আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:৪৯ পিএম
নিত্যদিনের ব্যবহারে গামছার নাম নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার হয়তো কিছু নেই। তবে এই গামছা নজর কাড়ে যখন এটি পোশাকে বৈচিত্র্য আনে। গামছার বুনন বেশ আরামদায়ক বলে এই পোশাক পরেও আরাম। ফ্যাশন বৈচিত্র্যে গামছা দিয়ে তৈরি পোশাকের চলমান ধারা সম্পর্কে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
গামছা কীভাবে এলো
গামছা শুধু একটি কাপড় নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ‘গা-মোছা’ থেকে গামছা শব্দটির উৎপত্তি হয়। তবে গ্রাম বাংলায় এর ব্যবহার শুধু গা মোছার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রোদে মাথা ঢাকা, ঘাম মোছা, ভারী জিনিস তোলার সময় কোমরে গামছা বেঁধে শক্তি সঞ্চয় করা (শ্রমিকদের মধ্যে বহুল প্রচলিত) বা বিনয় প্রকাশের প্রতীক হিসেবে গলায় গামছা দিয়ে নিমন্ত্রণ করার মতো নানা সামাজিক ও লোকায়ত রীতিতে এর ব্যবহার আছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও গামছার উপস্থিতি লক্ষণীয়। গ্রামে মসজিদে বা অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রমে এর ব্যবহার দেখা যায়। এটি ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জীবনে মিশে থাকা একটি সরল ও প্রয়োজনীয় বস্ত্রখণ্ড।

গামছা মূলত সুতি সুতায় তৈরি একটি হাতে বোনা কাপড়। এর বুনন প্রক্রিয়া খুবই সরল, যা এটিকে সহজে অভিযোজনযোগ্য ও সাশ্রয়ী করে তোলে। ঐতিহ্যগতভাবে ‘খটখটি তাঁত’-এ গামছা তৈরি হতো, যা গ্রামীণ তাঁতশিল্পীদের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। নানা জেলায় তৈরি হলেও বাংলাদেশের পাবনা ও সিরাজগঞ্জের গামছা বিশেষভাবে পরিচিত ও জনপ্রিয়। অঞ্চলভেদে গামছার বুনন, রঙের ব্যবহার এবং চেকের ধরনে ভিন্নতা দেখা যায়।
স্টাইলে ও ফোক মোটিফে গামছা
আধুনিক ফ্যাশনে গামছার আকর্ষণ বাড়াতে ডিজাইনাররা নতুন বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করছেন। যেহেতু গামছা ফোক সংস্কৃতির অংশ, তাই এর সঙ্গে পুঁতি, কড়ি বা কাঠ-পুঁতির মতো দেশীয় ও লোকায়ত মোটিফগুলো বেশি মানানসই। এই ধরনের আনুষঙ্গিক ব্যবহার পোশাকে পরিপূর্ণ একটি ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য তুলে ধরে। গামছার ছোট ছোট টুকরা কেটে অন্য কাপড়ের সঙ্গে সেলাই করে প্যাচওয়ার্ক-এর মাধ্যমে অভিনব ডিজাইন তৈরি করা হচ্ছে। এই ফিউশন তরুণ প্রজন্ম সাদরে গ্রহণ করছে, কারণ এটি পশ্চিমা কাটছাঁটের (যেমন : জ্যাকেট, গাউন) মধ্যেও বাঙালি ঐতিহ্যের ছোঁয়া ধরে রাখে। শুধু লাল-সাদা বা লাল-কালো নয়, এখন হলুদ-লাল, নীল-সাদা বা সবুজ-গোলাপিসহ বহু রঙের সংমিশ্রণ ব্যবহার করে গামছার চেক ডিজাইন করা হচ্ছে, যা একে আরও আধুনিক ও ট্রেন্ডি করে তুলেছে।

গামছা ফ্যাশনে তরুণ ডিজাইনার
বর্তমানে তরুণ বেশ কয়েকজন ফ্যাশন ডিজাইনার গামছা নিয়ে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে মেহবুব কামাল নজর কেড়েছেন আলাদাভাবে। তার উদ্যোগের নাম জাদুর বাক্স। কেন ও কীভাবে গামছাকে ফ্যাশনে অন্তর্ভুক্ত করা, সে সম্পর্কে জানতে চাইলে মেহবুব কামাল বলেন, ‘প্রথমেই আমার মাথায় এসেছিল এমন কিছু নিয়ে কাজ করব, যেটা সবাই চিনে এবং আমাদের দেশীয় কাপড় হয়। এটা নিয়ে ভাবতেই অনেক কাপড়ের নাম মাথায় আসে। যেমনÑ রাজশাহী সিল্ক, জামদানি, মসলিন, টাঙ্গাইল তাঁত, গামছা, খাদি ইত্যাদি। এতগুলো কাপড়ের মাঝে গামছা বেছে নিয়েছি। কারণ অন্যান্য কাপড় সব শ্রেণির মানুষ চিনে না এবং সবার সাধ্যের বাইরে। কিন্তু গামছা এমন একটা কাপড় যেটা বাংলার এমন কোনো বাড়ি নেই, যেখানে পাওয়া যায় না এবং গামছার সঙ্গে সবার একটা পারিবারিক ভালোবাসাও রয়েছে, সে জায়গা থেকেই গামছা নিয়ে কাজ শুরু করা এবং পরবর্তীতে দেশীয় সব ধরনের কাপড় নিয়েও কাজ করছি।’
পশ্চিমা পোশাকগুলোর কদর আমাদের দেশে অনেক বেশি এখন। তরুণ বয়সিদের মধ্যে এ ধরনের পোশাক পরিধানের ঝোঁক বেশি। তবে তারাও চায় তাদের পোশাকে নতুন কিছু যুক্ত হোক। এ ভাবনা থেকে তারাও ভিন্ন নকশার কাপড় খোঁজে ফ্যাশন হাউসগুলোতে। পশ্চিমা পোশাকেও যে গামছা যুক্ত করে নকশা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব তা বোঝা যায় জাদুর বাক্সকে দেখলেই। মেহবুব বলেন, ‘আমার ভাবনায় ছিল দেশীয় কাপড়কে পশ্চিমা প্যাটার্নে নিয়ে ফিউশন করা। সে জায়গা থেকে অনেক ধরনের পোশাক করা হয়েছেÑ গাউন, ব্লেজার, ওভার কোট, স্কার্ট, জাম্পস্যুট, টিউনিক, ফ্রক, কুর্তি, কটি, শার্ট, প্যান্ট, হারেম ইত্যাদি।’

পোশাকে গামছা শুধুই গামছা নাকি বুনন আলাদা। যে পোশাকগুলো তৈরি করা হচ্ছে যাদুর বাক্সে সেগুলো দেখে অনেকেই ভাবেন এগুলো বুঝি সরাসরি গামছা কেটে বানানো। মেহবুব জানালেন, দেখতে গামছা মনে হলেও এগুলো আসলে গামছার আদলে আলাদা সুতায় বানানো কাপড়। সরাসরি মার্কেট থেকে গামছা কিনে পোশাক তৈরি করা হয় না। তারা যে গামছা দিয়ে কাজ করেন সেটা তাঁতিদের দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। সেটাতে পাকা রঙ ব্যবহার করা হয় এবং সুতায় বুনন মিহি দেওয়া হয়। ফলে জিনিসটা সাধারণ গামছার চেয়ে ভালো হয় এবং পোশাক তৈরিতে উপযোগী, তবে কিছু কিছু ডিজাইনের টপ অংশে ইনার কাপড় ব্যবহার করা হয়।
কয়েক বছর ধরে গামছা শাড়ির জনপ্রিয়তা দেখা যাচ্ছে বেশ। বাজারে দুই ধরনের গামছা শাড়ি পাওয়া যায়। একটি হলো গামছার কাপড়ে তৈরি গামছা, শাড়ি, আরেকটি সাধারণ তাঁতের শাড়ি, যাতে গামছার নানা ধরনের মোটিফ ব্যবহার করা হয়। জামদানি, মসলিনের মতো এই শাড়িও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কারণ এর বুনন ও রঙ দুটোই যেমন ব্যতিক্রম, তেমনই পরতেও আরাম। গামছার চেকেও রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। পিন চেক, মাদ্রাজ চেক, টারটান, প্লেইড, বারবেরি ইত্যাদি প্যাটার্ন। অনেক ফ্যাশন ডিজাইনার আবার এই প্যাটার্নগুলোকে চেক প্যাটার্নের অংশ মনে করেন না। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো সবই চেক প্যাটার্ন হয়েই ধরা দেয়। ডিজাইনাররা জানেন প্রতিটি প্যাটার্নের মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য। মেহবুব বলেন, ‘শাড়িতে গামছা ফিউশন যদিও অনেক আগে থেকে চলছে, কিন্তু এর জনপ্রিয়তা বরাবরই বেশি। যেকোনো ট্রেডিশনাল প্রোগ্রামে সবাই চায় একটু ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে এবং তখনই গামছার শাড়ি তাদের পরনে শোভা পায়।’

ওয়েস্টার্ন পোশাকে গামছা এটা জাদুর বাক্সের সিগনেচার আইটেম এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় আইটেম। ওয়েস্টার্নে গামছা এটা বর্তমান জেনারেশনে খুবই জনপ্রিয় এবং এর চাহিদাও অনেক বেশি।
যাদুর বাক্সে গামছা পোশাকের জনপ্রিয়তা ও নিজ উদ্যোগ সম্পর্কে মেহবুব বলেন, ‘শুরু থেকেই আমার তৈরি পোশাক অল্প কিছুদিনের মধ্যে পরিচিতি লাভ করে এবং দেশের এলিট শ্রেণি, রুচিশীল মানুষদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং প্রবাসেও পৌঁছাতে থাকে। মাঝে একটা সময় গামছার ব্যবহার কিছুটা কমে গেলেও বর্তমানে অনেক বেড়েছে। গামছা প্রধানত গা মোছার কাজে ব্যবহৃত হয় বলে যেমন সব বাড়িতে থাকে, তেমনই বর্তমানে পোশাক শিল্পে এর চাহিদা বাড়ায় এর আমদানি আগের থেকে বেড়েছে এবং আশা করি পরবর্তীতে আরও বাড়বে, কারণ আমরাই আমাদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখব।’