× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্লাস্টিকের ছোবলে টাঙ্গুয়ার হাওর

হুমকিতে জীববৈচিত্র্য ও কৃষি

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০৫ পিএম

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এখন প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াল থাবায় জর্জরিত	ছবি : প্রতিবেদক

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এখন প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াল থাবায় জর্জরিত ছবি : প্রতিবেদক

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের সংকট ও পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক। সমুদ্র থেকে পাহাড়ি নদী- সবখানেই এর প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলও এ ভয়াবহ দূষণের বাইরে নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার সাইট সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এখন প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াল থাবায় জর্জরিত।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, মৌসুমে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের আনাগোনায় হাওরে জমছে টনকে টন প্লাস্টিক বর্জ্য। নৌকা ভ্রমণ শেষে খাওয়ার পর পরিত্যক্ত পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক গ্লাস-প্লেটÑ সবই নির্বিচারে পানিতে ফেলা হচ্ছে। ফলে হাওরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়েছে অপচনশীল বর্জ্য, যা সরাসরি হুমকি তৈরি করছে হাওরের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও কৃষি উৎপাদনের ওপর।

স্থানীয়রা জানান, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্লাস্টিক দূষণ। নৌকা থেকে বর্জ্য ছুড়ে ফেলায় পানির মান নষ্ট হচ্ছে, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজননে বাধা তৈরি হচ্ছে। হাওরের তীরবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, সচেতনতার অভাবে পর্যটকরাই পরিবেশ ধ্বংসের বড় কারণ হয়ে উঠেছেন।

সম্প্রতি পর্যটকবাহী নৌযানে করে টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ নৌকায় বর্জ্য ফেলার কোনো ব্যবস্থা নেই। অল্প কিছু নৌকায় ডাস্টবিন থাকলেও তা ব্যবহার করতে দেখা যায়নি পর্যটকদের। বরং ঘাটে নোঙর করা নৌকার আশপাশের পানিতেও ভাসছিল প্লাস্টিকের প্লেট, পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিন।

মধ্যনগরের বংশীকুণ্ডা গ্রামের ট্রলার মালিক জয়কুল মিয়া বলেন, ‘পর্যটকরা খাওয়া-দাওয়া শেষে সবকিছুই পানিতে ফেলে দেন। আমরা নিষেধ করলেও অনেকেই শোনেন না। বিশেষ করে তরুণরা এসব মানতে চান না। পর্যটকদের সঙ্গে কথা বাড়ালে আমাদেরই বিপদ হয়।’

জানা গেছে, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে হাওর পারের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘জনাশিউস’ সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরে একটি জরিপ চালায়। সেখানে দেখা গেছে, ১৫ জনের একটি পর্যটক দল ভ্রমণ শেষে অন্তত ১ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে আসেন। সে হিসাবে ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় ১ টন প্লাস্টিক হাওরের পানিতে মিশে যাচ্ছে। সংস্থাটির সভাপতি সাজেদা আহমেদ বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওর বাঁচাতে হলে প্রথমেই পর্যটকদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এ বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়।’

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ডাহুক’-এর পরিচালক মো. মাগফি রেজা সিদ্দিক জানান, পর্যটক পরিবহনকারী নৌকা ও তাদের ব্যবহৃত প্লাস্টিকসামগ্রীর কারণে হাওরের তলদেশে এখন কয়েক কোটি টাকার প্লাস্টিক জমে আছে। এভাবে চলতে থাকলে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্লাস্টিক দূষণের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো কৃষিতে এর নেতিবাচক প্রভাব। বর্ষা শেষে যখন হাওরের পানি শুকিয়ে যায়, তখন বর্জ্য জমিতে পড়ে থাকে। জমিতে চাষাবাদের সময় এগুলো কৃষকদের জন্য নতুন বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। হাওর তীরবর্তী নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, ‘পানি গেলেগা আগে আমরা সুন্দর করে ফসল চাষ করতে পারতাম। এখন দেহা যায়, জমিতে অনেক বোতল ও প্লাস্টিকের আবর্জনা মাটির সাথে গাঁইথ্যা থাহে। এতে মাটি থাইক্যা প্লাস্টিক সরাইয়া চাষাবাদ করতে সমস্যা অয়, ফসলেরও ক্ষতি অয়।’ 

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘পর্যটকদের ফেলা প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্য মাটিতে মিশে যাচ্ছে। এতে একদিকে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকরাও সমস্যায় পড়ছেন। পর্যটকরা যদি নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতেন, তাহলে হাওর ও কৃষি উভয়ই সুরক্ষিত থাকত।’

পরিবেশবিদদের মতে, প্লাস্টিক হাওরের মাছ, শামুক, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। মাছ প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণিকা খেয়ে মারা যাচ্ছে, পাখিরা গলায় প্লাস্টিক আটকে শ্বাসরোধে মৃত্যুবরণ করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি হাওরের বাস্তুতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার হুমকি তৈরি করছে।

টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যা শুধু সুনামগঞ্জ নয়, পুরো বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মানচিত্রে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। অথচ সচেতনতার অভাব, দুর্বল সংরক্ষণ নীতিমালা ও দায়িত্বহীনতার কারণে আজ এটি ধ্বংসের মুখে।

যদিও হাওরটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যেই ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা রক্ষা না করায় এতে কার্যকর সুফল মিলছে না।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নানামুখী দূষণে জর্জরিত টাঙ্গুয়ার হাওর বাঁচাতে এখনই অপরিকল্পিত ও পরিবেশ বিধ্বংসী পর্যটনের লাগাম টেনে ধরা, হাওরে প্রতিটি জলযানে ডাস্টবিন বাধ্যতামূলক ব্যবহার, প্লাস্টিক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধকরণ এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। নচেৎ অচিরেই প্লাস্টিকের ছোবলে টাঙ্গুয়ার হাওর তার জীববৈচিত্র্য, কৃষি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলবে।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা