আশরাফুল ইসলাম কহিনুর
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৪০ পিএম
হবিগঞ্জের রেমা কালেঙ্গা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বনভূমি। জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে রেমা কালেঙ্গা একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। কিন্তু নির্বিচারে গাছ চুরি ও বন ধ্বংসের কারণে এ বনভূমির অস্তিত্ব এখন ধ্বংসের মুখে।
রেমা কালেঙ্গা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ১৯৯৬ সালে এটি আরও সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে এই অভয়ারণ্যের আয়তন ১৪ হাজার ৮৭৫ একর। অভয়ারণ্যটি রেমা ছনবাড়ী এবং কালেঙ্গা বিটের সমন্বয়ে গঠিত। এর সিংহভাগ কালেঙ্গা ও অল্প কিছু অংশ পড়েছে রেমা বিটে। এজন্য নাম রেমা কালেঙ্গা। কিন্তু মূল বিট আসলে কালেঙ্গা। এর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রেমা চা-বাগান, পূর্ব-দক্ষিণ দিকে ভারতীয় ত্রিপুরা রাজ্য এবং পূর্বদিকে ভারত হিল রিজার্ভ ফরেস্টের অংশ। রেমা কালেঙ্গা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক একমাত্র ভার্জিন বন। বিস্তীর্ণ এ অঞ্চল যেহেতু প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, এজন্য বনের দেখভালের জন্য রয়েছে ১১টি ইউনিট ও ৭টি ক্যাম্প।
কালেঙ্গা বন বিটের রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, এই অভয়ারণ্যে ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, গাছপালা-লতাপাতা আছে, যার মধ্যে উল্লে¬খযোগ্য উদ্ভিদগুলো হচ্ছে আওয়াল, সেগুন, কাঁকড়া, নেউর, হারগাজা, গন্ধরই, হরীতকী, বহেরা, জাম, ডুমুর, কাঁঠাল, চামকাঁঠাল, কাউ, কদম, রাতা, চিকরাশী, চাপালিশ, নিম, বনমালা ইত্যাদি।

আছে ৭ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৬৭ প্রজাতির পাখি যেমন ভিমরাজ, পাহাড়ি ময়না, কাও ধনেশ, বনমোরগ বা মুরগি, ফোটা কান্টি সাতভারলা, শ্যামা, শালিক, শামুক খাওরি, টুনটুনি। রেমা কালেঙ্গাতে দেশের বিপন্নপ্রায় পাখি শকুনেরও দেখা মেলে। দেশে এখন মেরেকেটে ৫০০টির মতো শকুন বেঁচে আছে, যার ১০০টিরই বসবাস এই বনে। ৩৭টি প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে। তার মধ্যে উল্লে¬খযোগ্য প্রাণী হচ্ছে বন্যশূকর কালো, বন্যশূকর সাদা, বানর, হনুমান, মুখপোড়া হনুমান, খরগোশ, ছোট হরিণ, মেছোবাঘ, মেছোবিড়াল, বনকুকুর বা রামকুত্তা।
রয়েছে তিন প্রজাতির বানরের বাস, উল্টোলেজি বানর, রেসাস ও নিশাচর লজ্জাবতী বানর। এখানে ৫ প্রজাতির কাঠবিড়ালি দেখা যায়। এর মধ্যে বিরল প্রজাতির মালয়ান বড় কাঠবিড়ালি একমাত্র এ বনেই পাওয়া যায়।
বন্য প্রাণীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরও রয়েছে মুখপোড়া হনুমান, চশমাপরা হনুমান, উলুক, মায়া হরিণ, মেছোবাঘ, দেশি বনশূকর, গন্ধগোকুল, বেজি, সজারু ইত্যাদি। কোবরা, দুধরাজ, দাশ, লাউডগা প্রভৃতিসহ এ বনে আঠারো প্রজাতির সাপের দেখা পাওয়া যায়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে রেমা কালেঙ্গা অভয়ারণ্য পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। এই বনে ছবির সুটিং, নাটক ও মিউজিক ভিডিও তৈরি করতে আসেন নায়ক-নায়িকা, মডেল ও শিল্পীরা। এক নজরে বনের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য আধাঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও ৩ ঘণ্টার ৩টি ট্রেইলর বা পথ রয়েছে। প্রতিটি আঁকাবাঁকা পথ ছবির মতো সুন্দর ও সাজানো। আছে একটি সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। আর পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ঘিরে রয়েছে একটি অসম্ভব সুন্দর লেক। আছে ত্রিপুরা, সাঁওতাল, তেলেগু ও উড়ং সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের পাড়া। বনের ভেতরে পর্যটকদের যাওয়ার জন্য টিকিট কেটে নিতে হয়। টিকিট মূল্য ২০ টাকা।
কালেঙ্গায় থাকার জন্য বন বিভাগের একটি ডাকবাংলো আছে, যেখানে থাকতে হলে জেলা প্রশাসক বা সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অনুমতি নিতে হয়। এ ছাড়া বেসরকারি ৩টি রিসোর্ট আছে, সিএমসি রিসোর্ট, রেমা কালেঙ্গা ইকো রিসোর্ট ও নিসর্গ তরফ হিল ইকোরিসোর্ট।
রেমা কালেঙ্গা থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে। অবিরত চলছে বনের নানা সম্পদ আহরণ। ফলে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ছে প্রাকৃতিক এই বনটি। অব্যাহতভাবে গাছ কাটার কারণে অনেক প্রজাতির গাছ বন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বন বিভাগের লোকজন মাঝেমধ্যে চোরাই কাঠ আটক করলেও চোরাকারবারিরা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এভাবে চলতে থাকলে বনাঞ্চল বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্য শূন্য হয়ে পড়বে। এ প্রাকৃতিক সম্পদকে বাঁচাতে হলে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
কালেঙ্গা বন বিটের রেঞ্জ কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, বন রক্ষার জন্য ২৩ জনের একটি টিম ভাগ হয়ে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে এত বড় এরিয়া দেখভাল করা সম্ভব হয় না। তার পরও আমরা চেষ্টা করি যাতে কোনো গাছ পাচার না হয়। মাঝেমধ্যে চোরাই কাঠসহ পাচারকারীদের ধরে থানায় সোপর্দ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও দেওয়া হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা সবদা সচেষ্ট।