× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্ভাবনা, সংকট আর লবণ চাষিদের জীবনযুদ্ধ

ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৪৯ পিএম

সম্ভাবনা, সংকট আর লবণ চাষিদের জীবনযুদ্ধ

দেশের লবণ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। দেশের মোট লবণ চাহিদার ৭৫ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন হয় এই জেলায়। বঙ্গোপসাগরের নোনাপানি, সূর্যের তেজ আর প্রাকৃতিক বাতাসের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যের অন্যতম এই লবণ শিল্প। যুগের পর যুগ ধরে এটি শুধু একটি কৃষি কার্যক্রম নয়, বরং উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। অথচ হাজার কোটি টাকার এই খাত বর্তমানে নানা সংকট, অনিশ্চয়তা ও সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত। 

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, বাজার ব্যবস্থাপনার অস্থিরতা, ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে লবণ চাষিরা প্রতিনিয়ত টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তারা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা বাজার নিয়ন্ত্রণের অভাবে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। তবু তারা আশার আলো হারিয়ে ফেলেননি। প্রতিদিনের পরিশ্রম, ঘাম ও সময় দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী খাতকে টিকিয়ে রাখছেন ভবিষ্যতের স্বপ্নে ভর করে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে চলতি বছর মোট লবণের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ উপকূলে উৎপাদিত হয়েছে ১৯ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন লবণ, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণ করেছে। এই বিপুল উৎপাদনের মাধ্যমে শুধু দেশের ভেতরের প্রয়োজনই মেটে না, শিল্পকারখানার বিভিন্ন খাতেও জোগান দেওয়া হয় কক্সবাজারের লবণ। তবু উৎপাদনের অনিশ্চয়তা, বাজারজাতের জটিলতা ও আমদানিনির্ভর নীতির কারণে চাষিরা বারবার ক্ষতির মুখে পড়েন। 

বর্ষার সময় বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে হঠাৎ করেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে পুরো মৌসুমের বিনিয়োগ হারিয়ে যায়। বাজার ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার অভাবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে চাষিরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ হন। ফলে একদিকে যেখানে দেশের বিশাল চাহিদা পূরণে তারা মূল ভূমিকা রাখছেন, অন্যদিকে ন্যায্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে রয়ে যাচ্ছেন বঞ্চিত ও অবহেলিত।

লবণ চাষের প্রক্রিয়া 

লবণ চাষ সাধারণত প্রতি বছর অক্টোবর থেকে নভেম্বরের শেষ দিকে শুরু হয়ে মে মাস পর্যন্ত চলে। বর্ষা শেষে জমি প্রস্তুতের মাধ্যমে শুরু হয় এই প্রক্রিয়া। প্রথমে জমি সমতল করে চারপাশে শক্ত বাঁধ তৈরি করা হয়, যাতে সমুদ্রের পানি ঠিকভাবে আটকে রাখা যায়। এরপর জমিতে নালা ও ছোট ছোট প্লট বানিয়ে তাতে নোনা সমুদ্রের পানি তোলা হয়। প্রচণ্ড রোদে ধীরে ধীরে এই পানি শুকিয়ে সাদা স্ফটিকের মতো লবণ তৈরি হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে শ্রম, সময় ও দক্ষতার পাশাপাশি আবহাওয়ার অনুকূলতার ওপর। একদা লবণ উৎপাদন সনাতনী পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও কালের বিবর্তনে বর্তমানে এই খাতে এসেছে আধুনিকায়ন। এতে উৎপাদন বেড়েছে, সময় কমেছে, গুণগত মান উন্নত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে পদ্ধতির উন্নয়ন হলেও চাষিদের মৌলিক সমস্যা এখনও থেকে গেছে আগের মতোই।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় পলিথিন পদ্ধতিতে লবণের চাষ করা হচ্ছে, যা সনাতনী পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। এই পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন হয় ৫২ শতাংশেরও বেশি, পাশাপাশি মানও থাকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। ফলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে। সনাতনী পদ্ধতিতে যেখানে প্রতি একরে গড়ে ১৭ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হতো, সেখানে এখন পলিথিন পদ্ধতিতে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ মেট্রিক টনে, যা আগের তুলনায় ৫২ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। যেহেতু লবণ চাষ মৌসুমভিত্তিক, তাই বছরে ছয় মাস লবণ উৎপাদনের পর বাকি সময় একই জমিতে অনেক চাষি লোনাপানির চিংড়ি চাষ বা অন্যান্য মাছ চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। এতে জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হয়, যদিও ঝুঁকি থেকে যায় সমানতালে।

কক্সবাজারের লবণ চাষিদের হিসাবে, এক একর জমিতে মৌসুমে গড়ে প্রায় ২৬ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়। উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় জমির অগ্রিম মূল্য, জমি প্রস্তুত করা, পলিথিন ক্রয়, বাঁধ নির্মাণ, পানি তোলা এবং শ্রমিকদের মজুরি প্রদানে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো লাভ হয়, কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় বা মৌসুমের আগাম বর্ষা এলে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে চাষিদের ঋণ পরিশোধ ক্ষমতার ওপর।

