মাহবুবা মিতু
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩১ পিএম
আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:০০ পিএম
‘বাচ্চা মানুষের আবার মন খারাপ কিসের?’Ñ এই প্রশ্নটি আমাদের সমাজে অত্যন্ত প্রচলিত। অভিভাবক হিসেবে আমরা প্রায়ই শিশুদের আবেগজনিত কষ্টকে গুরুত্ব দিতে চাই না, ভাবি অল্প সময়ের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে। খেলনা ভেঙে যাওয়া, পছন্দের খাবার না পাওয়া কিংবা বন্ধুর সঙ্গে সামান্য ঝগড়ার কারণে সন্তানের মুখ ভার হয়ে থাকাটা আমাদের চোখে স্রেফ ছোট্ট সমস্যা মনে হতে পারে। নিঃসন্দেহে, শিশুদের মন খারাপ হওয়াটা তাদের স্বাভাবিক আবেগগত বিকাশেরই অংশ। যেমন তারা আনন্দ প্রকাশ করে, তেমনই রাগ বা দুঃখও অনুভব করবে। কিন্তু যদি এই মন খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়? যদি সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়? যদি সে খেলাধুলা বা পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে? তখন কি আমরা বিষয়টিকে কেবল ‘বাচ্চামি’ বলে এড়িয়ে যেতে পারি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি মন খারাপ গভীর সমস্যার ইঙ্গিত না দিলেও, কিছু ক্ষেত্রে এই বিষণ্নতা শিশু বা কিশোর-কিশোরীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা ডিপ্রেশন বা উদ্বেগের মতো গুরুতর মানসিক সমস্যার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। তাই একজন দায়িত্বশীল অভিভাবকের মনে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কখন এটি সাধারণ মন খারাপ, আর কখন তা উদ্বেগের কারণ?

স্বাভাবিক মন খারাপ নাকি উদ্বেগের ইঙ্গিত
সব মন খারাপই যে বিপদের বার্তা দেয়, তা নয়। তবে মন খারাপের সময়কাল ও প্রভাব বুঝে নেওয়া জরুরি।
কখন সতর্ক হতে হবে
এ ধরনের আচরণ যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সেটি সামান্য নয়, বরং মানসিক চাপের ফল।
মন খারাপের সাধারণ কারণ
শিশুরা সংবেদনশীল, ছোট ঘটনাও তাদের মনে বড় প্রভাব ফেলে, তবে মন খারাপের নানা কারণ হতে পারেÑ
পারিবারিক চাপ : মা-বাবার মধ্যে অশান্তি, বিচ্ছেদ বা অতিরিক্ত পারিবারিক প্রত্যাশা।
সামাজিক চাপ : সহপাঠীদের দ্বারা হেনস্থা (বুলিং), সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা বন্ধুত্বের অভাব।
শিক্ষাগত চাপ : অতিরিক্ত পড়াশোনার বোঝা বা স্কুল-ভীতি।
শারীরিক কারণ : দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা পুষ্টির অভাব।
এমন নানা কারণেই শিশুর মেজাজ খারাপ হতে পারে। বেশিরভাগ সময় কয়েক ঘণ্টা বা একদিনেই তা কেটে যায়। কিন্তু যদি মন খারাপ ঘন ঘন হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন সতর্ক হওয়া দরকার।
অভিভাবকের করণীয়
এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের প্রথম করণীয় হচ্ছে, শিশুর মনের কথা বোঝার চেষ্টা করা, বিচারক না হয়ে বন্ধু হওয়া।
যোগাযোগ : সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করুন। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, যেন তারা নির্ভয়ে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।
স্বীকৃতি : তাদের মন খারাপ বা রাগকে ‘নাকচ’ করবেন না। বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি তোমার খারাপ লাগছে,’Ñ এর মাধ্যমে তাদের অনুভূতিকে বৈধতা দিন।
সময় দেওয়া : প্রতিদিন সন্তানের সঙ্গে গুণগত সময় কাটান, যা তাদের মানসিক নির্ভরতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
শান্ত পরিবেশ : বাড়িতে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। মনে রাখবেন, মা-বাবার মানসিক চাপও শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন
সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় বাবা-মায়ের সচেতনতাই প্রথম ধাপ। তবে যদি ‘উদ্বেগের কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত লক্ষণগুলো দেখা যায় এবং তা সন্তানের দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা বা সামাজিকতায় গুরুতর ব্যাঘাত ঘটায়, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। একজন মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সঠিক রোগনির্ণয় করে প্রয়োজনীয় থেরাপি বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন। সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নিলে শিশুর বড় ধরনের মানসিক বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব।
শিশুর মন খারাপ হওয়া মানেই সব সময় মানসিক রোগ নয়, তবে এটি একটি স্পষ্ট সতর্কতা সংকেত হতে পারে। যদি সেই মন খারাপ নিয়মিত হয়, হাসিখুশি শিশুটি ধীরে ধীরে চুপচাপ হয়ে যায়, তখন বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। বাবা-মায়ের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা বিচার করার পরিবর্তে, সন্তানের আচরণের দিকে গভীর মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাদের মনের কথা বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যাবশ্যক। শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যকেও গুরুত দিন। ভালোবাসা, সময় ও বোঝাপড়াÑ এই তিনটিই শিশুর মানসিক সুস্থতার মূল চাবিকাঠি। মনে রাখবেন, সুস্থ ও হাসিখুশি শৈশবই একটি স্থিতিশীল ও সুস্থ ভবিষ্যতের ভিত্তি। বাবা-মা যদি ধৈর্য ধরে পাশে থাকেন, তবে শিশুর মনও আবার রঙে ভরে উঠবে, ঠিক যেমন বৃষ্টির পর আকাশে দেখা দেয় রংধনু।