মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:১৪ পিএম
আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:৫২ পিএম
প্রবা ফটো
দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বিনামূল্যে নিজ এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার গাছ লাগিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন রংপুরের বৃক্ষপ্রেমিক দিনমজুর বাদশা মিয়া। তার লাগানো ফলদ গাছে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। আর এ কাজে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি পাখিরা পেয়েছে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল। বাদশা মিয়ার মত বৃক্ষপ্রেমিকদের উৎসাহ দিতে কাজ করার কথা জানিয়েছে সামাজিক বন বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুর নগরী থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়ন। বড়দরগা থেকে শানেরহাটের সড়কে ঢুকলে চোখে পড়বে দু’পাশে গাছের সারি। আম, জাম, কাঁঠাল, জলপাই, চালতা, তালসহ নানা ফলের গাছ। রাস্তার দু’ধারের গাছে সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা। সড়কের ভ্যান, রিক্সা, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ট্রাকসহ বিভিন্ন প্রকার যানবাহন চলাচল করছে। অনেকে দিনের ক্লান্তিতে জিরিয়ে নিতে বিশ্রাম নিচ্ছেন সুশীতল গাছের ছায়ায়। সেখানে নানা প্রজাতির পাখির কিচির-মিচির শব্দ। ছুটে চলছে এক গাছ থেকে আরেক গাছে। যেন তারা নিরাপদ আশ্রয়ে গাইছে জীবনের গান। এক সময়ের ফাঁকা সড়ককে সবুজে সু-সজ্জিত করার পেছনের কারিগরি বৃক্ষবন্ধু বাদশা মিয়া।
শানেরহাটের মেষ্টা গ্রামের বাসিন্দা বাদশা মিয়া পেশায় একজন গাছের চারা বিক্রেতা ছিলেন। নার্সারী থেকে চারা কিনে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে নানা ফলের চারা বিক্রি করতেন। প্রতিদিনের অবিক্রিত চারা বাড়িতে না এনে, সেগুলো শানেরহাটের সড়কের দু’ধারে, হাট-বাজার, গ্রামের মোড়ে, ঈদগাহ, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে রোপন করতেন তিনি। গাছ রোপন করলেও রক্ষাণাবেক্ষনের অভাবে প্রায় সময় গরু-ছাগল গাছগুলো খেয়ে ফেলতো। কিন্তু এতে দমে যাননি বাদশা মিয়া। গাছ নষ্ট হলে সেখানে আবারও গাছ রোপন করেছেন। সেই সাথে বিভিন্ন মানুষের বাড়ির আঙ্গিনা, পতিত জমিতে বিনামূল্যে তিনি গাছের চারা রোপন করে এসেছেন। তার রোপন করা গাছের চারা বাজাতপুর, পার্বতীপুর, শান্তিপুর, সখীপুর, স্বাদপুর, হাজীপুরসহ প্রায় ১৬টি গ্রামে রয়েছে।
বাদশা মিয়ার লাগানো পরিণত গাছগুলো এখন ফল দিচ্ছে। সময়ের বিবর্তনে দিনমজুর বাদশা মিয়া বার্ধক্যে চলে গেলেও গাছে লাগানোর নেশা তার কমেনি। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে গাছ রোপন করা বাদশা মিয়া এখনও সুযোগ পেলে গাছের পরিচর্যা ও সড়কের ধারে গাছ রোপন করেন। সেই সাথে সুযোগ পেলেই গাছ লাগানোর উপকারিতার কথা শোনান নানা বয়সী মানুষকে।
বিনামূল্যে গাছ রোপনের কারণে তাকে স্থানীয়রা ডাকেন ‘অক্সিজেন বাদশা, বৃক্ষ বন্ধু কিংবা গাছ পাগলা বাদশা’ নামে। সবুজায়নে সফল হলেও বাদশা মিয়ার ব্যক্তিগত জীবন কষ্টের। ভাইদের সাথে বিরোধের জেরে তিনি পৈত্রিক জমি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ভূমিহীন বাদশা মিয়া ছেলের কেনা ৪ শতক বাড়ির একটি বেড়ার ঘরে থাকেন। অনটনের সংসারের কারণে ছেলে মিলন মিয়া ও মেয়ে লাভলী আক্তারকে তেমন লেখাপড়া করাতে পারেননি।
মেস্টাগ্রামের সমাজকর্মী মোহসেনা বেগম বলেন, বাদশা চাচা সাইকেলে করে গাছ বিক্রি করত। এখন ওনার বয়স প্রায় ৭২ বছর। গাছ বিক্রি করে সংসার ঠিকমত চালাতে না পারলেও তিনি ২৫-৩০ বছর ধরে রাস্তার ধারে গাছ লাগিয়েছেন। সেই গাছ এখন বড় হয়ে ফল দিচ্ছে। এখন তিনি হাটতে পারেন না, শ্বাস কষ্ট। সরকারের উচিত এই বৃক্ষপ্রেমির পাশে দাঁড়ানো।
এলাকাবাসী সদর আলী বলেন, কোন কিছু পাওয়ার আশা না করে বাদশা মিয়া রাস্তার ধারে, মানুষের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে গাছ রোপন করেছেন। তার লাগানো গাছের ফল মানুষরা খাচ্ছে। গাছের ডালপালা, পাতা ব্যবহার করতে পারছে। রাস্তায় গাছের ছায়ায় মানুষ বিশ্রাম নিতে পারছে। তিনি একজন গাছ পাগল মানুষ। তার কাজের জন্য অনেকে তাকে পাগলা বাদশা, বৃক্ষ বন্ধু বলেও ডাকে।
বাদশার স্ত্রী মিনারা বেগম বলেন, “আস্তাত (রাস্তায়) গাছ লাগাইছিনু। কিন্তু খুঁটি দেয়ার পাইস্যা নাই। সেই সমায় বেটির (মেয়ের) কানের রিং বিক্রি করি গাছোত খুঁটি দিছনু। কতা ছিল দেওয়ানীর (স্বামীর) যা কামাই হইবে, সেইটার একটা টাকা দিয়া গাছ লাগামো। সেই কামই হামরা করি আসছি। এ্যালা দেওয়ানী কাম কইরবার পারে না।”
বৃক্ষ বন্ধু বাদশা মিয়া বলেন, “গ্রামোত ঘুরি ঘুরি গাছ বেঁচাইছি। দেখা যায় প্রায় দিন ১০টা গাছ নিয়া গেইলে ৪টা গাছ বিক্রি হয় না। সেই গাছ মুই বাড়িত ঘুরি আনো নাই। আস্তাত, বাজারোত, মাইষের বাড়িত, স্কুলের মাঠোত লাগে দিছনু। অনেকবার গাছগুলো ছাগল খ্যায়া ফেলাইছিল। কারো কারো সাতে এইট্যা নিয়া কাজিয়াও (ঝগড়া) হইছিল। এরপরেও মুই গাছ লাগা ছাড়ো নাই। এক জায়গায় ২০ বার হইলেও গাছ লাগাইছিনু।
তিনি বলেন, একবার টিভিত কইল ‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’। এই কতা মোর মনোত গাথিঁ গেইল। ছোট্ট বেলায় বেটি কোনা ফল খাবার চাইছিল। টাকার অভাবোত কিনি দিবার পারো নাই। মুই ভাবছিনু গেরামের গরীব ঘরের ছাওয়ারা যেন বিনা পাইস্যায় ফল খাবার পায়। সেই জন্তে যেটে পাইছি গাছ লাগে দিছি।”