× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জলজীবিকার বারকি নাও

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫০ পিএম

জলজীবিকার  বারকি নাও

নৌকার নাম ‘বারকি’। লম্বা আকৃতির এই নৌকার সামনে ও পেছনে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি একাধিক বসার স্থান। গলুইয়ের এক পাশে বসে নৌকা চালানো হয়। মাঝখান পুরোটা ফাঁকাÑ এই ফাঁকা জায়গায় বহন করা হয় বালু বা পাথর। সিলেট অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক বালু-পাথরমহালে ‘বারকি নাও’ নামের এই বাহনটি যেমন পরিচিত, তেমনি এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবীরাও পরিচিত ‘বারকি শ্রমিক’ নামে।

জলজনপদে শ্রমজীবনের বাহন ‘বারকি’

সিলেট অঞ্চলের নদীনির্ভর জনপদে বর্ষাকাল মানেই নদীপথে জীবন ও জীবিকার চলাচল। সেই জলজনপদের শ্রমজীবনের অপরিহার্য বাহন হলো ‘বারকি নাও’। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৬ ফুট ও প্রস্থে সাড়ে চার ফুট এই লম্বাটে কাঠের নৌকাটি বালু-পাথর বহনের পাশাপাশি জলজীবনের সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠেছে।

গবেষক মোহাম্মদ সুবাসউদ্দিন তার ‘জলের শিল্প জলের সংস্কৃতি’ বইয়ে বারকি নৌকাকে ‘জলযান শিল্প’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘জলের উজান-ভাটিতে বারকি জলজীবীদের জীবনযুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার।’

নামকরণ ও ইতিহাস

‘বারকি’ নামটি এসেছে এক ব্রিটিশ নাগরিকের নাম থেকে। সুনামগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী সম্পাদিত ‘সুনামগঞ্জ পরিচিতি’ গ্রন্থে এ তথ্য উল্লেখ আছে। বইটিতে বলা হয়েছে, ১৭৫৭ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে সিলেট অঞ্চলে এই নৌকার প্রচলন ঘটে। তখন জন বারকি নামের এক ব্রিটিশ নাগরিকের নকশায় তৈরি হয় লম্বা আকৃতির এই নৌকা। প্রাথমিকভাবে এটি ব্যবহৃত হতো চুনাপাথর পরিবহনে। জলপথে ভারী চুন বহনের উপযোগী এই নৌকাটি তার নামেই পরিচিতি পায়Ñ ‘বারকি নাও’।

‘বারকি নাও’ কখন থেকে শ্রমজীবনের প্রধান বাহন হয়ে উঠেছিলÑ সেই ইতিহাস বিশদভাবে তুলে ধরেছেন সুনামগঞ্জের লেখক ও সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী তার ‘বারকি, জন বারকি’ বইটিতে। লোকমুখে তখন সিলেট অঞ্চলের জলজনপদ পরিচিত ছিল ‘জলতল্লাট’ নামে। সেই কথাগাথা তিনি জলোপাখ্যান হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

বইয়ের সূত্র ধরে জানা যায়, বারকি নৌকা আজ আড়াইশ বছরেরও বেশি পুরনো। প্রথম নির্মাণ হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে শিল্পশহর খ্যাত সুনামগঞ্জের ছাতক এলাকায়, সুরমা নদীর তীরে। প্রথমে সুরমা নদী হয়ে ইছাকলস থেকে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ধলাই নদে চলতে শুরু করে। পরে লোভাছড়া, জাফলং, ধলাই, চলতিনদী, ধোপাজান, যাদুকাটা হয়ে পুরো সিলেট জুড়েই ছড়িয়ে পড়ে।

আঠারো শতকের গোড়ার দিকে চুনশিল্পের প্রসারে ঘটে একটি ছোট্ট ঘটনাÑ যা এই নৌকাটিকে অঞ্চলের শ্রমজীবনের অনিবার্য হাতিয়ার করে তোলে।

