× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যাদুকাটার গলার কাঁটা ইজারা

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:২১ পিএম

যাদুকাটা নদী এখন ইজারার নামে দখলবাজ সিন্ডিকেট ও যান্ত্রিক আগ্রাসনের শিকার

যাদুকাটা নদী এখন ইজারার নামে দখলবাজ সিন্ডিকেট ও যান্ত্রিক আগ্রাসনের শিকার

নদীর নাম যাদুকাটা। নামের মতোই একসময় এ নদীর স্বচ্ছ জলপ্রবাহ ছিল মোহনীয়, রূপসী, পরিপূর্ণ সম্ভাবনায় ভরপুর। প্রকৃতি অকৃপণ হাতে সাজিয়েছিল নদীটিকে। এর বুকে ছিল অফুরন্ত বালু-পাথর, ছিল জীবিকার সম্ভার, ছিল অপরূপ সৌন্দর্যের ভান্ডার। এ কারণে যাদুকাটা নদীকে বলা হতো শ্রম ও সমৃদ্ধির নদী, রূপের নদী।

নদীর সেই রূপ, সেই প্রাচুর্য আজ অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীতে বালুমহাল সৃজন করে দেওয়া হয়েছে ইজারা। ইজারার জাদুতে যাদুকাটার প্রশান্তির জলে নেমে এসেছে অশান্তির কালোছায়া। নদী এখন ইজারার নামে দখলবাজ সিন্ডিকেট ও যান্ত্রিক আগ্রাসনের শিকার। সর্বগ্রাসী বালু ব্যবসা নদীটিকে গ্রাস করছে, হারিয়ে যাচ্ছে এর স্বাভাবিক গতি ও প্রকৃতি। তীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে গ্রাম, রাস্তা, সেতু, শিমুল বাগানসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যাদুকাটা এখন সত্যিই তীরবর্তী মানুষের গলার কাঁটা।

ভৌগোলিক পরিচয়

আন্তঃসীমান্ত নদী যাদুকাটা ভারতের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে প্রবেশ করেছে। এর পর তাহিরপুরের বুক চিরে দক্ষিণ-পূর্বমুখী হয়ে আবারও বিশ্বম্ভরপুরে গিয়ে মিশেছে নয়া সুরমায়। নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৫৭ মিটার এবং গভীরতা ৮ মিটার। নদীটির সর্পিলাকার প্রবাহ বর্ষাজুড়ে পানিপূর্ণ থাকে।

ইতিহাসের সাক্ষী নদী

যাদুকাটার ঐতিহাসিক গুরুত্বও অনেক। এ নদীর তীরে গড়ে উঠেছে শ্রী শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর আশ্রম ও পুণ্য তীর্থস্থান এবং শাহ আরেফিন আউলিয়ার আস্তানা। এই নদীতীরেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন লাউড় রাজ্যের রাজধানী। এখানে হলহলিয়া নামক গ্রামে গেলে পাওয়া যাবে ৮০০ বছর পুরনো প্রাচীন লাউড় রাজ্যের হাবেলি রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। এখানেই জন্মেছেন পৌরণিক মহাকাব্য মহাভারতের বাংলা সংস্করণের প্রথম প্রণেতা মহাকবি সঞ্জয়।

নামের পেছনে লোককথা

এ নদীর আরেক নাম রক্তি। সীমান্তের ওপাশে কালাটেক নামেও ডাকা হয় নদীটাকে। নদীর নাম যাদুকাটা কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে একাধিক প্রাচীন গল্প প্রচলিত আছে। লোকমুখে প্রচলিত এসব গল্পের একটি হলোÑ একবার এক গাঁয়ের বধূ তার শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে মাছ কাটছিলেন। হঠাৎ একপর্যায়ে অন্যমনস্ক হয়ে ভুলবশত মাছের জায়গায় তার কোলের শিশুটিকেই কেটে ফেলেন। সেই শিশুপুত্রটির নাম ছিল যাদু, আর গ্রামটি ছিল এই নদীর তীরে। আর মাছটি ছিল এই নদীরই মাছ। এই গল্প থেকেই নদীটির সঙ্গে জুড়ে যায় যাদুকাটা নামটি।

