ঐতিহ্য
শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৫৫ এএম
বগুড়ার দই। স্বাদে ও গুণে অতুলনীয়। ভোজনবিলাসীদের কাছে খুবই প্রিয়। একবার খেলে বারবার খেতে মন চায়। এই দই ছাড়া সামাজিক ও ঘরোয়া অনুষ্ঠান যেন অপূর্ণ থেকে যায়।
বগুড়াকে অনেকেই বলেন ‘দইয়ের রাজধানী’। মূলত শেরপুর দইয়ের জন্য বিখ্যাত। রয়েছে আড়াইশ বছরের ঐতিহ্য। নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে মাইলফলক। সুখ্যাতি ছড়ানো সরার দই অর্জন করেছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি। সম্প্রতি এক সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) যাচাই-বাছাই শেষে বগুড়ার দইকে জিআই পণ্য হিসেবে অনুমোদন দেয়। এর ফলে নতুন সম্ভাবনার আলো দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে গন্তব্যের শেষ এখানেই নয়। বগুড়ার দই বিশ্বব্যাপী উপস্থাপন করতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল। বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন হলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়তে পারে বগুড়ার এই ঐতিহ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় আড়াইশ বছর আগে শেরপুর উপজেলা থেকে বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস শুরু হয়। তৎকালীন শেরপুরের ঘোষ পরিবারের ঘেটু ঘোষ প্রথম দই তৈরি শুরু করেন। তবে স্বাধীনতার পূর্বে শেরপুরে নীলকণ্ঠ ঘোষ, নারায়ণ ঘোষ, আনন্দ ঘোষ, সদানন্দ ঘোষ অর্থাৎ ঘোষ পরিবারের সদস্যদের হাতে প্রথমে সরার দইয়ের যাত্রা শুরু। শেরপুরে প্রায় ১৫০ বছর আগে সরার দই প্রসার লাভ করে নীলকণ্ঠ ঘোষের মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আস্তে আস্তে হিন্দু ও মুসলমান পরিবারের অনেকেই এ পেশায় যুক্ত হন। পরে শেরপুরের সাউদিয়া, জলযোগ, বৈকালী, সম্পা, চৈতি, ঊষা, লোকনাথ প্রভৃতি নামে দইয়ের দোকানের প্রসার ঘটে।
একসময় টক দইয়ের প্রচলন ছিল বেশি। বংশপরম্পরায় তা চিনিপাতা বা মিষ্টি দইয়ে রূপান্তরিত হয়। এভাবেই আস্তে আস্তে বগুড়ায় দইয়ের বিস্তৃত বাজার গড়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে যে প্যাকেট দই দেওয়া হয়, তা শীতকালে ৪-৫ দিন আর গরমের সময় ২-৩ দিন ভালো থাকে। প্রথমদিকে বিভিন্ন কারখানায় টক দই তৈরি হলেও স্বাদের বৈচিত্র্য ও চাহিদার কারণে মিষ্টি দই পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
দইয়ের এই খ্যাতি অর্জনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন শেরপুরের কারিগররা। ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি একচেটিয়া ব্যবসাও করছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে শেরপুরে দু’শতাধিক দইয়ের কারখানা বিদ্যমান। এসব কারখানায় কাজ করেন প্রায় আড়াই হাজার কর্মচারী। বিক্রয় কেন্দ্রের কর্মচারীসহ প্রায় পাঁচ হাজার জনশক্তি প্রত্যক্ষভাবে এ কাজে সম্পৃক্ত।
শেরপুর উপজেলায় প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চারশ মণ দই উৎপাদন হয়। একই সঙ্গে ক্ষীরশা, মিষ্টিসহ মাসে ২০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা অনলাইনেও দই বিক্রি করেন।
শেরপুরের দই ব্যবসায়ী পার্থ সারথী সাহা বলেন, ঐতিহ্য রক্ষা করে ব্যবসার চেষ্টা করি। দুধের দাম ওঠানামা এবং অন্যান্য সামগ্রীর দাম অতিরিক্ত হওয়ায় বর্তমানে দইয়ের দামও বেড়েছে। প্রতি কেজি দই ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
সম্পা দধি ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী গোপাল ঘোষ বলেন, শেরপুরের দই শুধু দেশেই নয়, উপহার হিসেবে অনেকেই ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, আমেরিকা-ইউরোপের বেশকিছু দেশে নিয়ে যান। এসব দেশে প্রবাসীরা বাংলাদেশি দইয়ের দোকান দিয়েছেন। এতে বাংলাদেশের দইয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। বিদেশের মাটিতে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে।
দই কিনতে আসা টাঙ্গাইলের অধিবাসী ইসমাইল হোসেন জানান, শেরপুরে সবচেয়ে ভালো দই পাওয়া যায়। এ এলাকার দইয়ের স্বাদ অতুলনীয়। এই স্বাদ প্রায় সময়ই আমাদের শেরপুরে টেনে আনে।