জনশ্রুতি আছে, একজন খুদে ব্যবসায়ী ছিলেন জন বারকি। বড় নৌযান চালাতে ব্যয় বেশি হওয়ায় তিনি নিজেই তৈরি করেন সাদাসিধে, লম্বাটে, সাশ্রয়ী এক নৌকা। নদীপথে চুনাপাথর পরিবহন শুরু হয় সেই নৌকায়। তিনিই ছিলেন এর নির্মাতা ও প্রথম চালক। তার নামেই নৌকাটির নাম হয়ে যায়Ñ ‘বারকি’।

আরও একটি প্রচলিত ইতিহাসে বলা হয়, ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য নৌকার কারিগর দল গঠন করা হলে জন বারকি সেই দলে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। শাসকদের হয়ে নয়, সাধারণ মানুষের উপকারে কিছু করতে চেয়ে তিনি পালিয়ে আশ্রয় নেন সুনামগঞ্জের লাউড়ের গড়ে। সেখানে নদীপথে চুনাপাথর পরিবহনের জন্য ছোট এক নৌকা তৈরি করেন, যা পরবর্তীকালে জলজীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

তবে শাসকদলের দেশীয় দোসরদের চক্রান্তে জন বারকিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি হারিয়ে গেলেও তার উদ্ভাবিত নৌকাটি টিকে আছে আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে।

নির্মাণ ও বেচাকেনার হাট

‘বারকি বাওয়া’ হলো সিলেট অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক বালু-পাথরমহাল এলাকায় বর্ষাকালীন আরেকটি পেশা। এ সময়েই তৈরি হয় নতুন বারকি নৌকা, যা ব্যবহৃত হয় সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায়। তবে সিলেটের সালুটিকর, বৈটাখাল, লেঙ্গুড়া ও নিয়াইন হাটে সবচেয়ে বেশি বারকি বিক্রি হয়।

সালুটিকর হাট তিনটি উপজেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত, যেন এক হাটে গিয়ে তিন উপজেলায় পা পড়ে যায়। কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ দেশের বৃহত্তম পাথর কোয়ারি। সেখানে পাথর ও বালু উত্তোলনে বারকি ব্যবহারের সূত্রে সালুটিকরে গড়ে ওঠে নাওবাজার। এখানকার বিক্রেতারা বৈটাখাল, নিয়াইন, লেঙ্গুড়া ও গোয়াইনঘাট এলাকা থেকে নৌকা নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। ক্রেতারা আসেন সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার থেকেও। আশ্বিন মাস পর্যন্ত চলে এ হাট।

একসময় সুনামগঞ্জের মাইজবাড়ি গ্রাম ছিল বারকি তৈরির মূলকেন্দ্র। সেখানকার ‘আলংদার’ (নৌকা মিস্ত্রি) পরিবারগুলো প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে।

সড়কে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় নৌকার চাহিদা কমলেও বারকি নৌকার কদর আজও টিকে আছে। ভালো কাঠের তৈরি বড় নৌকার দাম ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা, আর ছোট নৌকার দাম ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। একদিনে তিনজন আলংদার ও দুজন সহকারী মিলে একটি নৌকা তৈরি করতে পারেন, যদিও সাধারণত লাগে এক সপ্তাহ।

সালুটিকরের আলংদার নূর হোসেন বলেন, ‘পানি বাড়লে বারকির কাজ বাড়ে। তখন কেনাবেচাও হয় বেশি। এক বর্ষায় চাহিদা থাকলে ১০-১২টি নৌকা তৈরি করে বিক্রি করতে পারি।’

বারকি শ্রমজীবন ও জীবিকা

একটি বারকি নৌকায় অন্তত চারজন শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ হয়। দৈনিক ২০০-৪০০ টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে তাদের সম্মিলিত আয় প্রায় ৫-৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ একটি বারকি নৌকার মালিক থেকে শ্রমিক পর্যন্ত ৫-৭ জনের কর্মসংস্থান হয়।

সুনামগঞ্জের ছাতকের চেলায় দেখা মেলে সিলেট সদরের চেঙ্গেরখাল গ্রামের শ্রমজীবী দম্পতি আজর আলী ও রাজিয়া খাতুনের। বর্ষাকালে কৃষিকাজ বন্ধ থাকায় তারা বারকি ভাড়া নিয়ে বালু পরিবহন করেন। দৈনিক ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত রোজগার হয় তাদের। আজর আলী বলেন, ‘বাইরা মাসও (বর্ষায়) খেতও কাম থাকে না। আত বারকি না থাকলে উপাস থাকা লাগত।’

বারকি চলে সিলেটের ধলাই নদ, গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি, জাফলংয়ের পিয়াইন নদ, কানাইঘাটের লোভাছড়া, সুনামগঞ্জের চলতিনদী, ধোপাজান ও যাদুকাটা নদীসহ হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের জলপথে।

যন্ত্রের আগ্রাসন ও ইজারায় বিপন্ন বারকি শ্রমজীবন

একসময় বালু-পাথরমহলে কায়িক শ্রমই ছিল প্রধান। বারকি, বালতি আর বেলচাই ছিল শ্রমিকদের হাতিয়ার। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে সেখানে প্রবেশ করেছে যন্ত্রচালিত নৌযান ও ড্রেজার। এতে দ্রুত উত্তোলন সম্ভব হলেও নদীর তলদেশ নষ্ট হচ্ছে, প্রবাহ বদলে যাচ্ছে, আর শ্রমিকরা বেকার হচ্ছেন।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) যন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে রিট করলে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে ছয় মাসের জন্য বন্ধ হয় মহাল, আর ২০১৮ সালে পুরো সিলেট অঞ্চলের বালু-পাথরমহাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বেকার হয়ে পড়েন হাজার হাজার বারকি শ্রমিক।

ধলাই নদ অববাহিকায় ভোলাগঞ্জ দেশের সবচেয়ে বড় পাথরমহালÑ যেখানে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাদের সঙ্গে আরও লাখো মানুষ জড়িত। কিন্তু মহাল বন্ধ থাকায় অসংখ্য বারকি নৌকা ও শ্রমিক আজ কর্মহীন।

এ ছাড়া ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য শ্রমজীবনের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। নদীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তই তারা নিজেদের ইজারার আওতায় দাবি করে শ্রমিক উচ্ছেদ করছে। শতবর্ষের স্বাধীন শ্রম এখন ইজারার দৌরাত্ম্যে বন্দি। ফলে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

বারকি শ্রমিক আন্দোলন ও দাবি

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের যাদুকাটা ও চলতিনদী-ধোপাজানে ড্রেজার চালিয়ে বালু উত্তোলনে নদীর তীরবর্তী গ্রাম, রাস্তা ও বিদ্যালয় ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। এতে বারকি শ্রমিক ও স্থানীয় মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নেমেছেন। তারা পাঁচ দফা দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেনÑ ইজারা প্রথা বাতিল, ড্রেজার বন্ধ এবং সরকারিভাবে সনাতন পদ্ধতিতে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তাদের প্রধান দাবি।

বারকি শ্রমজীবন নিয়ে বেলার মত

বারকি বাওয়ার মধ্য দিয়ে জলজনপদের শ্রমজীবিকা সচল থাকে। বারকি শ্রমিকদের বেকারত্ব ঘোচাতে বালু-পাথরমহাল ইজারা ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহিন। তিনি বলেছেন, ‘সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনে টোকেন প্রথার প্রচলন করলে বারকি শ্রমিকদের আর কর্মহারা হয়ে থাকতে হবে না।’

টিকে থাকুক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

বারকি শুধু নৌকা নয়Ñ এটি জলজনপদের ইতিহাস, শ্রম ও জীবিকার প্রতীক। যন্ত্রের প্রতিযোগিতা, পরিবেশ সংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মাঝেও বারকি আজও নদীর বুক চিরে চলছে। শ্রমের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়Ñ সেই প্রত্যাশাই সিলেটের জলজনপদের বারকি শ্রমিকদের। তাদের বিশ্বাস, যতদিন নদী ও জলজীবিকা থাকবে, ততদিন টিকে থাকবে জলজীবনের সেই বারকি নাও।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা