল, নীল সাইকেল, তুমি গানও গাই তে পারো!
এবার জাদুর সাইকেল ওকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল, আমি গাইতে পারি, আঁকতে পারি, করতে পারি খেলা/এসব নিয়েই আমার কাটছে সারাবেলা!
এবার রায়ানের আরও অবাক হওয়ার পালা! তুমি ছড়াও বলতে পারো! ও চিৎকার করে বলল।
জাদুর সাইকেল এবার ঘাড় ফিরিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল : রায়ান খোকা, আমি সব পারি। আমি জাদুর সাইকেল যে।
কথা বলতে বলতেই জাদুর সাইকেল মাটির পথ ছাড়িয়ে প্লেনের মতো টেকঅফ করে উড়তে শুরু করল। রায়ানের মনে হলো ওরা যখন প্লেনে চড়ে সেজো খালার কাছে আমেরিকায় যায় তখন ঠিক এভাবেই বিশাল প্লেনটা ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে টেকঅফ করে। ও আনন্দে হাততালি দিতে চাইল। কিন্তু পারল না। দুই হাত দিয়ে ও যে শক্ত করে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে রেখেছে।
উড়তে উড়তে একসময় দূর থেকে রায়ানের চোখে পড়ল বিশাল এক নীল পাহাড়। আনন্দে রায়ান চিৎকার করে উঠল : জাদুর সাইকেল ওই দেখ নীল পাহাড় দেখা যাচ্ছে।
নীল সাইকেল আস্তে করে নীল পাহাড়ের চূড়ায় নামল। এ এক অদ্ভূত পাহাড়, ওর ঘাস-মাটি-গাছ সব নীল। চারদিকে তাকালে দেখা যায় নীল মেঘ ঘিরে রেখেছে এ পাহাড়কে। রায়ানের পাশ দিয়ে পেঁজা তুলার মতো নীল মেঘ ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। রায়ান পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে তার পেছন পেছন। গাছে গাছে পাখিরা গান গাইছে। গাছের রঙও নীল, সব পাতা নীল। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে রায়ানের। লাল-নীল ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে। হাজার হাজার ফড়িং বাতাসে উড়ছে। দেখে দেখে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। বাহারি প্রজাপতিরা পাখনায় রঙ মেখে ঘুরছে ফুলের বনে। ফুলের বুকে বসে বসে আপন মনে মধু খাচ্ছে তারা।
হাঁটতে হাঁটতে ফুলের বাগানে ঢুকে পড়ে রায়ান। ওর পাশে নীল সাইকেল। একটা নীল ফড়িং উড়তে উড়তে ওর পাশে চলে এলো। তার পাশে একটা মেয়ে ফড়িংও এলো। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ওরা দুজনে একসঙ্গে বলে উঠল : শুভ জন্মদিন রায়ান।
রায়ান অবাক হয়ে তাকাল ওদের দিকে। বলল : আমার জন্মদিন তোমরা জানলে কীভাবে!
ওর কথা শুনে সারা বাগান হেসে উঠল। এবার সব ফড়িং, প্রজাপতি আর পাখিরা একসঙ্গে বলল : শুভ জন্মদিন রায়ান। তোমার কল্যাণ হোক।
জাদুর সাইকেল রায়ানের অবাক করা চেহারা দেখে মুচকি হেসে বলল, খোকা, ওরা তোমার সব জানে।
জুঁই ফুলের ঝোপ থেকে নেমে বাতাসে উড়তে উড়তে একটি সুখপাখি বলল : তোমাকে আমরা সেই কবে থেকে চিনি! যেদিন তোমার জন্ম হলো, আমরাই তো গান গাইছিলাম। তোমার মনে নেই? প্রতিদিন বিকালে ছাদে দাঁড়িয়ে তুমি ফুল দেখ, পাখি দেখ, প্রকৃতি দেখ। আর আমরা তোমাকে দেখি। আমরা জানি তুমি প্রকৃতি ভালোবাসো। তাই আমরাও তোমাকে ভালোবাসি রায়ান সোনা।
সুখপাখির কথা শুনে রায়ানের মনে পড়ে গেল মা প্রায়ই বলে, ওর যেদিন জন্ম হলো সেদিন গাছে গাছে পাখিরা গান গেয়ে উঠেছিল। নতুন নতুন ফুল ফুটেছিল সেদিন। সে রাতে নাকি আকাশে অনেক তারা ছিল।
রায়ান ভীষণ খুশি হলো। ফুল-পাখি-ফড়িং আর প্রজাপতিদের বারবার ধন্যবাদ দিয়ে বাগান থেকে বেরিয়ে এলো।
আবার ওরা উড়তে শুরু করল। পাহাড়-নদী-বন পেরিয়ে ওরা ছুটে চলল নতুনের সন্ধানে। রায়ানের দুচোখ ভরা স্বপ্ন, মন ভরা আনন্দ। আজ কোনো বাধা নেই, নিষেধ নেই, মায়ের শাসন নেই, লেখাপড়ার চাপ নেই। আজ শুধু ঘুরে বেড়ানোর পালা। আজ যে ওর জন্মদিন!
হঠাৎ রায়ানের ঘুম ভেঙে গেল। নিজেকে আবিষ্কার করল বিছানায়! চোখ মেলে তাকাতেই দেখল মা দাঁড়িয়ে আছে পাশে। ওকে চোখ মেলতে দেখেই মা বলল : শুভ জন্মদিন রায়ান। ওঠো, ওঠো। সারা আপি আর মানহা-জারাফ তোমার জন্য কেক নিয়ে অপেক্ষা করছে।