শ্রমজীবনের ভরসা ছিল

শত বছর ধরে যাদুকাটা নদী থেকে বালু, পাথর ও নুড়ি আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন হাজারো শ্রমিক। নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ হাজার মানুষ জীবিকার জন্য নদীতে নামতেন। হাতে বা বেলচা দিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে সংগ্রহ করা হতো এই সম্পদ। এতে পরিবেশও রক্ষা পেত, আবার দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানও টেকসই থাকত। কিন্তু ধীরে ধীরে সব পাল্টে গেল। নদীতে সৃজন করা হলো বালুমহাল। এলো সামন্তযুগীয় ইজারা প্রথা। ইজারাদার হলো প্রাকৃতিক বালু-পাথরের মালিক। শ্রমিকরা হারালেন প্রথাগত অধিকার।

শ্রমনির্ভর পদ্ধতির জায়গায় এলো যন্ত্র। ড্রেজার, শ্যালো, বোমা মেশিন নদীর বুক চিরে পাথর-বালু তোলার কাজ শুরু হলো। এতে একদিকে শ্রমজীবী মানুষের কাজ কমে গেল, শ্রমিকরা দৈনিক মজুরিতে ইজারাদারের নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে বাধ্য হতে হলো। অন্যদিকে ইজারাদারের অতি মুনাফার লোভের আগ্রাসনে রূপ ও সম্পদের নদী যাদুকাটা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ল।

ইজারার ফাঁদে নদী

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে যাদুকাটা নদীতে বালুমহাল সৃজন করে প্রথমে দুটি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। এর পর দ্বিতীয়বারের মতো এক বছরের জন্য ৬৮ কোটি ৬৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় নদীর দুটি বালুমহাল ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। যাদুকাটা-১ বালুমহাল ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় সোহাগ এন্টারপ্রাইজ এবং যাদুকাটা-২ বালুমহাল ৪২ কোটি ৯০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় আরাফ ট্রেড করপোরেশন লিমিটেড ইজারা নেয়।

চলতি ১৪৩২ বাংলা সনের পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত ইজারা সময়সীমা দখলনামায় উল্লেখ করে যাদুকাটা-১ বালুমহাল মেসার্স জিনান এন্টারপ্রাইজকে ৬৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় এবং যাদুকাটা-২ বালুমহাল তাহিয়া স্টোন ক্রাশারকে ৩৩ কোটি টাকায় ইজারা প্রদান করেছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু প্রায় ছয় মাস পর গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে যাদুকাটা-২ বালুমহাল ও ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে যাদুকাটা-১ বালুমহাল ইজারাদারদের কাছে হস্তান্তর করে।

আইন অনুযায়ী ড্রেজার বা পাম্প দিয়ে বালু তোলা নিষিদ্ধ। নদীর পরিবেশ নষ্ট হলে ইজারা বাতিলের বিধানও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নিয়ম মানা হয় না। নদীর পাড় কাটা, জমি ধ্বংস, ফসলি জমি বিলীনÑ সবই চলছে প্রকাশ্যে। ইজারাদাররা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী খনন চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে নদী ভাঙছে, গ্রাম বিলীন হচ্ছে, মানুষের ঘরবাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে। 

প্রশান্তির জলধারায় অপরাধের স্বর্গরাজ্য

যাদুকাটা ঘিরে এখন গড়ে উঠেছে বিশাল দখল-বাণিজ্য। স্থানীয়রা বলেন, এখানে ইজারাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। নদীতে চলাচল করা নৌকাগুলোকে চাঁদা দিতে হয়। নৌকাঘাটগুলোতেও চলে অবৈধ অর্থ আদায়। অভিযোগ আছে, অন্তত আড়াইশ লোক প্রতিদিন এই চাঁদাবাজিতে জড়িত। ২০০১ সালে গোপনে রাতের বেলা পাড় কাটা শুরু হলেও ২০২১ সালের পর থেকে তা প্রকাশ্যে চলছে। এখন দিন-রাত যন্ত্র দিয়ে নদী কেটে নেওয়া হচ্ছে। বড় দুই রাজনৈতিক দলের স্থানীয় শীর্ষনেতারাও এ ব্যবসায় জড়িত। ফলে প্রশাসনের কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হয় না।

ঝুঁকিতে ২০টি হাওর, জনপদ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা

রূপ ও প্রাচুর্য্যের নদী যাদুকাটা ইজারার যাদুতে এখন সর্বগ্রাসী-সর্বহারা। অবৈধ খননের কারণে নদীর প্রস্থ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে প্রস্থ ছিল গড়ে ৫৭ মিটার (১৮৭ ফুট), এখন তা এক কিলোমিটারও ছাড়িয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রাকৃতিকভাবেই উঁচু ছিল যাদুকাটা নদীর পাড় ও নদীতীরবর্তী জমি। পাড় কেটে কেটে নদীটি গ্রামের দিকে এক থেকে দুই কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে গেছে। তাই পাহাড়ি ঢলে বন্যা হলেই নদীর পানি সহজেই গ্রামের ভেতর প্রবেশ করে। ড্রেজার দিয়ে করা ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীর হাজার হাজার গর্তের কারণে নদীর দুই পাড়ের ২০টি গ্রামে ভাঙনও দেখা দিয়েছে। বালুময় হওয়ার ফলে হাওরাঞ্চলের প্রায় ২০টি হাওর ঝুঁকিতে পড়েছে। হুমকিতে পড়েছে নদীর ওপর নির্মিত জেলার সবচেয়ে দীর্ঘ শাহ আরেফিন-অদ্বৈত মৈত্রী সেতু। দেশের আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র ‘জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান’ ও ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে।

স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও উন্নয়নকর্মীদের উদ্বেগ

তাহিরপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সুনামগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘যাদুকাটায় শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন, অপরাধ বাড়ছে, নদীতে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলছে। বেআইনি খননে পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে। প্রশাসন, রাজনীতিবিদ ও সচেতন মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া নদীকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।’

হাওর পাড়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘জনাশিউস’- এর সভাপতি সাজেদা আহমেদ বলেন, অপরূপ সৌন্দর্য, বালু-পাথর, বিলুপ্তপ্রায় নানিদ ও মহাশোল মাছের জন্য বিখ্যাত ছিল এই যাদুকাটা নদী। নদীটি সমতলে তাহিরপুর উপজেলার বারেকটিলা ও লাউড়েরগড় এলাকার মধ্য দিয়ে পাঁচ কিলোমিটার গিয়ে দক্ষিণে ফাজিলপুর এলাকায় তেমোহনায় এবং পরে দক্ষিণে রক্তি ও পশ্চিমে বৌলাই নামে প্রবাহিত হয়েছে। এই নদী শত বছর ধরে খাসিয়া পাহাড় থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে বয়ে আনত বালু-পাথর। কিন্তু এখন বালু-পাথরই নদী ও নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের জন্য কাল হয়েছে। তারা তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে ফেলছে বালু-পাথর ব্যবসায়ীদের কাছে।

শীতল জলে দ্রোহের উত্তাপ, দমনে পুলিশ ক্যাম্প 

গত ২ অক্টোবর সকালে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও স্থানীয় বাদাঘাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আফতাব উদ্দিনের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫টি স্টিলের নৌকা নিয়ে একদল লোক গিয়ে বালু তোলা শুরু করেন। এ সময় পাড় কেটে বালু তোলায় বাধা দেন গ্রামবাসী। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতার ধাওয়ার মুখে পালিয়ে যান আফতাব ও তার সহযোগীরা। এর পর থেকে নদী এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংঘর্ষ এড়াতে ইজারাদাররা নদীর পাড়ে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবির প্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর থেকে নদীর তীরে বালুর চরে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

৫ দিনে লুট হলো ৫০ কোটি টাকার বালু 

গত ৬ থেকে ১১ অক্টোবর ৫ দিনে যাদুকাটা নদীর ইজারাবহির্ভূত এলাকায় পাড় কেটে অন্তত ৫০ কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে। এতে নদীর আড়াই কিলোমিটার এলাকার প্রশস্ততা ৩০ ফুটেরও বেশি বেড়েছে। স্থানীয় লোকজনের মতে, উৎসব করে পাড় কেটে বালু লুটের পর সংবাদ সম্মেলন করে প্রশাসনের কাছে প্রতিকার চেয়ে সাধু সাজার চেষ্টা করছেন ইজারাদাররা। অথচ বালু লুটের সময় তারা ‘টুঁশব্দ’ না করে লুটের বালু থেকে প্রকাশ্যেই রয়্যালিটি আদায় করেছেন।

প্রশাসনের ‘উদো-বুধোকাণ্ড’

টানা ৫ দিনের লুটপাট শেষ হলে সরব হয় ইজারা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসন। নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালানো হয়েছে অভিযান। কিন্তু এসব অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

জানা গেছে, দুটো অভিযানে ১০ জন শ্রমিককে আটক করে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। নদীর পাড় কাটার মালিকদের রেখে দিনমজুরকে দণ্ড দেওয়ায় অভিযানটি ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ বলে সমালোচিত হচ্ছে। শ্রমিক দণ্ডে প্রশাসনের এ পদক্ষেপকে এলাকাবাসী ‘উদো-বুধোকাণ্ড’ বলে অভিহিত করছেন।  তবে এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য না করে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান। তিনি বলেন, নদীর পাড় সুরক্ষা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে এ অভিযান হচ্ছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের ৪ ধারায় ৪টি মামলা করা হয়েছে।

