মেহেদী হাসান সিয়াম
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৪৫ পিএম
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মিঠিপুর-জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম। এই বয়সে হাতে খাতা-কলম থাকার কথা থাকলেও পরিবারের দারিদ্র্য এবং বাবার অসুস্থতার কারণে সে এখন ঢাকায় বহুতল ভবনে নশকা তৈরির কাজ করছে। ফলে এখন তার পড়াশোনা বন্ধ। মিনহাজুলের বাবা মোবারক হোসেন চাঁপাই চিত্রকে জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। এই কারণে তিনি ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। এতে তাদের দরিদ্র পরিবারে আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তার ছেলে মিনহাজুলকে ১৫-২০ দিন আগে ঢাকায় কাজের জন্য পাঠাতে হয়েছে।
পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে মিনহাজুলের মতো অনেক শিশু-কিশোর টাকা উপার্জনের জন্য স্কুল থেকে ছিটকে পড়ছে। ফলে তাদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত শক্তিশালী হচ্ছে না, দুর্বল থেকে যাচ্ছে। অল্প বয়সে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তারা কোনো বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ফলে তারা অদক্ষ শ্রমের বাজার ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা থাকে না। বাধ্য হয়েই তারা কম বেতনের ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।
-68ef429b23ba5.jpeg)
জেলা পরিসংখ্যান অফিস সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বসীমার হার ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে সর্ব নিম্নসীমা ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৯.৬ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার হার গোমস্তাপুর উপজেলায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ৫৪.৭ শতাংশ, নাচোল উপজেলায় ৫০.৩ শতাংশ, শিবগঞ্জে ৫০.১ শতাংশ এবং সর্ব নিম্নসীমার হার ৭.৯ শতাংশ ভোলাহাট উপজেলায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্ধেকের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বসবাস করে। অন্যদিকে জেলার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ অতিদরিদ্র। এসব পরিবারের শিশু-কিশোররা মূলত তাদের বাবা-মায়ের দারিদ্র্য উত্তরাধিকার সূত্রে পাচ্ছে। আর্থিক অনটনের কারণে শৈশবেই শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ায় তাদের জীবন গঠনের মূল ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ায় তাদের ভালো চাকরির সুযোগ চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই তাদের কম বেতনের ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনিরাপদ পেশায় যুক্ত হতে হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও এই শ্রমিকদের আয় সামান্যই থাকে। যখন তাদের নিজেদের সন্তান হয়, তখন সেই সন্তানরাও একই আর্থিক দুর্বলতা এবং শিক্ষার অভাবের শঙ্কা থেকেই যায়।
ইসারুল ইসলাম নামে এক শিক্ষক বলেন, পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণেই অনেক শিশু-কিশোর অল্প বয়সে তাদের শিক্ষাজীবন ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। আর্থিক দুর্বলতার কারণে এই শিশুরা ন্যূনতম প্রাথমিক শিক্ষা লাভের সুযোগও পাচ্ছে না। তাদের শৈশব খাতা-কলমের বদলে শুরু হচ্ছে কর্মক্ষেত্রের সরঞ্জাম হাতে। যদিও কিছু পরিবার অনেক সংগ্রাম ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাদের সন্তানকে উচ্চশিক্ষা দিতে সক্ষম হয়, তবে বেশিরভাগ দরিদ্র পরিবারের পক্ষেই তা সম্ভব হয় না।
মো. আখতার নামে আরেক শিক্ষক জোর দিয়ে বলেন, অল্প বয়সে পড়ালিখা বাদ দিয়ে কর্মে জড়িয়ে পড়ার হার গ্রামাঞ্চলে অনেক বেশি। এর প্রধান কারণ, গ্রামীণ অর্থনীতিতে অদক্ষ শ্রমের সহজলভ্যতা এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর দ্রুত আয়ের চাপ।
এসব সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব মনিরুজ্জামান মনির বলেন, দারিদ্র্য চক্র মূলত গ্রামীণ শিশু-কিশোরদের শিক্ষাজীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় সহায়তার মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী মিনহাজুলের মতো বাকিদেরও দ্রুত শিক্ষাজীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। অসচ্ছলতা দূরীকরণ ও শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়তে হলে দারিদ্র্যের এই উত্তরাধিকার ভাঙার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসের গবেষণা কর্মকর্তা মো. মেসবাহ উদ্দীন বলেন, যারা খুব ছোট বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়; তাদের সার্বিক জীবনে প্রভাব নেতিবাচক পড়ে। পরিবার তাদের খাটো করে দেখে। সামাজিকভাবে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় হয় না। যারা এমন পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না তারা মাদকাসক্তের পাশাপাশি বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। গ্রামের পাশাপাশি শহরেও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরের অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের দরিদ্রতার কারণেও অল্প বয়সেই কর্মক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া অনেক পরিবার তাদের সন্তানকে লেখাপড়া করানোর চেষ্টা করলেও দরিদ্রতার কারণে টাকা উপার্জনের ওপর জোর দিচ্ছে।
তিনি বলেন, সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম কমানো গেলে এসব রোধ করা যাবে। একই সঙ্গে
শিক্ষা সহায়তা অর্থাৎ বৃত্তির টাকা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে।