ব্রেস্ট ক্যানসার
ডা. নুশরাত জাহান
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫৪ পিএম
সদ্য চল্লিশ পেরিয়েছেন সায়রা। অফিস, বাসা সব সামলে দিন ভালোই চলছিল। গত কিছুদিন ধরে খেয়াল করছেন বাহুর নিচে একটা ফোঁড়ার মতোÑ যেটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। খানিকটা ব্যথাও হচ্ছিল। তেমন আমলে নেননি। ধরেই নিয়েছিলেন আবহাওয়ার পরিবর্তনে শরীরের তাপমাত্রার কম-বেশিতে কিছু হয়েছে হয়তো। কিন্তু মন মানছিল না। ভাবলেন একবার চেক করিয়ে নিবেন। টেস্ট করার পর যে আশঙ্কা করেছিলেন সেটাই সত্যি হলো। ব্রেস্ট ক্যানসারে ভুগছেন তিনি। মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়লেন। শুরু করলেন চিকিৎসা নেওয়া। সায়রার মতো এমন গল্প আমাদের আশপাশে অনেক নারীর। যারা হয়তো লক্ষণ দেখেও বুঝতে পারেন না তারা ব্রেস্ট ক্যানসারে ভুগছেন। আর ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। নিজের তো বটেই, পরিবারের সব সদস্যদের ওপর পড়ে মানসিক চাপ, বেশিরভাগ সময়েই চাপটা হয় আর্থিক। তাই সচেতনতা জরুরি সবার জন্যই।
ব্রেস্ট ক্যানসার কী
ব্রেস্ট ক্যানসার হলো স্তনের কোষে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, যা টিউমারে রূপ নেয় এবং এই ক্যানসার যখন শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে বলা হয় মেটাস্টেসিস (Metastasis)। সাধারণত দুধনালি (milk ducts) বা দুধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি (lobules) থেকে এই ক্যানসারের উৎপত্তি হয়। এই ক্যানসার নারীদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও, পুরুষদেরও ব্রেস্ট ক্যানসার হতে পারে (০.৫-১%)।
বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসার হলো ব্রেস্ট ক্যানসার বা স্তন ক্যানসার। এটি শুধু একটি শারীরিক রোগ নয়, বরং এই ক্যানসার নারীর আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্থিতি ও পারিবারিক জীবনের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। তবে আশার কথা হলো, যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, এই ক্যানসার সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য।

ব্রেস্ট ক্যানসার : বিশ্ব ও বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র
বিশ্ব পরিসংখ্যান : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC-GLOBOCAN 2024) অনুযায়ীÑ
বিশ্বে ব্রেস্ট ক্যানসার সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসার।
বাংলাদেশের পরিসংখ্যান : বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি, DGHS ও GLOBOCAN 2024 অনুযায়ীÑ
ঝুঁকির কারণসমূহ
বিজ্ঞানীরা একক কোনো কারণ নির্ধারণ করতে না পারলেও, কিছু বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়Ñ
লক্ষণ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণ
প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো ব্যথা থাকে না। গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণসমূহÑ
বুকে বা স্তনে ক্রমাগত ব্যথা
এই লক্ষণগুলোর যেকোনোটি দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
জীবনধারায় ছোট পরিবর্তন বড় ভূমিকা রাখতে পারেÑ
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ব্রেস্ট ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যানসারের ধরন ও স্তরের ওপরÑ
সার্জারি : টিউমার বা পুরো স্তন অপসারণ (লাম্পেকটমি বা মাসটেকটমি)
কেমোথেরাপি : ওষুধের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস
রেডিয়েশন থেরাপি : বিকিরণ ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ হত্যা
হরমোনাল থেরাপি : হরমোনের প্রভাব কমিয়ে কোষের বৃদ্ধি রোধ
টার্গেটেড বা বায়োলজিকাল থেরাপি : নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষে লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা
বাংলাদেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটসহ সরকারি-বেসরকারি অনেক হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মানসিক ও সামাজিক সহায়তা
ব্রেস্ট ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার জন্য মানসিক শক্তির প্রয়োজন। পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের সহানুভূতি রোগীকে সাহস জোগায়। বাংলাদেশে ‘Breast Cancer Support Group’ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে রোগীরা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে পারেন।
অক্টোবর : ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতার মাস
সবার মাঝে ব্রেস্ট বা স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর অক্টোবর মাসকে বিশ্বব্যাপী ‘ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতার মাস’ হিসেবে পালিত হয়। গোলাপি ফিতা বা Pink Ribbon এই সচেতনতার প্রতীক। এই মাসে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান নারীদের সচেতন করতে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আলোচনা সভা ও প্রচারণা পরিচালনা করে।
২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য বিষয় হল- ‘Every Story is Unique, Every Journey Matters.’ অর্থাৎ প্রতিটি নারীর গল্প আলাদা, প্রতিটি লড়াই গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রেস্ট ক্যানসার যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া যায়, সেক্ষেত্রে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় লাভ করা সম্ভব। তাই ভয় নয়, সচেতনতা হোক শক্তি। নিজের যত্ন নিন, নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং পরিবারে নারীদের উৎসাহ দিন। সচেতনতা ও আগাম পদক্ষেপই জীবন বাঁচাতে পারে।