অনিক শুভ
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:২১ পিএম
আঁকা : মেহেরুন্নিসা, সপ্তম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
রোদ ঝলমলে এক বিকেল। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে। কিন্তু রিকি একদম স্থির! হাতে ফোন, চোখ স্ক্রিনে। মুখে একটা কথাও নেই। বাইরে পাখিরা কিচিরমিচির করছে, ছেলেপেলেরা মাঠে ফুটবল খেলছে, আর রিকি? সে ডুবে আছে এক গেমে ‘রোবো টুটো ৭২’।
এই গেমটা নাকি একদম অন্যরকম! তাতে আছে উড়ন্ত রোবট, গোপন গুপ্তধন আর ভয়ংকর ‘রোবো রাজা’। রিকি সারাদিন গেম খেলে আর ভাবে ‘আজ না হয় রোবো রাজাকে হারিয়েই ছাড়ব!’
মা ডাক দিলেন,
Ñ রিকি, বাইরে গিয়ে একটু খেলবে না?
রিকি মুখ না তুলেই বলল,
Ñ প্লিজ মা, এই লেভেলটা শেষ করতেই দাও!
দিন যায়, রাত যায়। রিকির চোখে ঘুম কমে, মুখে হাসি হারিয়ে যায়। একসময় গেমটা যেন তার জীবনের সবচেয়ে জরুরি জিনিস হয়ে যায়। স্কুলের হোমওয়ার্ক ভুলে যায়, বন্ধুদের সাথেও কথা বলে না।
এক বিকেলে, রিকি গেমে ঢুকে পড়েছে নতুন লেভেলে। রোবো রাজা নাকি ঠিক সামনে! হঠাৎ... ফটাস! বিদ্যুৎ চলে গেল! সাথে মোবাইলের চার্জও। ফোন বন্ধ! রিকির চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ‘এটা কী হলো! এখন আমি কী করব?’ সে যেন দিশেহারা হয়ে গেল। যেন তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটাকে হারিয়ে ফেলেছে।
ঠিক তখন পাশের ঘর থেকে টুকটুক শব্দে ডাক এলো,
Ñ রিকি! চলো ফুটবল খেলি!
রিকি জানালার দিকে তাকাল। বাইরে তার বন্ধু ইমু দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বল, মুখে মিষ্টি হাসি।
ইমু বলল,
Ñ তুই সারাদিন ওই ফোনটা নিয়ে পড়ে থাকিস কেন রে? চল, আজকে মাঠে গোলের ঝড় তুলি!
রিকি একটু থমকাল, তারপর হেসে উঠল। ফোনটা টেবিলে রেখে দৌড়ে গেল বাইরে।
সূর্যের আলোয় মুখে হাওয়া লাগল, পায়ে বল গড়িয়ে গেল, আর রিকির গাল বেয়ে নেমে এল হাসির ঝিলিক।
ইমু বলল,
Ñ কেমন লাগছে বল তো?
রিকি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
Ñ অনেক মজা! ফোনের গেমে এমন ঘাম ঝরে না, হাসিও না!
খেলা শেষে দুজন ঘাসে বসে রোদে শুকাল, মাটির গন্ধ নিল, আইসক্রিম খেল। রিকির মনে হলো, ‘আরে, এই তো আসল আনন্দ!’
সেদিন রাতে ঘরে ফিরে সে ফোনের দিকে তাকাল। গেমের রোবোটা যেন চুপচাপ তাকিয়ে আছে, কিন্তু রিকির মুখে এক অন্যরকম হাসি। সে ফোনটা বন্ধ করে বলল, ‘কাল আবার ইমুর সঙ্গে খেলব।’
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল চাঁদের আলোয় মাঠটা ঝলমল করছে, পাখিরা ঘুমোচ্ছে।
রিকি ফিসফিস করে বলল,
Ñ ‘পর্দার ভেতরের বন্ধুর চেয়ে মাঠের বন্ধুরা অনেক বেশি আসল।’
সেদিন থেকে রিকি প্রতিদিন একটু কম ফোনে খেলে, আর অনেক বেশি বাস্তব জীবনে খেলে। এখন ওর সকাল শুরু হয় মাঠে দৌড়ের তালে, ফোনটা ঘুমায় টেবিলের কোণে।
মা হাসেন, ইমু খুশি, আর রিকি? সে হয়ে উঠেছে নিজের গল্পের নায়ক।
রিকি বুঝে গেল, ‘গেমের আলো মিথ্যে, রোদের আলো আসল! বন্ধুত্বও স্ক্রিনে নয়, মাঠেই সবচেয়ে মজার!’