× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নেপালের ছিমছাম গ্রামে

আরফাতুন নাবিলা

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৪৫ পিএম

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৪৬ পিএম

নেপালের ছিমছাম গ্রামে

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। সকাল সাড়ে ৮টা। আগের রাতে নেপালে পৌঁছে পরদিন সকালে থামেলের হোটেলে ব্রেকফাস্ট শেষ করে হায়েস গাড়িতে করে রওনা দিলাম আমরা সাত ভ্রমণকন্যা। গন্তব্য নেপালের হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ছোট্ট ছিমছাম একটি গ্রাম বান্দিপুর। পাহাড়ি গ্রাম যে ছবির মতো এত সুন্দর হয়- সেটা এতদিন মুখে মুখে শুনলেও এবার নিজ চোখে দেখার পালা।

যাত্রা শুরুর পর

আমাদের গাড়ির ড্রাইভারের নাম ছিল ভিম। ভিম দাদা নামে ডেকে হিন্দি ভাষায় তার সঙ্গে আলাপচারিতা চালিয়ে যাই। যাত্রার শুরুতেই তিনি আমাদের বলেন পূজার ছুটি শুরু হয়েছে। আমরা শহরে বেশ ভালোই জ্যাম পাব। শহর থেকে বের হয়ে গেলে তেমন জ্যাম নেই। যেতে ৬-৭ ঘণ্টা লাগবে। মাঝপথে কোথাও থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে নিব সবাই মিলে।

আনন্দ নিয়েই নেপালের পথ দেখতে দেখতে পথচলা শুরু হলো আমাদের। বলে রাখি আমরা গিয়েছিলাম দুর্গাপূজার ছুটিতে। আমাদের দেশে যেমন ঈদের সময় সবার স্বপ্ন বাড়ি যায়, নেপালেও ঠিক তেমন। বাসভর্তি করে মানুষ যাচ্ছে বাড়িতে। শুনলাম, এই সময় দোকানপাটও বন্ধ থাকবে অনেক। মন খানিকটা খারাপ হলেও যা হবে দেখা যাবে ভেবে চলছি সবাই। বেশ খানিকটা রাস্তা জ্যাম ঠেলে খুব সুন্দর একটা রেস্টুরেন্টে ভিম দাদা গাড়ি থামালেন দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। আমরাও খাওয়ার পর্ব সেরে দেড়টার দিকে রওনা হলাম। এবার বাধল বিপত্তি। কিছুদূর গিয়ে দেখি পুরো রাস্তা জ্যাম। গাড়িগুলো অপেক্ষা করে আছে প্রায় ঘণ্টাখানেকের বেশি। কোনোদিকে নড়ার উপায় নেই। কিছুদূর গিয়ে জানলাম সামনেই একটা জায়গায় ল্যান্ড স্লাইড হয়েছে। সমস্ত রাস্তা বন্ধ। জ্যাম কখন ছুটবে কেউ জানে না। আমরা ততক্ষণে আগের দিনের জার্নিতে বেশ বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত। বান্দিপুর পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের রাত সাড়ে ৮টা বেজে গেল। সব ক্লান্তি অবশ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল হোটেল ভিলেজ ইনে প্রবেশ করেই। এত সুন্দর একটা হোটেল, খাবারের পরিবেশন, রুমগুলোও ছিল দারুণ। সব মিলিয়ে বান্দিপুরে প্রবেশটা ছিল মনে রাখার মতো।

সকালের সূর্যোদয়

যেহেতু রাতের সৌন্দর্য আমরা দেখত পারিনি, আবার আজকে সকালেই আমাদের রওনা হতে হবে পোখারা উদ্দেশে তাই সকাল থেকেই আর অপেক্ষা করিনি। সূর্য ওঠার আগেই হোটেলের সামনে খোলা জায়গায় চলে গেলাম সবাই মিলে। দেখলাম পাহাড়ের সৌন্দর্য, মেঘের লুটোপুটি, সঙ্গে সূর্যোদয়। সেখানেই সকালের শুরুটা কাটিয়ে গ্রামে হাঁটতে বের হলাম। মূলত যেতে চাচ্ছিলাম বান্দিপুর বাজারে। একে ওকে জিজ্ঞেস করতে করতে যতই সামনে যাচ্ছি, ততই সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছি। পাহাড়ের গায়ে গায়ে একেকটা ঘর, দোকান। রাস্তা সমতল হলেও বেশ উঁচু-নিচু। বাজারের দিকে যেতে যেতে অনেকটা পথ সিঁড়ি দিয়েও হেঁটে উঠতে হলো।

বাজারের ঠিক আগেই পেয়ে গেলাম নেপালি পোশাক ভাড়া দেয় এমন একটি পরিবারকে। বান্দিপুর বিদ্যালয়ের সঙ্গেই লাগোয়া দোকান তাদের। এই বিদ্যালয় থেকেই সামনে ওপরের দিকে হেঁটে উঠলে বান্দিপুরের তুন্দিখেল ভিউপয়েন্ট। যেখানে দাঁড়ালে হিমালয়ের ঝলক দেখা যায়।

নেপালি পোশাক পরে বান্দিপুরের বাজারে

আমাদের হাতে সময় কম দেখে আমরা ভিউপয়েন্টে আর যাইনি। নেপালি পোশাক পরে নিলাম যার যার পছন্দমতো। আমরা দুই ধরনের পোশাক বেছে নিয়েছিলাম। একটি ছিল গুরুং চোলিÑ যেটাতে বেশ ঘেরওয়ালা লেহেঙ্গা থাকে। আরেকটি পোশাক ছিল শেরপা। দুধরনের পোশাকের সঙ্গেই ছিল বাহারি গহনা। পোশাক ও গহনা পরে আমরা বান্দিপুরের বাজারের উদ্দেশে রওনা হলাম।

বাজারে গিয়েই আমাদের চক্ষু চরকগাছ হওয়ার মতো অবস্থা! চারপাশে এত সুন্দর! এখন বসন্তকাল নয়, তারপরও কিছু গাছে ফুটে আছে রঙিন রঙিন ফুল। বাগানবিলাস যেন প্রতিটি দোকানের সামনে। আমরা সবাই মিলে বাজারে হাঁটতে শুরু করলাম। সকালে খুব বেশি মানুষ ছিল না। ট্যুরিস্ট ছিল বেশ কয়েকটি দেশের। আমাদের নেপালের পোশাক পরা দেখে তাদের মাঝে অনেকেই এগিয়ে এলেন ছবি তোলার জন্য। ১১ জন মেয়ের ইরানি একটি গ্রুপের সঙ্গে পরিচয় হলো। ফ্রান্স, স্পেনের অনেকেই এগিয়ে এসে কথা বললেন। সবাই মিলে অল্প সময়ের মধ্যে যতটুকু পারলাম জায়গাটা ভালোভাবে দেখে নিলাম। মুগ্ধ হলাম সেখানকার রেস্টুরেন্ট, খাবারের মেন্যু দেখে। দোকানগুলো তখনও সেভাবে খোলেনি দেখে ভেতরে ঘুরে দেখা হয়নি।

এই বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছেÑ কোনো রেস্টুরেন্টের সঙ্গে কোনোটার মিল নেই। কিছু দোকান আধুনিকতার মিশেলে ইটের তৈরি হলেও বেশিরভাগই এখনও পুরনো দিনের কাঠেরই রয়ে গিয়েছে। কোনোটাই অনেক বড় না। দেখে মনেই হবে না যে এখানে ব্যবসার জন্য কেউ খাবার বানাচ্ছে। বরং পারিবারিক দৃশ্যই বেশি দেখা যায়। হয়তো পাশাপাশি তিনটি দোকান, পরিবারের তিনজন সদস্য তিনটি দোকান চালাচ্ছেন। খাবারের দোকানগুলোর ভেতরে যেমন বসার ব্যবস্থা আছে, তেমনই বাইরেও টেবিল চেয়ার আছে, যেখানে বেশ আরাম করে বসে খাবারের স্বাদ উপভোগ করা যায়। এই বাজারকে বান্দিপুরের কেন্দ্রস্থল বলা হয়। এখানে গিফট ও স্যুভেনিয়ার কেনা যায় এমন অনেকগুলো দোকানও রয়েছে, আছে মন্দিরও। ঘুরে দেখতে দেখতে জায়গাটা আমাদের সবারই অনেক ভালো লেগে যায়, সবাই নিজ নিজ মনে ভাবতে থাকিÑ ইস, আবারও যদি আসতে পারতাম!

আবারও বান্দিপুর

সেদিন ঘোরাঘুরি করে আমরা বান্দিপুর থেকে পোখারা চলে এলাম খুব অল্প সময়ে। এখানে এসেও সবাই ভাবতে বসলাম যদি আরও কিছুক্ষণ বান্দিপুর থাকতে পারতাম। যেহেতু আর যাওয়া হবে না সেই ভাবনায় সবাই পোখারার পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। প্যারাগ্লাইডিং, বাঞ্জি শেষে ফেওয়ালেক, সারাংকোটসহ আমাদের আগে থেকেই ঠিক করে রাখা স্পটগুলো ঘোরাঘুরি করে রওনা দিলাম থামেলের উদ্দেশে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল ফিরতি পথেই মনোকামনা নামক জায়গা থেকে কেবল কারে ঘুরে আসব। কিন্তু ওই যে বলে না, মন থেকে কিছু চাইলে স্বয়ং বিধাতাও সেটা পূরণ করে দেন। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হলো। পথে বান্দিপুর কেবল কার দেখেও সেখানে না থেমে খানিকটা সামনে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি মনোকামনা বন্ধ। আবারও ফিরে এলাম বান্দিপুর কেবল কার স্টেশনে। স্টেশন দেখে সবাই বেশ অবাক হলাম। এত বড় ও এত সুন্দর! টিকিট কেটে সবাই চড়লাম কেবল কারে।

বিস্ময়ের পালা শুরু হলো এবার। ওয়ান ওয়ে শেষ করে যখন সেকেন্ড ওয়েতে উঠব তখন আমাদের বলা হলো আমরা চাইলে খানিকটা সময় বিরতি নিয়ে বান্দিপুর বাজারে ঘুরে আসতে পারি! সবাই তখন স্টেশনের দিদিকে বার বার জিজ্ঞেস করছি বান্দিপুরের বাজার কয়টা? এটা কি সেই বাজার, যেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর খাবারের দোকান রয়েছে? উনি হেসে বলতে লাগলেন, হ্যাঁ, এটাই সেই বাজার। আমরা প্রায় সবাই দৌড়ে চলে গেলাম বাজারে! গিয়ে দেখি এটাই সেই বাজার! যেখানে আসার জন্য আমাদের মন আকুপাকু করছিল বারবার! বিস্ময়ে, ভালো লাগায় সবাই যেন ছোট্ট বান্দিপুরের প্রেমে পড়ে গেলাম মুহূর্তেই!

মুগ্ধতার রেশ সঙ্গে নিয়েই আমাদের বেশ খানিকটা সময় সেখানে কাটল। দুপুরের খাবারও ওখানেই খেলাম। আমাদের মধ্যে দুজন নিলো খাজা সেট, বাকিরা নিলাম ভেজিটেবল ও মাটন থালি। দুটো খাবার প্রায় একই। শুধু ভাতের জায়গায় চিড়া রয়েছে খাজা সেটে। খাবারের থালাতেই ডাল, আচার, পাপড় থাকে। খাবারের স্বাদও বেশ ভালো। অনেক মসলা ও ঝাল ওরা খাবারে দেয় না। রান্নার ধরনে যে ভিন্নতা সেটার স্বাদই মুখে লেগে থাকে অনেকক্ষণ। খাবার খাওয়া শেষে আবারও একবার বান্দিপুরকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম থামেলে। বান্দিপুরের কাছ থেকে বিদায় নিতে ইচ্ছা না করলেও সময় ও বাস্তবতার কাছে হার মেনে ফিরতেই হলো। নিজের কাছে নিজেরাই কথা দিলাম, আবারও ফিরব এই ছিমছাম বান্দিপুরে।

এক নজরে বান্দিপুর

পোখারা থেকে মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে বান্দিপুরে আসতে। নেপালের ঐতিহ্য সম্পর্কে যদি কেউ জানতে চায় তারা বান্দিপুর ঘুরে এলে অনেকটুকুই জানা হয়ে যাবে। হুট করে এখানে আসলে মনে হবে আপনি কোনো ইউরোপিয়ান পুরনো শহরে চলে এসেছেন। এখানে সবাই স্লো লাইফ লিড করে। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই, রাস্তার জ্যাম নেই, ঘড়ি দেখে কাজ করার তাড়া নেই, কোনো একটি দোকানের সামনে হয়তো দুজনে মিলে দাবার বোর্ড নিয়ে বসে গিয়েছে, বাকিরাও যার যার মতো বই পড়ছে, পত্রিকা পড়ছে, খাবার বানাচ্ছে। চারপাশে অনেক মানুষ, অথচ অদ্ভুদ রকমের নিস্তব্ধতাÑ এই নিস্তব্ধতার প্রেমে আপনাকে পড়তেই হবে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টাউনহাউসগুলো দেখলে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। হাঁটতে হাঁটতে একবারও আপনার মনে হবে না ঘড়ি দেখে সময়টা জানি, কারণ এখান থেকে ফেরার সব কারণই যেন উপেক্ষিত! নানা রঙের ঘর, রঙিন ফুলের বাঁশঝাড়, স্লো লাইফ দেখে আপনার মনে হবে নিশ্চিত কোনো জাদুঘরে আপনি চলে এসেছেন, যেখানে শুধু ঘুরে ঘুরে দেখতে হয়, জানতে হয়।

বান্দিপুরের ঘরগুলো খুব বেশি উঁচু হয় না, মোটা ইট দিয়ে তৈরি হয় দেয়াল এবং ছাদ তৈরি হয় ক্লে টাইলস দিয়ে, বেশিরভাগ ঘরেই খোলা উঠোন থাকে, জানালাগুলো ভাঁজ করে খোলা ও বন্ধ করা যায়, সিঁড়িগুলোর কাঠের রেলিং এ নকশা খোদাই করা। আধুনিক কোনো ভবনের সঙ্গেই পুরনো এই ভবনগুলোর তুলনা হয় না।

নেপালের মাগার গোষ্ঠীর মাধ্যমেই মূলত বান্দিপুর গ্রামটির উৎপত্তি হয়। ১৮ শতকের দিকে বেশ কয়েকটি নেপালি পরিবার ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কাঠমান্ডু থেকে বান্দিপুর আসে এবং এই জায়গাটিকে ট্রেড সেন্টার বানায়, যাকে সবাই বান্দিপুর বাজার নামে চিনে। এই বাজারটি ভারত-তিব্বত-হিমালয়ান ট্রেড রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নানা ধরনের মসলা, লোহার জিনিসপত্র, পশুপাখি, চামড়া, শস্যসহ নানাকিছু এখানে আদান-প্রদান করা হতো। এই সময়েই এখানে বিভিন্ন রাস্তা, টাউনহাউস, কার্ভড উইন্ডো (জানালা) ও দরজা তৈরি করা হয়। এর সবই নেপালি আর্কিটেকচারের প্রতিফলন। ছোট্ট এই গ্রামটিতে এলে আপনার মনে হবে সময় বুঝি এখানে থমকে গিয়েছে। এক রাশ ভালো লাগা নিয়ে ফিরবেন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই গ্রাম থেকে। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা