× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রূপকথা

শহরের ও গ্রামের ইঁদুর

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:০২ পিএম

অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার

অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার

অনেক দিন আগে এক মস্ত শহরে থাকত একটা ছোট্ট ইঁদুর। একদিন সে তার এক বন্ধুর ছবি খুঁজে পেল। সেই বন্ধু থাকত ছোট্ট এক গ্রামে। ছবিটা দেখে একদিন সে ঠিক করল, বন্ধুর সাথে দেখা করে তাকে চমকে দেব, যা ভাবা সেই কাজ। ট্রেনে চেপে রওনা দিল গ্রামের পথে। ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে যাওয়ার সময় তার নাকে এসে দুর্গন্ধ এসে লাগল, নাক চেপে সে বলে উঠল, ‘কি বিশ্রী গন্ধ রে বাবা, একেবারে গোয়ালের পশুদের মতো। এখানে কী করে থাকে আমার বন্ধু?’

ভাবতে ভাবতে শহুরে ইঁদুর বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছে গেল। গাঁয়ের বন্ধু দরজা খুলে শহুরে বন্ধুকে দেখে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। শহুরে বন্ধু বলল, ‘প্রিয় বন্ধু, কেমন আছ বলো? ভাবলাম কিছু না জানিয়ে এসে তোমাকে চমকে দেব।’

‘সত্যি বন্ধু তুমি চমকে দিয়েছ। ভাবতেই পারিনি যে তোমার সাথে দেখা হবে। তুমি সেই সুদূর শহর থেকে দেখা করতে এসেছ সেজন্য আমার দারুণ আনন্দ হচ্ছে।’

দুই বন্ধু বসে গল্প করতে লাগল। গাঁয়ের বন্ধু বলল, ‘এতটা পথ এসে বন্ধু তুমি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত। তুমি বরং হাতমুখ ধুয়ে এসো। ততক্ষণে আমি তোমার খাওয়ার জন্য কিছু একটা নিয়ে আসি।’

এই বলে গ্রামের ইঁদুর ক্ষেতের দিকে রওনা হলো আর শহুরে ইঁদুর গেল হাত মুখ ধুতে। গ্রামের ইঁদুর ক্ষেত থেকে বেশ তরতাজা আলু আর শাকসবজি, ভুট্টার মোচা, মিষ্টি আলু, ওলকপি এগুলো তুলে নিয়ে এলো। ওদিকে শহুরে ইঁদুর হাতমুখ ধুতে গিয়ে সব পানি শেষ করে ফেলল, পানি ফুরিয়ে যেতেই বলে উঠল, ‘ওহ্, এইখানে এইটুকু মাত্র পানি? আমাদের শহরে কত ভালো ব্যবস্থা, পানি ফুরায় না।’

শহুরে ইঁদুর ভীষণ বিরক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। বেরিয়ে দেখে গাঁয়ের ইঁদুর তার জন্য খাবার সাজিয়ে রেখেছেÑ তাজা শিম, তাজা ওলকপি, মিষ্টি আলু আর ভুট্টা। সাথে দুধ। গাঁয়ের বন্ধু শহুরে বন্ধুকে বলল, ‘বন্ধু দেখ, আমি তোমার জন্য কতসব তাজা তাজা পুষ্টিকর খাবার নিয়ে এসেছি। এসো আমরা খাই।’ এই বলে সে বন্ধুকে খেতে দিল।

খেয়ে শহুরে বন্ধু ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, ‘তোমরা গ্রামে থেকে শুধু এইসব খাও নাকি? কী বিচ্ছিরি! পানসে আর অখাদ্য, কোনো স্বাদই তো নেই।’

গাঁয়ের বন্ধু শহুরে ইঁদুরকে অনেক চেষ্টা করল সন্তুষ্ট করতে। কিন্তু কিছুতেই সফল হলো না। খাওয়া-দাওয়ার পর গেঁয়ো ইঁদুর ঠিক করল, সে তার বন্ধুকে গ্রামের খামার আর ক্ষেতগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে। দুই বন্ধু মিলে খামার দেখতে বের হলো। শহুরে বন্ধু ফুলের গন্ধ পেয়ে খুশিতে বলে উঠল, ‘বাহ্, বাতাসে কী মিষ্টি ফুলের গন্ধ পাচ্ছি, ওই সবুজ সবুজ লম্বা লম্বা ফলগুলো কী?’ 

‘ওগুলো হলো মটরশুঁটি, চিবিয়ে খেতে যা মজা!’

এরপর তারা একটা খোলা জায়গায় এসে পৌঁছল। শহুরে বন্ধু এবার নাক সিঁটকে বলে উঠল, ‘কী দুর্গন্ধরে বাবা, আমার শহর কী দারুণ পরিষ্কার, একটুও গন্ধ নেই। সত্যি বলতে কী বন্ধু, তুমি যেভাবে থাকো, সেটা আমার পছন্দ না। কী সব খাবার খাও তুমি। চারদিকে শুধু পোকামাকড় আর ময়লা। তুমি আমার শহরে এসোÑ তুমি এইসব ভুলে যাবে।’

‘খাবারগুলো ভালো না লাগায় দুঃখিত। কিন্তু আমার খাবারগুলো খারাপ কিছু নয়। একদম টাটকা তরতাজা সব খাবার।’

‘তুমি বরং শহরে এসে আমার সাথে কয়েক দিন থেকে যাও, দেখে যাও আমি কীভাবে জীবন কাটাই। আমি তোমাকে খেতে দেব পাস্তা, বাদাম, মাখন, পাউরুটি আরও কত কী?’

‘তাহলে তো দারুণ হয় হা হা হা।’

‘বন্ধু শহরে এসে দেখো, তোমার খুব ভালো লাগবে। দারুণ সময় কাটল বন্ধু, শহরে এসো দেখা হবে।’ এই কথা বলে শহুরে ইঁদুর ব্যাগ গুছিয়ে ফিরে চলল। ইঁদুর দুই বন্ধু কোলাকুলি করে সম্ভাষণ জানিয়ে একে অন্যের কাছ থেকে বিদায় নিল।

এর কয়েক দিন পর গেঁয়ো ইঁদুর তার ব্যাগ গুছিয়ে চলল শহুরে ইঁদুর বন্ধুর বাড়ি। শহরে পৌঁছেই বড় বড় দালানকোঠার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, বলল, ‘বাবা, কী উঁচু উঁচু বাড়ি, ঝকঝকে গাড়ি! কত ভালো ভালো খাবার না খাব আমি। আমি তো শহরের প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। বড় বড় পাকা রাস্তা পেয়ে মনের আনন্দে হাঁটতে শুরু করল সে। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে পড়ল, চাপা পড়তে পড়তে প্রায় বেঁচে গেল। ভয় পেয়ে বলে উঠল, ‘বাবারে, চারদিকে কী বিকট আওয়াজ, মানুষের ঠেলাঠেলি।’

অবশেষে সে শহুরে ইঁদুরের বাড়িতে পৌঁছল।

শহুরে ইঁদুর গেঁয়ো ইঁদুর বন্ধুকে দেখে খুব খুশি হলো, ‘স্বাগত তোমাকে স্বাগত আমার বন্ধু। আমার বাড়িতে তোমাকে স্বাগতম।’

শহুরে ইঁদুর গেঁয়ো ইঁদুরকে তার বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। খানিকক্ষণ গল্পগুজব করল। বাড়ির চাকর যখন খাবার টেবিলে খাবার সাজাতে শুরু করল, শহুরে ইঁদুর তার গন্ধ টের পেল। গাঁয়ের বন্ধুকে বলল, ‘চলে এসো বন্ধু, খাবার তৈরি হয়ে গেছে। খেতে যাই।’

গাঁয়ের ইঁদুর তো এসব খাবার খাওয়ার জন্য দারুণ উত্তেজিত হয়ে আছে। এসো শুরু করা যাক বন্ধু, এই হলো মাখন, দুধ, পাস্তা, টোস্ট, চীনাবাদাম, কেক আর ফল।’

‘ধন্যবাদ বন্ধু, তোমার জীবনযাত্রা দেখে আমার ভীষণ ভালো লাগছে। আমি তো ভাবছি, আমি তোমার সাথে এখানেই থেকে যাব।’

ওরা যেই না খাওয়া শুরু করেছে অমনি চাকরটা ফিরে এলো একটা লাঠি নিয়ে। লাঠি দিয়ে ওদের তাড়া করল, ‘নোংরা ইঁদুর কোথাকার, যা ভাগ এখান থেকে।’

দৌড়ে দুজন ওখান থেকে বাক্সের তলায় লুকিয়ে কোনো প্রকারে জীবন বাঁচাল। এ ঘটনায় শহুরে ইঁদুরটা বেশ লজ্জায় পড়ে গেল। তবু হাসিমুখ নিয়ে বলল, ‘ভয় পেয়ো না বন্ধু, আমরা খেতে পারব, ও চলে গেলেই খেতে যাব। বরং চলো ও না যাওয়া পর্যন্ত আমরা একটা জায়গায় ঘুরে আসি। তোমাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে সব খাবার পাবে।’

এই বলে দুজন বেরিয়ে একটা মস্ত বড় দোকানে ঢুকল। সেখানে ঢুকে গাঁয়ের ইঁদুর বলে উঠল, ‘আরে, এটা কোন বেহেশতে নিয়ে এলে বন্ধু?’

‘এটা এই শহরের বিখ্যাত একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর।’

এমন সময় ওরা দেখতে পেল একটা বিড়াল তীরবেগে ওদের দিকে ছুটে আসছে।’

‘তাড়াতাড়ি পালাও। পালাও বন্ধু, ছোট তাড়াতাড়ি।’

হাঁপাতে হাঁপাতে গেঁয়ো ইঁদুর বলল, ‘বাবারে বাবা, ওটা কী? আমার বুকটা কেমন যেন ধড়ফড় ধড়ফড় করছে।’

‘ওটা বড় একটা হুলো বিড়াল। ওটা এক্ষুনি চলে যাবে। শুধু কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকো।’

বিড়ালটা চলে যাওয়ার পর ওরা আবার দোকানে ঢুকল। সেখানে ওরা এবার একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল। চিনতে না পেরে গেঁয়ো ইঁদুর বলল, ‘আরে এটা আবার কী?’

শহুরে ইঁদুর তাকে থামিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘সাবধান, ওটা ইঁদুর ধরার কল।’

‘ইঁদুর ধরার কল আবার কী?’

‘আমি ঠিক জানি না কীভাবে বোঝাব তোমাকে? শুধু এটুকু জানি, যখন তুমি ওই খাঁচার ভেতরের বিস্কুটটা খেতে মুখ বাড়াবে তখনই তুমি ওতে আটকে যাবে।’

‘ওহ্হ্ হো হোÑ ভয়ংকর কল! এবার তো আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। এসব আর করতে পারছি না।’

‘আরে এত বেশি চিন্তার কিছু নেই। খালি একটু সাবধান থাকো।’

‘না বন্ধু, অনেক তো হলো। এই ছোটাছুটি, দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি, সব সময় ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা, পালিয়ে বেড়ানোÑ আমি তো এসব করার জন্য গ্রাম থেকে শহরে আসিনি। তাই আমি ঠিক করলাম, আমি গ্রামের বাড়িতেই ফিরে যাব। ওখানে অনেক শান্তি আছে।’

‘আমি খুব দুঃখিত এইসব হলো বলে।’

‘ভয়ে ভয়ে এসব কেতাদুরস্ত খাবার খাওয়ার চেয়ে বাড়ি ফিরে নিজের বাগানের টাটকা খাবার খাওয়াই ভালো। গ্রামে সহজ-সরল জীবন কাটানো এই বিলাসবহুল জীবন কাটানোর চেয়ে অনেক ভালো। বুঝলে বন্ধু?’

এরপর সেই গেঁয়ো ইঁদুর তার ছোট্ট গ্রামে ফিরে এলো আর খামারের তরতাজা খাবার খেয়ে বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটিয়ে দিল।

(পঞ্চতন্ত্রের গল্প অবলম্বনে)


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা