ইসমাইল মাহমুদ
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০১ পিএম
প্রায় সাড়ে ৩৫০ বছরের ইতিহাস বহন করে আসছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ি। স্থানীয়দের কাছে ভগ্নদশায় পতিত এ বাড়িটির পরিচিতি ‘জমিদার কামিনী ভবন’ নামে। আনুমানিক ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে জমিদারিপ্রাপ্ত হয়ে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের যশোরের বনগাঁও থেকে শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা পরগনায় আসেন জমিদার কুঞ্জ বিহারী সেন।
তিনি উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তবর্তী একটি এলাকায় জমিদারি ভবন নির্মাণ করে ওই পরগনার জমিদারি শাসন শুরু করেন। পরে ওই এলাকা জমিদার কুঞ্জ বিহারী সেনের নামে কুঞ্জবন গ্রাম নামকরণ করা হয়। এর কয়েক বছর পর দুর্দান্ত প্রতাপশালী জমিদার কুঞ্জ বিহারী সেনের জ্যেষ্ঠপুত্র কামিনী বিরাহী সেন বালিশিরা পরগনার অন্য এক এলাকায় এসে নির্মাণ করেন ‘কামিনী ভবন’ নামের একটি মনোমুগ্ধকর বাড়ি। পরে তাদের আদি নিবাস তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের যশোরের বনগাঁওয়ের নামে এ এলাকার নামকরণ করা হয় বনগাঁও গ্রাম। আসাম স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয় একতলা বিশিষ্ট তিন কক্ষের মনোরম বাড়িটি। বাড়িটি তৈরির মালামাল ও বারান্দার লোহার নকশাগুলো আনা হয়েছিল ভারতের আসাম ও কলকাতা থেকে। বাড়িটির মূল ভবনের নির্মাণের পর বাড়ির পূর্ব পাশে খাজনা আদায়ের জন্য নির্মাণ করা হয় কাচারি ঘর ও প্রজাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের জন্য দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র আর পশ্চিম পাশে নির্মাণ করা হয় জলসা ঘর। ওই জলসা ঘরে নাচ-গানে মুগ্ধতার ইন্দ্রজালে সবাইকে আচ্ছন্ন করতেন কলকাতার বাইজিরা। জলসা ঘরের পাশেই ছিল শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। সেখানে জমিদার পরিবারের সদস্যরা গোসল করতেন।
-68e61a085aba7.jpg)
কামিনী সেন ‘কামিনী ভবন’ নামে বনগাঁওয়ে যে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন সেখান থেকেই তিনি পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিদারি চালিয়ে যান। বহু আগেই জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও এ বাড়িটি অর্থাৎ কামিনী ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় এখনও প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো বাড়িটি কোনোরকম দাঁড়িয়ে থাকলেও ওই জমিদারবাড়ির জলসা ঘর, খাজনা আদায়ের কাচারি ঘর, দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র তথা হাসপাতালটির কোনো স্মৃতিচিহ্ন বর্তমানে আর অবশিষ্ট নেই। এসব স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে শতবর্ষ আগেই। বাড়ির পাশের বিশালাকার বটগাছ এখনও পথিকদের ছায়াদান করে গেলেও বটগাছের পাশে জমিদার কুঞ্জ বিহারী সেন কর্তৃক এ অঞ্চলের প্রজাদের পানীয়-জলের জন্য খননকৃত বিরাট দিঘিটি ভরাট করে ফেলা হয়েছে। কালের ধুলোয় হারিয়ে যাওয়া বালিশিরা পরগনার বনগাঁওয়ের জমিদারবাড়িটি এখন ভুতুরে বাড়ি। জমিদার কুঞ্জ বিহারী সেনের পরবর্তী প্রজন্মের কেউই এ বাড়িটিতে আর বসবাস করেন না। পরিবারের সদস্যদের অধিকাংশই বর্তমানে স্থায়ীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা।
-68e61a1511e44.jpg)
বালিশিরা পরগনার জমিদার কুঞ্জ বিহারী সেনের উত্তরাধিকারী অনুপম সেন বাবলা বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের যশোর জেলার বনগাঁওয়ে। সেখান থেকে জমিদারি পেয়ে বর্তমান শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন গ্রামে আসেন কুঞ্জ বিহারী সেন। উনার ছেলে কামিনী সেন বনগাঁও গ্রামে ব্রিটিশ আমলে জমিদারবাড়ি তৈরি করেন; যার বয়স প্রায় ৩৫০ বছর। কামিনী সেনও এতদঞ্চলের জমিদার ছিলেন। কামিনী সেনের সময় থেকে আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম কামিনী ভবনে বসবাস করছিলেন। কামিনী সেন জমিদারবাড়িটিতে কাচারি ঘর, দাতব্য চিকিৎসালয়সহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করেন। এখন জমিদারি প্রথা নেই। সেই সঙ্গে বাড়িটিতে আগের মতো কোনো পরিবেশ নেই। বাড়িটি এখন বিলীনের পথে।’
স্থানীয় সমাজকর্মী কংকন পুরকায়স্থ টিটু বলেন, ‘ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও এলাকা থেকে কুঞ্জ বিরাহী সেন জমিদারি প্রথা পেয়ে আমাদের সিন্দুরখান ইউনিয়নে বসতি স্থাপন করেন। উনার নামানুসারে কুঞ্জবন গ্রামটি স্থাপিত হয়। তারপর বনগাঁও গ্রামে এসে তিনি জমিদারি প্রথা শুরু করেন। পশ্চিবঙ্গের বনগাঁও এলাকার নামানুসারে তিনি এ গ্রামের নামকরণ করেন বনগাঁও। উনার ছেলে কামিনী সেন। কামিনী সেনের ছেলে নেপু সেন। উনারা যখন জমিদারি প্রথা চালু করেন তখন অনেক লোক উনাদের সম্মানার্থে হোক বা ভয়েই হোক জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে চলাচলের সময় জুতা, ছাতা এগুলো ব্যবহার করতে না বলে আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে জেনেছি। জমিদারবাড়িটি বর্তমানে ভগ্নদশায় আছে। সরকারের প্রতি আমাদের আবেদন, এ বাড়িটি প্রাচীন স্থাপত্য হিসেবে যেন সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।’