রাসেল আহমদ
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪১ পিএম
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫৯ পিএম
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষ বরুণ নামটির সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত। হাওরের বৈশিষ্ট্যময় উদ্ভিদ বরুণের কচি ডগা ভর্তা-ভাজি করে গৃহস্থ নারীরা ধানকাটার মৌসুমে কামলাদের (শ্রমিক) খেতে দেন। বসন্তের শুরুতে সাদা ফুলে ছেয়ে যায় বরুণের ডাল। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে হাওরাঞ্চলের নারীরা সংগ্রহ করেন বরুণের ফুল। গ্রামময় গোবরের দলায় গেঁথে দেওয়া হয় বরুণ ফুল, আসছে বছরে পরিবার ও গ্রামসমাজের মঙ্গল কামনায়। বারো মাসের তেরোটি পর্বের মধ্যে এ পর্বটি হাওরাঞ্চলে আড়িবিষ্ণু সংক্রান্তি নামে পরিচিত।
অতঃপর প্রতি বর্ষায় হাওরের বিস্তৃত ভাসান পানির সঙ্গে দেখা হয় বরুণের। তখন বরুণের ডালে থোকা থোকা ফল। যেসব ফলের ভেতরেই থাকে আগামী দিনের অনন্য সব বরুণের সম্ভাবনার বীজ।
হাওরাঞ্চলে কমবেশি আট মাস পানি থাকে। শুকনো মৌসুম চার মাস। বর্ষাকালে হাওরজুড়ে ভাসান পানির থইথই। তবে বর্ষার শুরু থেকেই ভাসান পানির সঙ্গী হয় ফলন্ত পোয়াতি বরুণের ঘাড় উঁচু সব ডাল। বরুণগাছ ছাড়াও আরেক বরুণ হাওর জনপদে ভাসান পানির সঙ্গী হয়েছিলেন। কাগজপত্রে প্রসূন কান্তি রায় (বরুণ) নাম থাকলেও তিনি বরুণ রায় নামেই জয় করেছিলেন হাওরবাসীর বিশ্বাস।
বদ্ধ জলমহাল
প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস এই হাওরাঞ্চলের ৮০ ভাগ কৃষিজমি একফসলি। তবে একফসলি কৃষিজমি এখানকার অর্থনীতির একমাত্র স্তম্ভ নয়। এখানে হাওরের পানিতে থাকা মাছ অর্থনীতির আরেকটি স্তম্ভ। প্রাগৈতিহাসিক কাল ধরে হাওরের এই প্রাকৃতিক সম্পদ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে হাওরবাসীর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। সময়ের ব্যবধানে রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আইন-কানুনের বদৌলতে হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ যাদের দখল থাকার কথা তারা হারিয়ে ফেলে সেই অধিকার।
রাষ্ট্রের রাজস্ব উন্নয়নের নাম করে জমিদারি প্রথার পর হাওরাঞ্চল প্রশ্নহীনভাবে দখল করে নেয় প্রশ্নবিদ্ধ অন্যায় ইজারাদারি ব্যবস্থা। মধ্যযুগীয় সামন্তবাদী কায়দায় ইজারাদাররা কিছুদিনের মধ্যেই ‘ওয়াটার লর্ড’ নামে গোটা হাওর এলাকার দখলদার হয়ে ওঠে। অন্যায়ভাবে তারা হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষক ও জেলেদের বর্ষায় হাওর ও বিলের বিস্তৃত ভাসান পানিতে মাছ ধরার প্রথাগত অধিকার কেড়ে নেয়। এদিকে রাষ্ট্রও সমানে রাজস্ব আদায়ের নাম করে দেশের সব হাওর-বিল, জলাভূমি ইজারা দিতে থাকে। সমগ্র হাওরাঞ্চলের হাওর ও বিলগুলোকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ হিসেবে দেখিয়ে ইজারা দেওয়ার অবৈধ প্রক্রিয়ায় হাওর-বিলগুলো ইজারা গ্রহণকারীর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। হাওরাঞ্চলে শুকনো মৌসুমে পানি কমে আবার হাওর ও বিলে এসে স্থিত হলেও বর্ষায় হাওর-বিলের জলরাশি বিস্তৃত হয়ে ভাসান পানিতে পরিণত হয়। ‘বদ্ধ জলমহাল’ দাবি করে সেই বিস্তৃত জলরাশিতে রাষ্ট্রীয় মদতে ও পেশীশক্তির বলে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্যায়-অন্যায্য কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ইজারাদারি শাসন।
বহিরাগত ও স্থানীয় পুঁজিপতি, ধনীক শ্রেণির প্রভাবশালীরা মৎস্যজীবী সংগঠনের নামে কেবল হাওর ও বিলগুলো নয়, নদী পর্যন্ত ইজারা নেওয়ার মতো বাহাদুরিও করছে গোটা হাওরাঞ্চলে।

বরুণ রায়
ধরা যাক, একটি ২০ একর বা তার ওপরের হাওর বিল (সরকারের ভাষায় যা জলমহাল) ইজারা দিয়েছে সরকার। ওই বিলের সীমানা শুকনো মৌসুমে ২০ একর হলেও বর্ষাকালে প্লাবনে ভেসে যায় চারদিক। তখন আর কোনো সীমানা থাকে না এসব হাওর-বিলের, রূপ নেয় ভাসান পানিতে। ২০ একরের ভেতরের মাছসহ সব জলজ প্রাণ তখন বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় যদি কোনো দরিদ্র প্রান্তিক কৃষক, জেলে বা যে কেউ এই ভাসান পানিতে মাছ ধরতে যায়, তবে ইজারাদার তাকে বাধা দেয়। ভাসান পানিতে হাওরাঞ্চলের দরিদ্র জেলে-কৃষকদের মাছ ধরতে দেওয়া হয় না। ইজারাদার তার ইজারাকৃত জলাশয়ের সীমানাকে ২০ একরের আইনি সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে ভাসান পানিতেও তার মাছ ভেসে গেছে বলে ওই মাছ না ধরার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে। শুধু বাধা প্রদানে সীমাবদ্ধ থাকে না নব্য সামন্তপ্রভু হয়ে ওঠা ইজারাদার গোষ্ঠী। তাদের লাঠিয়াল বাহিনীর নির্যাতন, মারধরের শিকার হতে থাকে ভাসান পানিতে মাছ ধরতে আসা জেলে-কৃষকরা। নিজেদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে খুন-খারাবি করতে পিছপা হয় না ইজারাদার গোষ্ঠী।
ভাসান পানি আন্দোলন
বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ হাওরের ভাসান পানিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা দরিদ্র জেলে-কৃষকের প্রথাগত অধিকার। হাওর জনপদে মানব বসতির সূচনালগ্ন থেকে এমনটা চলে আসছে। ধানের আবাদ না করলে যেমন হাওরবাসীর চলে না, তেমনি মাছ না ধরলেও হাওরবাসীর চলে না। কিন্তু হাওরাঞ্চলে ভাসান পানিতে ইজারাদারি প্রথা মধ্যযুগীয় বর্বরতার সৃষ্টি করে।
হাওর নদীর বাঁকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বরুণ বৃক্ষ আর ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে বিস্তীর্ণ ভাসান পানিতে ছড়িয়ে থাকা বরুণ ফলেরা এ বর্বরতার সাক্ষী হয়, বেদনায় আহাজারি করে। বরুণ রায় বরুণ ফলের ভেতরের সেই আহাজারি টের পেয়েছিলেন। তাই বরুণ ফলের মতো তিনিও সঙ্গী হয়েছিলেন ভাসান পানির।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ভাসান পানিতে জেলে-কৃষকের অধিকারের দাবিতে সংগঠিত এক গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বরুণ রায়।
হাওরাঞ্চলে আশির দশকে বরুণ রায়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার আন্দোলন। আইনগত স্বীকৃতি ছাড়াই ব্যাপক বিস্তৃত হয় ও সক্রিয় গণসমর্থন অর্জন করে ভাসান পানি আন্দোলন। ইজারাদার ও শাসক মহলের ভিত কাঁপিয়ে দেয় এই আন্দোলন। আন্দোলনটি অল্প সময়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে বিশেষ করে বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের প্রতিটি জনপদে। আন্দোলনের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
জেল-জুলুম-হুলিয়া এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বরুণ রায়ের নেতৃত্বে ভাসান পানি আন্দোলনটি একপর্যায়ে হাওরবাসীর আন্দোলনে রূপ নেয়। কিন্তু সবকিছু পক্ষে থাকার পরও একসময় ঝিমিয়ে পড়ে ভাসান পানি আন্দোলন।
শাসকদের ষড়যন্ত্র, আন্দোলনকারীদের ভেতরে শাসক ও ইজারাদার গোষ্ঠীর দালালদের অনুপ্রবেশ, বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে বিভিন্ন স্থানে নেতৃত্ব শূন্যতা, কিছু এলাকায় মৎস্যজীবীদের ইজারাদার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সমর্থন, আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ইজারাদাররূপে আবির্ভাবসহ বিভিন্ন কারণেই আন্দোলনটি দুর্বল হতে থাকে। আর একজন বরুণ রায় সবাইকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েন।
নব্বইয়ের দশকে সীমিত পরিসরে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও তাহিরপুরে আবারও ভাসান পানি আন্দোলন গড়ে ওঠে। এর নেতৃত্বে ছিলেন ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের কৃষক নেতা খায়রুল বসর ঠাকুর, শাহজাহান কবীর, তাহিরপুরের আইয়ুব উদ্দিন শরীফ প্রমুখ। বিংশ শতাব্দীর শেষ সময়ে তাদের নেতৃত্বে আন্দোলনটি আবারও প্রাণ ফিরে পায়।
এ সময় ধর্মপাশার মেদা বিল, কালিজানা হাওর, সুনুই নদী, টগার হাওর তাহিরপুরের শনির হাওর, মাটিয়াইন হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ বিভিন্ন হাওর-বিলে সীমানা নির্ধারণের দাবিতে ব্যাপকভাবে আন্দোলন গড়ে উঠে। একই সময়ে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় ভাসান পানি আন্দোলনের ঢেউ লাগে। আন্দোলন গড়ে উঠে বিশ্বম্ভপুরের আবুয়া নদীতে।
,,,তবে তাহিরপুরে আন্দোলনের তীব্রতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। ফলে ইজারাদার গোষ্ঠী আন্দোলনরত জেলে-কৃষকদের দমন-পীড়নে মামলা-মোকদ্দমার পাশাপাশি পুলিশি নির্যাতনসহ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ১৯৯৮, ১৯৯৯ ও ২০০০ সাল এই তিন বছরে ইজারাদারের লাঠিয়াল বাহিনীর বন্দুকের গুলিতে এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারান ১১ জন আন্দোলনকর্মী। আহত হন আন্দোলনরত শত শত জেলে-কৃষক। জেল খেটেছেন অনেকেই।
তাহিরপুরে এ আন্দোলনে জেলে-কৃষকদের নেতৃত্ব দেন কৃষক সংগ্রাম সমিতির নেতা আইয়ুব উদ্দিন শরীফ, গোলাম মোস্তফা কালা মিয়া, আকিকুর রেজাসহ অনেকেই। এ সময় গোটা হাওরাঞ্চলে ভাসান পানি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সুনামগঞ্জের কৃষক নেতা মানিক লাল রায়, অ্যাডভোকেট নিরঞ্জন তালুকদার, তরুণ কৃষক নেতা শাহজাহান কবীর, বাদশাগঞ্জের কৃষক নেতা খায়রুল বসর ঠাকুর খান প্রমুখ। আইনগত সহায়তা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে আন্দোলনকে গতিশীল রাখতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন সিলেটের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন, অ্যাডভোকেট কুমার চন্দ্র রায় প্রমুখ।
কিন্তু একপর্যায়ে আবারও প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠী ও ইজারাদারদের ষড়যন্ত্রে বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত আন্দোলন হটকারিতায় রূপ নেয়। এ সময় তাহিরপুরের রতনশ্রী গ্রামের আন্দোলনকর্মী জেলে-কৃষকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয় এবং আন্দোলনকারী ও গ্রামবাসী দেড় ডজন পুলিশসহ একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে দিনব্যাপী অবরুদ্ধ কর রাখে। পরে সুনামগঞ্জের ডিসি ও এসপি ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমঝোতা করে অবরুদ্ধ পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটকে উদ্ধার করে। প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোও আন্দোলনকারীদের সমর্থনের কথা বলে আন্দোলনের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি করে। এ ছাড়া মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলা করতে গিয়ে আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্ব অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এভাবেই হাওরাঞ্চলের গণমানুষের প্রথাগত অধিকার আদায়ের গণআন্দোলনটি আবারও ঝিমিয়ে পড়তে থাকে।
আন্দোলন ঝিমিয়ে গেলেও ভাটিবাংলার বরুণের ডালে ডালে ঝুলে থাকা বরুণ ফলের ভেতর সেই সব স্মৃতিচিহ্নের দ্রোহময় ঝাঁজ এখনও বিরাজমান।
হাওরের ভাসান পানিও বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে বরুণ বৃক্ষের ছায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। বসন্তেই ফুটবে ফুল, তারপর বর্ষাতে ডালে ডালে থোকা থোকা ফল। আর ফলের ভেতরেই থাকবে আগামীর সব অপ্রতিরোধ্য সম্ভাবনা।
আবারও হাওর-ভাটির জলজনপদে বরুণের ফল থেকে গজাবে চিরঅম্লান বরুণেরা। অন্যায্য আর মধ্যযুগীয় ইজারাদারি প্রথা বাতিল করে হাওরের ভাসান পানিতে প্রান্তিক জনগণের অধিকার একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই হবে।
বরুণের বীজের ভেতর হাওর জনপদের সেই দ্রোহের ব্যঞ্জনা নিরন্তর বিরাজমান। বরুণ রায় বীজের ভেতর সেই সম্ভাবনা ও আহাজারিকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তাই ভাসান পানির সঙ্গী বরুণ বৃক্ষের দিকে আজও হাত বাড়িয়ে আছে বঞ্চিত হাওর।
হাওর বিল নদীর এই জলজনপদে নানান বৈরিতা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে আজও ঠিকে আছে বরুণ বৃক্ষ। তাই হাওরের জলে ভাসে আজও ভাসে বরুণ ফল। একদিন মাটির সংস্পর্শে সেই ফল থেকে জন্ম নেয় আবারও বরুণ বৃক্ষ। হাওরবাসীর বুকে স্বপ্ন এ জলজনপদে আবারও জন্ম নেবে বরুণ, বলবে-লড়বে বঞ্চিত মানুষের হয়ে, অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে।