সাদিয়া সিদ্দিকা
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪১ এএম
সকালের তাড়াহুড়োর মধ্যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নিলেন আপনি। পোশাক, গয়না, চুলÑ সব ঠিকঠাক। এখন শুধু প্রিয় পারফিউমের এক টুকরো ঘ্রাণ নেওয়া বাকি, আর আপনি প্রস্তুত দিনটা জয় করার জন্য। কিন্তু দুপুর গড়াতেই যেন সেই মিষ্টি ঘ্রাণ কোথায় হারিয়ে গেল! অফিসের ব্যস্ততা বা শহরের ধুলাবালিতে মিশে গেল আপনার প্রিয় সুবাসের স্পর্শ। অথচ ইচ্ছে তো ছিল, সারাদিন জুড়ে সেই ঘ্রাণ যেন আপনাকেই ঘিরে থাকেÑ নরম হাওয়ার মতো, অদৃশ্য অথচ উপস্থিত।
পারফিউমের জগৎটাই যেন এক রহস্য। সুবাসের এই শিল্প শুধু ফ্যাশনের অংশ নয়, এটা এক ধরনের ব্যক্তিত্বের প্রকাশও বটে। কারও পারফিউমের ঘ্রাণই বলে দেয়Ñ এই মানুষটি আত্মবিশ্বাসী, কোমল কিংবা রহস্যময়। কিন্তু সেই ঘ্রাণ ধরে রাখা? সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ। চলুন, জেনে নেওয়া যাক পারফিউমের ঘ্রাণ দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখার সেই গোপন জাদুগুলোÑ
ত্বকেই শুরু হোক সুবাসের গল্প
অনেকেই পোশাকে পারফিউম স্প্রে করেন। কিন্তু আসলে পারফিউম সবচেয়ে ভালো কাজ করে ত্বকে। কারণ ত্বকের উষ্ণতা ঘ্রাণকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দেয়। তবে শুকনো ত্বকে পারফিউম টেকে না। তাই প্রথমে হালকা ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন, তারপর পারফিউম ব্যবহার করুন। এতে ঘ্রাণ আরও সময় ধরে থাকবে।

পয়েন্টটা ঠিক করুন
ঘ্রাণের জাদু টিকিয়ে রাখার আরেকটা বিজ্ঞান আছেÑ পালস পয়েন্ট। অর্থাৎ শরীরের এমন স্থান যেখানে রক্ত চলাচল বেশি, আর ত্বক থাকে উষ্ণ। যেমনÑ গলার দুই পাশে, কব্জিতে, কানের পেছনে, কনুইয়ের ভাঁজে। এখানে পারফিউম ছিটালে সেই উষ্ণতায় সুবাস আস্তে আস্তে ছড়ায় আর দীর্ঘস্থায়ী হয়। সঙ্গে ছোট একটা টিপস কাজে দেয় অনেকাংশেÑ পারফিউম স্প্রে করার পর কব্জি দুটো ঘষবেন না। এতে ঘ্রাণের মূল অণু ভেঙে যায়, সুবাস দ্রুত উবে যায়।
স্তর তৈরি করুন
পারফিউমপ্রেমীদের প্রিয় রহস্যই বলা হয় একে! প্রথমে একই ঘ্রাণের বডি ওয়াশ বা লোশন ব্যবহার করুন, তারপর একই নোটের পারফিউম। এতে ঘ্রাণের স্তর তৈরি হয়, যা অনেক বেশি সময় স্থায়ী থাকে। যেমনÑ ল্যাভেন্ডার বডি লোশন + ল্যাভেন্ডার পারফিউম, সবকিছু মিলে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।
রোদে নয়, ছায়ায় রাখুন পারফিউম
অনেকে সাজগোজের টেবিলেই পারফিউম রাখেন কিংবা রোদ পড়ে এমন জায়গায়। এটাই কিন্তু পারফিউমের বড় শত্রু। সরাসরি আলো ও তাপে পারফিউমের রাসায়নিক গঠন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ঘ্রাণ হারিয়ে ফেলে শক্তি। তাই পারফিউম রাখুন ঠান্ডা ও অন্ধকার জায়গায়Ñ ড্রয়ারে বা কাপড়ের আলমারির ভেতরে।
চুলেও ছড়িয়ে দিন সুবাস
চুলের ঘ্রাণে এক অন্যরকম মুগ্ধতা আছে। তবে সরাসরি চুলে পারফিউম স্প্রে করবেন না। এতে অ্যালকোহল চুল শুকিয়ে দিতে পারে। বরং একটু দূর থেকে স্প্রে করুন, কিংবা পারফিউম মিশিয়ে নিন হেয়ারব্রাশে। এতে ঘ্রাণটা চুলে নরমভাবে লেগে থাকবেÑ বাতাসে ভেসে বেড়াবে আপনার উপস্থিতি। এ যেন একটু অন্যরকম ভালো লাগা।
পোশাকে একটু, কিন্তু বুদ্ধিমত্তায়
ত্বকে পারফিউম লাগানোর পর পোশাকে সামান্য স্প্রে করা যায়। বিশেষ করে কাঁধ, স্কার্ফ বা ওড়নায়। কাপড়ের ফাইবার ঘ্রাণ ধরে রাখে বেশি সময়। তবে খেয়াল রাখবেনÑ সাদা পোশাকে সরাসরি স্প্রে করা থেকে। অনেক সময়ই এতে দাগ পড়ে যেতে পারে।
সঠিক পারফিউম বেছে নেওয়া
সব পারফিউম একরকম নয়। Eau de Parfum (EDP) তে ঘ্রাণের ঘনত্ব বেশি থাকে, তাই এটি দীর্ঘস্থায়ী। Eau de Toilette তুলনামূলক হালকা, তাই দিনের জন্য ভালো, কিন্তু বেশি স্থায়ী নয়। তাই যারা চান ঘ্রাণ সারাদিন থাকুক, তাদের জন্য EDP সেরা পছন্দ। এ ছাড়া ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট বেয়ার ভ্যানিলা, রালফ লরেন পোলো ব্ল্যাক ইডিটি এসব পারফিউম তুলনামূলকভাবে বেশ স্থায়ী হয়ে থাকে।
মেজাজের সঙ্গে মিলিয়ে ঘ্রাণ
পারফিউম শুধু সাজ নয়, এটা মুডও প্রকাশ করে। সকালে অফিসে যেতে হালকা, ফ্রেশ ঘ্রাণÑ যেমন সাইট্রাস বা লিলি। সন্ধ্যার পার্টিতে ভারী ও সেক্সি নোটÑ যেমন মস্ক, উড বা ভ্যানিলা। ঘ্রাণের এই মেজাজই আপনাকে করে তোলে আলাদা, স্মরণীয়।
একটা ঘ্রাণ অনেক সময় পুরো একটা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়। কেউ হয়তো চলে গেছে অনেক দূর, কিন্তু তার পারফিউমের ঘ্রাণ আজও কোথাও নাকে এসে লাগে, হালকা কাঁপিয়ে যায় মন। এই কারণেই পারফিউম শুধুই সাজ নয়Ñ এ এক অদৃশ্য গল্প, যা সময়ের গায়ে লেগে থাকে। তাই অনেকের কাছে এটি শুধু ঘ্রাণ নয়, এটি আত্মার এক টুকরো পরিচয়। আর তাই যত্নে রাখুন আপনার পারফিউম আর নিজেকে ভাসিয়ে দিন সেই দীর্ঘস্থায়ী সুবাসের মায়ায়।