আমির খসরু সেলিম
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:১৩ পিএম
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক, নবম শ্রেণি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
চলছে হেমন্তকাল। কয়েক দিন ধরে একটু শীত শীত ভাব টের পাচ্ছি। তাই না? সকাল বেলা বাইরে হাঁটতে গেলে ঘাস-মাটি কেমন যেন ভেজা ভেজা লাগে। ওগুলো শিশিরে সারারাত গোসল করে যে! সকালে কোথাও কোনো আঙিনায় পড়ে আছে শিউলি ফুলের রাশি। দেখতে বেশ। কমলা বোঁটা আর সাদা শরীর নিয়ে কী আশ্চর্য সুন্দর লাগে ফুলগুলো। এই সময়ে আরও কিছু ফুলের দেখা মেলে, যেমনÑ শিউলি, কামিনী, গন্ধরাজ, মল্লিকা, দেবকাঞ্চন, ছাতিম, বকফুল, লতাপারুল। আশপাশে তাকালেই আরও কত ফুল যে চোখে পড়ে।
হেমন্ত ঋতুর একদম বুকের ভেতর আছি আমরা। এই ঋতুতে যে দুটো মাস আছে তাদের নাম কার্তিক, অগ্রহায়ণ। হেমন্ত ঋতুতেই আসে ‘নবান্ন’। নবান্ন মানে ‘নতুন অন্ন’। আর অন্ন মানে ভাত। হেমন্তে নতুন আমন ধান কাটার উৎসব চলে দেশজুড়ে। এ সময় কৃষক-কিষাণীদের আনন্দ আর ধরে না।
নতুন ধানের চাল থেকে তৈরি করা হয় নানা কিছু। প্রথমে ধান রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। সে ধানগুলো যেন সোনা রঙ। তার পর ধান ভাঙিয়ে চাল গুঁড়ো করে আটা বানানো। এরপর সেটা দিয়ে তৈরি হয় নানা নাম আর স্বাদের পিঠাপুলি। এগুলোর নামও কিন্তু বাহারি। যেমন খেতে সুস্বাদু, তেমনি তার নাম বাপু। এই মজার খাবারগুলোর নাম শুনলেই তো জিভে জল এসে যায়। ভাপা, কুশলি, চিতই, নকশি, পুলি, মুঠি, ছিটা, পাকন... এগুলো সব পিঠারই নাম।
নতুন চাল থেকে যে পায়েস তৈরি হয় সেটার স্বাদ তো অসাধারণ। এ দেশে গ্রামগুলোতে অনেক বছর আগে থেকেই নবান্নকে ঘিরে মেলা ও উৎসবের প্রচলন হয়ে আসছে। সেই মেলা এখন শহরগুলোতেও বর্ণিলভাবে পালন করা হয়।
এ সময়ে আরেকটা জিনিস খেয়াল করলে দেখা মিলবেÑ খেজুর গাছগুলো খুব যত্ন নিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে। একটু শীত-শীত ভাব শুরু হলেই খেজুর গাছগুলো মিষ্টি রস বিলিয়ে দিতে শুরু করে। গাছ থেকে রস বের করা একটু কঠিন কাজই, তাই সময় নিয়ে কাজটা করতে হয়। গাছি ভাইদের নামানো সুস্বাদু সেই রস থেকেই তৈরি হয় গুড়। এটি খেতে আরেক মজার। কোনটা রেখে কোনটা বলি।
মা, চাচিরা পাতে তুলে দিচ্ছেন নতুন নতুন শাক-সবজি। এগুলোও হেমন্তের উপহার। জলপাই, কদবেল, আমলকী, পানিফলসহ আরও কিছু ফল আছে যেগুলো শুধু এই ঋতুতেই পাওয়া যায়। একটু ভাবলেই আরও কিছু ফলের নাম মনে পড়বে। কোনটা রেখে কোনটার কথা বলি।
ছাতিম ফুল। এই হেমন্তের অনন্য উপহার। গন্ধে মাতানো ফুল। এই ফুলটি কিন্তু রাতে সুবাস ছড়ায়।
উৎসব আর মেলা উপলক্ষে পাড়া-পড়শি ও আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা হয়। তাদের জন্য পরিবেশন করা হয় নতুন চাল থেকে তৈরি করা বিভিন্ন ধরনের খাবার। নবান্ন পালন করার নানা রকম
নিয়ম রয়েছে। তবে সেসব একেক এলাকায় একক রকম। এগুলোকে লোকাচার বলে। প্রাচীন বাংলায় শীতকালকে খুব ভালো চোখে দেখা হতো না। তাই শীতের আগে
এ রকম ‘নতুন অন্ন’ পেয়ে যাওয়াকে মানুষ সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ বলে মনে করত।