এস কে সুজয়
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম
নড়াইল জেলায় নির্বিচারে শামুক নিধনের ফলে বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। জেলার প্রায় প্রতিটি মাছের খামারে সাদা ও গলদা চিংড়ির খাদ্য হিসেবে শামুক ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব এই জলজ প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
জানা গেছে, জেলার কয়েক হাজার নারী-পুরুষ প্রতিদিন নদী, খাল, বিল ও পুকুর থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিভিন্ন মাছের খামারে বিক্রি করছেন। এতে জলজ পরিবেশ, মাটির উর্বরতা ও পানি পরিশোধন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি শামুক খেয়ে বেঁচে থাকা অতিথি পাখির আগমনও দিন দিন কমে যাচ্ছে, যা নড়াইলের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, নড়াইলে ২১ হাজার ১৯৬ হেক্টর প্লাবন ভূমি রয়েছে। এসব জলাভূমিতে জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত পানি থাকে, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় নিরীহ জলজপ্রাণী শামুক। এগুলো বিল, হাওর, নদী ও ধানক্ষেতের মাটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
-690c46cfa6126.jpg)
মনোরঞ্জন কাপুড়িয়া কলেজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘শামুককে প্রকৃতির ধাঙ্গর বলা হয়। তারা ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের ডিম খেয়ে ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। শামুক জলাশয়ের পানি বিশুদ্ধ রাখে ও পাখি-প্রাণীর খাদ্য হিসেবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। শামুক না থাকলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে।’ জেলায় ২২৬২ হেক্টরে চিংড়ি এবং ১৭৮৭ হেক্টর জমিতে সাদা মাছের চাষ হয়। এসব খামারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুকের চাহিদা থাকে। মাছ চাষিরা জানান, বাজারে ফিডের দাম বাড়ায় শামুকই তাদের বিকল্প খাদ্য। শামুক আহরণে জড়িত তুলারামপুর ইউনিয়নের বেনাহাটি গ্রামের সবিতা সরকার ও মিতা সরকার বলেন, জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত প্রতিদিন ভোরে শামুক সংগ্রহে যাই। প্রতিদিন ১০ থেকে ২৫ কেজি শামুক পাই, যা ২০-২৫ টাকা দরে বিক্রি করি। এতে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। তবে এখন শামুক পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।
লোহাগড়া উপজেলার ৮০ বছর বয়সি কৃষক ইমান শেখ বলেন, আগে মরিচপাশা, গন্ডব, চালিঘাট এলাকায় অসংখ্য অতিথি পাখি দেখা যেত। তখন বিলে প্রচুর শামুকও ছিল। এখন শামুকের অভাবে পাখিও আর আসে না। পরিবেশের আগের সেই সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে।
জেলা মৎস্য চাষি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আকরাম শাহীদ চুন্নু বলেন, চিংড়ির দ্রুত বৃদ্ধির জন্য শামুক ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে শামুকের সংখ্যা কমে গেছে। তাই সরকারিভাবে শামুক প্রজনন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। পরিকল্পিত উৎপাদন ছাড়া এভাবে শামুক নিধন চলতে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শামুক একদিকে পানি পরিশোধন করে জলজ পরিবেশ ঠিক রাখে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। আমরা মাছের খাদ্য হিসেবে শামুকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করছি। পাশাপাশি শামুক সংরক্ষণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।