সংকট উত্তরণে স্থানীয় বিজ্ঞজনের মত 

সুনামগঞ্জের গবেষক ও প্রাবন্ধিক ইকবাল কাগজীর মতে, ‘যাদুকাটা থেকে বালু-পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ বালু-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে কোটি মানুষের জীবিকা জড়িত। তবে প্রচলিত ধারার ইজারা ব্যবস্থা ও কায়েমী স্বার্থবাদীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সনাতনী পদ্ধতিতে আহরণ চালু করতে হবে। সরকারিভাবে ক্রয়কেন্দ্র চালু করে টিসিবির আদলে বালু-পাথর কেনাবেচার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’ তিনি মনে করেন, যাদুকাটাকে বাঁচাতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। তার প্রস্তাব—

১. সরকারিভাবে বালু-পাথর ক্রয়কেন্দ্র চালু করে শ্রমজীবীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

২. ড্রেজার, বোমামেশিন, শ্যালোমেশিন দিয়ে উত্তোলন বন্ধ করা।

৩. স্টিলবডি নৌকার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।

৪. সিন্ডিকেট ভেঙে শ্রমিকদের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করা।

৫. হাতে বেলচা, বালতি, নেট ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উত্তোলন উন্মুক্ত করা।

৬. আইন ভঙ্গকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

৭. ভর্তুকি দিয়ে সর্বজনীন রেশনিং চালু করা।

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারিভাবে পাথর-বালু ক্রয়কেন্দ্র চালুর বিষয়টিকে স্পষ্ট করা দরকার। প্রথমেই মাফিয়াচক্রের আধিপত্য বিস্তার রোধে বালু-পাথর মহালগুলোকে একধরনের সংরক্ষিত এলাকার মতো করে তুলতে হবে এবং সনাতন পদ্ধতিতে বালু-পাথর আহরণের (ড্রেজার-বোমাসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে বালুপাথর উত্তোলন নয়) কাজ করার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সরকারিভাবে ক্রয়কেন্দ্র চালু করে খাদ্য অধিদপ্তর কতৃক পরিচালিত ‘টিসিবি’র আদলে বালু-পাথরের মূল্যনির্ধারণ পূর্বক ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। টিসিবির পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে সরকার নির্ধারিত ব্যবসায়ীরা নিয়োজিত থাকেন। তারা নির্দিষ্ট নিয়মে সরকারি কোষাগারে সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট, ট্যাক্স ও পণ্যের মূল্য পরিশোধ করেন। বালু-পাথর মহালে অনুরূপভাবে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীরা সরকারি কোষাগারে সরকার নির্ধারিত ভ্যাট, ট্যাক্স ও রয়্যালিটি পরিশোধ করবেন এবং তারা এইভাবে সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে নির্দিষ্ট পরিমাণ বালু-পাথর সরকার নির্ধারিত স্থান থেকে ক্রয় এবং বিক্রয় করবেন। ইজারা প্রথা বাতিল করে প্রস্তাবিত এই পদ্ধতিতে সরকার রাজস্ব আদায় করার ব্যবস্থা নিলে বর্তমান ইজারা পদ্ধতির চেয়ে শতগুণ বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে।

বাঁচুক নদী, বাঁচুক শ্রমজীবন 

একসময় যাদুকাটা ছিল রূপ-সৌন্দর্যের প্রতীক, শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার ভরসা। আজ তা সর্বগ্রাসী ইজারা ব্যবসার কবলে পড়ে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। নদী ভাঙন, পরিবেশ ধ্বংস, অপরাধের রাজত্বÑ সব মিলিয়ে জনজীবিকার যাদুকাটা এখন জনজীবনের হুমকি। এখনই যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তবে এই নদী হারাবে তার অস্তিত্ব। আর হারাবে একটি জনপদের শ্রমজীবনের জীবিকা ও সমৃদ্ধির অফুরন্ত সুযোগ। হারিয়ে যাবে স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও প্রাণের সব সম্ভাবনা। তাই যাদুকাটা নদী রক্ষায় জরুরি প্রয়োজন স্থানীয় বিজ্ঞজনের মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিবেশবান্ধব নীতির বাস্তবায়নে সম্মিলিত উদ্যোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা