আনিসুর রহমান
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:০০ পিএম
‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এই প্রবাদটি বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মাছ এবং ভাতের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসা ও নির্ভরতার বহিঃপ্রকাশ। বাঙালিরা প্রাচীনকাল থেকেই মাছ ও ভাতের ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের পুষ্টি ও বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। বর্তমানে দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়া, মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া ও দাম বৃদ্ধি এবং নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ঐতিহ্যবাহী এই প্রবাদটি হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে দেখা দিচ্ছে দেশি মাছের আকাল।
নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগে মাছ ধরার ফাঁদে বিভিন্ন ধরনের দেশি প্রজাতির মাছ ধরা পড়ত। সাধারণ মানুষ নিজেরাই মাছ ধরে পরিবারের আমিষের পুষ্টি চাহিদা মেটাত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নদী-নালা এবং খাল-বিলে মিলছে না দেশি প্রজাতির মাছ। নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ও জলাশয়গুলোতে এখন দেশি প্রজাতির মাছ খুব কমই পাওয়া যাচ্ছে। গত ৩০ বছরের ব্যবধানে অসংখ্য দেশি প্রজাতির মাছ এখন দেখা যায় না বললেই চলে। বর্তমানে দেশি প্রজাতির মাছের স্থান দখল করেছে বিদেশি জাতের বিভিন্ন ধরনের মাছ। এতে সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। দাম বেশি থাকায় পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। আগে যেখানে বাজারগুলোতে দেশি জাতের কৈ, মাগুর, শিং, বোয়াল, শৈল, পাবদা, মলা, চেলা, চিতল, খৈলশা, আইড়, বাঘাইড়, বাইম, রিঠা, বাউস, টাকি, টেংরা, পুঁটি, সরপুঁটি, গোলশা, ভেদা, বেলেসহ বিভিন্ন জাতের দেশি ও সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেত, কিন্তু এখন সেসব মাছ খুব কমই দেখা যায়। এসব মাছের জায়গায় বর্তমানে বেশিরভাগ দখলে রেখেছে শুধু পাঙাশ জাতীয় মাছ। দেশি মাছের সংকট এবং অধিক মুনাফা লাভের আশায় বিদেশি জাতের মাছ চাষের দিকে ঝুঁকছে মৎস্য চাষিরা।
ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার হাটবাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারগুলোতে বেশিরভাগ মৎস্য ব্যবসায়ীরা পাঙ্গাস মাছ নিয়ে বসে আছেন। সঙ্গে আছে ৪-৫ ধরনের চাষের মাছ। দেশি মাছ নেই বললেই চলে। কংশ নদীবেষ্টিত ধোবাউড়া উপজেলার অন্যতম দুটি বাজার পোড়াকান্দুলিয়া এবং গোয়াতলা। আগে যেখানে জেলেরা সারারাত মাছ ধরে বাজারে নিয়ে আসত, সেখানেও নেই তেমন দেশি মাছের হাকডাঁক। মাছ না পাওয়ায় পেশা বদলে অন্য পেশায় চলে গেছে অনেকে।
ধোবাউড়া উপজেলার জেলে আব্দুল কদ্দুস (৪০) তিনি ছোটবেলা থেকে তার বাবার সঙ্গে খাল-বিল থেকে মাছ ধরত। তিনিসহ তার আরও দুই ভাই মাছ ধরে পরিবারের জীবিকানির্বাহ করত। ধীরে ধীরে নদী-নালা এবং খাল-বিলে মাছ আগের মতো ধরা না পড়ায় পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। ফলে অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় পেশা পরিবর্তন করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমায় আব্দুল কদ্দুস। একইভাবে তার অন্য দুই ভাইও ঢাকায় চলে যায়। তারা জানান, ছোটকাল থেকেই বাবার সঙ্গে মাছ ধরে বড় হয়েছি। এহন আর পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় নাÑ যা পাওয়া যায় সেগুলো বিক্রি করে পরিবার চলে না। তাই পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসছি।
ষাটোর্ধ্ব আলী হোসেন জানান, আগেকার দিনে প্রতি বছর বর্ষাকালে পানিতে অনেক মাছ থাকত। অধিকাংশ মানুষই সেগুলো ধরে তাদের পরিবারের চাহিদা পূরণ করত। আশ্বিন-কার্তিক মাসে পানি শুকিয়ে গেলে খাল বিলে প্রচুর পরিমাণে মাছ ধরা পড়ত। এখন আর আগের মতো খাল-বিল এবং নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। এভাবে দেশি মাছ বিলুপ্ত হতে থাকলে আমাদের মাছ খাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জানান, আমরা বইয়ে বিভিন্ন ধরনের দেশি মাছের নাম শুনি কিন্তু অনেক মাছ আমরা দেখি নাই। দেশি মাছ সংকটের অন্যতম কারণ হলো মাছের অভয়ারণ্য নষ্ট করা এবং কারেন্ট জাল এবং চায়না বাইর দিয়ে পোনা মাছ নিধন। এ ছাড়া কৃষি জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করায় দেশি মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দেশের প্রজাতির মাছশূন্য হতে থাকলে এক সময় মানুষ ভুলে যাবে দেশি মাছের কথা।