আমির খসরু সেলিম
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:২৫ পিএম
অলংকরণ : অদ্বিতীয়া অপরা, প্রথম শ্রেণি, নালন্দা বিদ্যালয়, ঢাকা
মা, জানো আজ কী হয়েছে?
কী হয়েছে?
আমাদের স্কুলের গেটের কাছে একটা ইয়া বড় গাছ আছে। আগে তো তোমাকে বলিনি। আসলে আমিই আগে দেখতে পাইনি। আচ্ছা বল তো, কেন দেখতে পাইনি? আমার তো চোখ ভালো। আমি তো চশমা পরি না। আমি তো সব দেখতে পাই। তাহলে আগে কেন দেখতে পাইনি? তখন আমি খুব ভাবলাম। ভাবতে ভাবতে আমার মাথার ভেতরে পানির ঘূর্ণির মতো একটা ঘূর্ণি ঘুরতে শুরু করে দিল। তারপর সেই ঘূর্ণিটা হয়ে গেল একটা লাটিম। লাটিমের গায়ে অনেকগুলো রঙ। লাল, সবুজ, সাদা, হলুদ, টিয়া, নীল। আরেকটা কী যেন রঙ দেখলাম। সেটা চিনতে পারলাম না। আমি তো আসলে গাছটার কথা ভাবতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি গাছটা দেখতে পেলাম যখন, তখন আমার খুব ভালো লাগল। আমি গাছটার একটা ছবি আঁকতে চাচ্ছিলাম। প্রথমে ভাবলাম, অনেক দিন হলো পেনসিল দিয়ে ছবি আঁকা হয় না। তাই পেনসিল দিয়েই আঁকব। তারপর মনে হলো অন্য কিছু দিয়ে আঁকি। কিন্তু আমার কাছে সবুজ রঙ ছিল না। তখন আমার আরেকটা জিনিস মনে হলো। নীল আর হলুদ রঙ মিশালে সবুজ রঙ হয়। জানো? ওহ, তুমি তো এটা জানোই। তুমিই তো আমাকে শিখিয়েছ। তারপর মনে হলো, আমার তো ‘ক্লে’ আছে। সেটাতে রঙের শেড অনেক বেশি। তাই অনেক রঙের ক্লে ব্যবহার করব। আচ্ছা, রঙের কথা এখন থাক। আমি তো গাছটার কথা বলতে চেয়েছিলাম। তারপরই তো প্রথমে ভাবনার ভেতর পানির ঘূর্ণি এলো। তারপর এলো রঙিন লাটিমটা। ওটা ঘুরতেই থাকল, ঘুরতেই থাকল। তখন গাছটা আমাকে ডাকল।
গাছটা তোমাকে ডাকল?
হ্যাঁ। বললামÑ সুপ্তি, এদিকে এসো। চার দিন হলো এই স্কুলে এসেছ। একদিনও আমার কাছে আসোনি। পরিচিত হওনি। আমি তো অনেক আগে থেকেই এই স্কুলটার কাছে থাকি। আসলে বলা উচিত, আমিই আগে এখানে জন্মেছি। তারপর স্কুলটা হয়েছে। সেই হিসেবে আমি তোমার ‘সিনিয়র’। তোমার উচিত ছিল আমার কাছে এসে পরিচিত হওয়া। তাই এখন জলদি কাছে আসো।
আমি গাছটার কাছে গেলাম। ‘সরি’ বলে পরিচিত হলাম। গাছটা তখন আমার সঙ্গে অনেক কথা বলল। তারপর দেখাল নতুন পাতা কীভাবে গজায়। তারপর দেখাল পুরনো পাতা কীভাবে হলুদ হয়ে যায়। পাতাগুলো বাতাসে নড়াচড়া করতে থাকে। যেসব পাতা একটু পুরনো হয়ে গেছে, যেগুলো বেশি হলুদ দেখতে, সেগুলো টুপ করে নিচে পড়ে যায়। যেগুলো নিচের পড়ে যায় সেগুলো আবার পানি আর মাটির সঙ্গে মিশে গাছটার খাবার হয়ে যায়। কী মজার ব্যাপার, গাছ ‘রিসাইকেল’ করতে জানে। গাছটা যখন আমাকে অনেক কিছু জানাচ্ছিল তখনই সে ‘উফ’ করে উঠল। আমি বললামÑ কী হয়েছে? তখন গাছটা বললÑ একটা দুষ্টু কাঠবিড়ালি আসে আমার কাছে। আসুক, সমস্যা নেই। গাছের ফল খায়। খাক, সমস্যা নেই। কিন্তু সে মাঝেমধ্যে কুটুস করে আমাকে চিমটি কাটে। তখন আমি কাঠবিড়ালিটাকে দেখতে পেলাম। তারপর কী হলো জানো...?
ঠোঁটের কোনায় মিষ্টি হাসি নিয়ে মা এসব শুনতে থাকেন। সুপ্তি কথা বলতেই থাকে, বলতেই থাকে। মা হাতের কাজ করতে করতে সব শোনেন। শোনেন আর আশ্চর্য হন। ছোট্ট এই মেয়েটার কল্পনার জগৎ কী সুন্দর। কত সুন্দর সব বিষয় আর রঙে সেসব সাজানো! তার নিজের শৈশবে এতকিছু ছিল না। সেই সময়ে বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। তিনি যে স্কুলে পড়তেন সেখানে ইউনিফর্মও পরতে হতো না। নিজের শৈশব কিছুটা অন্ধকার ছিল বলে মেয়ের শৈশবকে তিনি আলোয় ভরিয়ে দিতে চান।
মা নিজের কথা, নিজের কাজ সামলেও মেয়েকে সময় দেন। সুপ্তি কথা বলতে শিখেছে একটু দেরি করে। আর এখন অনেক কথা বলে। থামেই না প্রায়। মা সবই আনন্দ নিয়ে শোনেন। স্কুল থেকে ফিরেই শুরু হয় কথা। কী হলো আজ, কীভাবে সেসব হলো। মা সবই শোনেন। তারপর বাবা ফিরলে শুরু হয় প্রশ্নের ঝড়। হাজারো প্রশ্ন আছে সুপ্তির কাছে। আগে তো শুধু মুখেই বলত, এখন লিখতে শিখেছে বলে কিছু প্রশ্ন লিখেও রাখে।
চারদিন হলো সুপ্তিকে নতুন স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। প্রথম দিন শুনতে হলো ক্লাসের সবার নাম। শিশু আর শিক্ষক মিলিয়ে একচল্লিশটি নাম সুপ্তি মনে রেখেছে এটা সেদিন অবাক করেছিল মাকে। দ্বিতীয় দিন একটা মেয়ে ঘুমের ঘোরে কীভাবে জামা উল্টো করে পরেছিল, সেই গল্প শুনতে হলো। তৃতীয় দিনে কুইজের গল্প, গতকাল গাছ আর কাঠবিড়ালির গল্প। কিন্তু আজ সুপ্তি ফিরে এসে কোনো কথা বলছে না। একদম চুপ। মা অবাক।
পুরো দুপুর চুপচাপ। বিকালের দিকে সুপ্তি মায়ের হাতে একটা ছবি ধরিয়ে দিল। মা দেখলেনÑ ছবিতে সূর্য, মেঘ আর আকাশে ভেসে ভেসে আনন্দ করছে তিনটি শিশু।
মা ছবিটার দিকে তাকিয়েই থাকলেন। তোমরাও দেখো। ছবিটি এখানেই কোথাও থাকার কথা।