জেলা লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গেল মৌসুমে কক্সবাজারে প্রায় ৬০ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। এ সময় এই খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এক লাখেরও বেশি চাষি ও শ্রমিক। মৌসুমভিত্তিক এই চাষে প্রতিদিন হাজারো পরিবার মাঠে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরুষদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণও লক্ষণীয়, যা এই খাতের সামাজিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

লবণ মৌসুমে চাষিরা প্রায় ৬ থেকে ৭ মাস মাঠে নিরলস পরিশ্রম করেন। বছরের বাকি সময় কেউ কৃষিকাজ করেন, কেউ মাছ ধরা, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা দিনমজুরির কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। মৌসুমে সামান্য লাভ হলেও তা দিয়ে পুরো বছর চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। অনেকের ঘরবাড়ি বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি, মৌসুমের আয় দিয়েই সংসারের সমস্ত ব্যয় মেটাতে হয়। 

চাষি ইমান আলী বলেন, ‘আমরা সূর্য, বাতাস আর ভাগ্যের ওপর ভরসা করে চাষ করি। একটা বৃষ্টি হলে সব শেষ।’ তিনি মনে করেন, সরকার যদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করে, তাহলে চাষিরা আরও উৎসাহিত হবেন। 

নারী চাষি রশিদা খাতুন বলেন, ‘আমরা নারীরাও প্রতিদিন মাঠে কাজ করি। রোদে পুড়ে, লবণ পানিতে পা পুড়িয়ে কাজ করি। তবুও দাম না পেলে সব কষ্ট বিফলে যায়।’ এই বক্তব্যগুলো মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরে, যেখানে প্রতিটি ফোঁটা ঘাম মিশে আছে লবণের স্ফটিকে।

কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা 

লবণ মৎস্য ও কৃষি কল্যাণ সমিতি রাজাখালী (পেকুয়া) ইউনিয়ন শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল হালিম বলেন, লবণাক্ত পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চাষিদের ত্বক ফেটে যায়, পায়ে ঘা হয়, চোখে জ্বালাপোড়া ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগে ভুগলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা বা সচেতনতার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই পেশা ছাড়তে পারছেন না, কারণ এটি তাদের একমাত্র জীবিকা। কোনো ধরনের স্বাস্থ্যসেবা বা সুরক্ষাসামগ্রী না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। এ বাস্তবতা দেখায়, উৎপাদনের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক নয়, শারীরিক ত্যাগও কতটা বড় একটি উপাদান।

উৎপাদনের পর লবণ স্থানীয় বাজার, আড়তদার ও শিল্পকারখানায় বিক্রি করা হয়। বেশিরভাগ চাষি নিজেরা বাজারজাত করতে পারেন না। ফড়িয়া বা আড়তদারদের ওপর নির্ভর করতে হয়, যারা অনেক সময় কম দামে লবণ কিনে মজুদ করে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন। এতে আসল লাভটা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। বাংলাদেশের শিল্প খাতে যেমন টেক্সটাইল, ট্যানারি, কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে লবণের চাহিদা ক্রমবর্ধমান, তেমনি খাদ্য লবণের চাহিদাও বাড়ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে । কিন্তু আমদানিনির্ভর শিল্প লবণের নীতিতে স্বচ্ছতার অভাব থাকায় স্থানীয় লবণ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে আমদানি চলতে থাকায় দাম পড়ে যায়, চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এ অবস্থায় স্থানীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্প টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিসিক কক্সবাজারের (লবণ শিল্পের উন্নয়ন) উপমহাব্যবস্থাপক আবু জাফর ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে বাজারে লবণের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় প্রান্তিক চাষিরা দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চাষিদের আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত। তবু লবণ একটি বিকল্পহীন পণ্য হওয়ায় এর সম্ভাবনা বিশাল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে লবণের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর অবস্থানও বেশ শক্তিশালী। 

তিনি আরও বলেন, টেকসই লবণ শিল্প গড়ে তুলতে হলে চাষিদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ক্রুড লবণের গুণগত মান উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। জমির লিজ মানি সহনীয় পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন এবং যত বেশি সম্ভব সরকারি খাসজমি প্রকৃত প্রান্তিক চাষিদের মাঝে বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে চাষিদের সমিতি গঠন করে সম্মিলিত চাষ পদ্ধতি চালু করা গেলে দালালদের প্রভাব অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব হবে।

সরকারি উদ্যোগে ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় আধুনিক লবণ গুদাম, সংরক্ষণাগার এবং চাষিদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগগুলো এখনও পর্যাপ্ত নয়। সময়োপযোগী সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে মৌসুম শেষে উৎপাদিত লবণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে বিপণন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চাষিরা ন্যায্য দাম পাবেন, উৎপাদনও বাড়বে, পাশাপাশি রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। 

কক্সবাজারের লবণ শুধু একটি পণ্য নয়, এটি হাজারো পরিবারের জীবিকার ভিত্তি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শিল্প টিকিয়ে রেখেছে উপকূলের মানুষ। যথাযথ নীতি সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এই শিল্প আরও বিকশিত হয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা