মাহবুবা মিতু
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:২৮ পিএম
শরীর ও মন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও আমরা শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হলেও মানসিক স্বাস্থ্যকে তেমন গুরুত্ব দিই না অথচ মানসিক সুস্থতা ছাড়া জীবনের পূর্ণতা অর্জন কঠিন। কিছু সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে আমরা মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে পারি, যা আমাদের জীবনকে সুষম ও পরিপূর্ণ করে তুলবে।
নিয়মিত ব্যায়াম
নিয়মিত শরীরচর্চার অনুশীলন সুস্থ রাখতে পারে আপনার শরীর ও মন। প্রতিদিন সকাল কিংবা বিকালে ২০-৩০ মিনিট হালকা ওয়ার্ক-আউট, হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং বা অন্য শারীরিক ক্রিয়াকলাপ মানসিক চাপ কমায় এবং এন্ডরফিন নিঃসরণ করে, যা আমাদের মনকে প্রফুল্ল রাখে। তাই নিয়মিত হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
পরিমিত ঘুম
শরীরের মতো মস্তিষ্কও বিশ্রাম চায়, আর সেই বিশ্রাম সবচেয়ে ভালোভাবে পাওয়া যায় ঘুমের মাধ্যমে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শুধু শরীরই নয়, মনও নানা সমস্যায় ভোগে। ঘুম কম হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। পরিমিত ঘুম মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বজায় রাখে, স্ট্রেস কমায়, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ায়।

প্রার্থনা
প্রার্থনা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং মনের প্রশান্তি লাভের একটি কার্যকর উপায়। মানসিকভাবে ভালো থাকতে এটি একটি শক্তিশালী উপায়। প্রার্থনার মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরের দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও মানসিক চাপকে সৃষ্টিকর্তার হাতে সমর্পণ করে। এতে মন হালকা হয় এবং শান্তি অনুভূত হয়। নির্দিষ্ট সময়ে প্রার্থনা করার অভ্যাস মানসিক শৃঙ্খলা তৈরি করে এবং স্থিতিশীলতা বাড়ায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
ধ্যান ও মাইন্ডফুলনেস
ব্যস্ততায় ভরা এ জীবনে শেষ কবে আপনি নিজের হার্টবিট শুনেছেন? শুধু বসে, চুপচাপ নিজেকে অনুভব করেছেন? অথচ আমরা দিনরাত এক করে দিই অন্যকে বোঝার চেষ্টায় কিন্তু নিজেকে ভেতর থেকে দেখার সময় আমাদের হয় না। জীবনে সবকিছুর আগে জরুরি নিজের ভালো থাকা। আপনি ভালো না থাকলে আপনার পরিবার চারপাশের মানুষকে আপনি ভালো রাখবেন কীভাবে? তাই নিজের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের জন্য ধ্যান ও মাইন্ডফুলনেসের চর্চায় মনোযোগ দিন।
সামাজিকতা
তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে আমরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় ভুগছি তা হলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের মতো প্লাটফর্মকে আমরা সামাজিক মাধ্যম বললেও প্রকৃতপক্ষে এগুলো আমাদেরকে অসামাজিক করে তুলছে। পরিবার, বন্ধু বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে মানসম্পন্ন সময় কাটানো মানসিক একাকিত্ব, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে।
সময় ব্যবস্থাপনা
সময় ব্যবস্থাপনা মানসিক সুস্থতা এবং জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো সময় ব্যবস্থাপনা মানে শুধু কাজ গুছিয়ে শেষ করা নয়, বরং কাজ, বিশ্রাম, পরিবার ও নিজের জন্য সমানভাবে সময় রাখা। কর্মব্যস্ততার মাঝে নিজের জন্য সময় বের করুন। এ সময় নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলুন, বোঝাপড়া করুন। পছন্দ বা শখের কাজগুলো করুন। এতে মন ভালো থাকে।
কৃতজ্ঞতা চর্চা
কৃতজ্ঞতা হলো জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার এক বিশেষ অনুশীলন। জীবনে কী পাননি তার হিসাব না করে নিজের অর্জন, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য কিংবা প্রতিদিনের ছোট ছোট সুখের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানসিকভাবে শান্তি আনে।
পরিস্থিতি মেনে নেওয়া
জীবনে সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে না। তাই বিপদ, সমস্যা, দুর্যোগ যা-ই আসুক না কেন সবকিছুকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি। পরিস্থিতি মেনে নেওয়া আসলে আত্মসমর্পণ নয়, বরং সচেতনভাবে বোঝা যে জীবনের প্রতিটি ঘটনার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এ অভ্যাস আমাদের মানসিক অবস্থাকে দৃঢ় ও উন্নত করে।
নেতিবাচকতা এড়ানো
নেতিবাচকতা এমন এক অদৃশ্য ভার, যা ধীরে ধীরে মনের প্রশান্তি নষ্ট করে দেয়। নেতিবাচক চিন্তা যেমন নিজের আত্মবিশ্বাস কমায়, তেমনি নেতিবাচক মানুষের সঙ্গও মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে। তাই ভালো থাকতে চাইলে প্রথমেই প্রয়োজন নেতিবাচকতা থেকে দূরে থাকা।
বই পড়া ও ডায়েরি লেখা
বই পড়া ও ডায়েরি লেখা এই দুই অভ্যাস মানুষকে মানসিকভাবে যেমন সমৃদ্ধ করে, তেমনি শান্তও রাখে। বই পড়া শুধু জ্ঞান বাড়ায় না, বরং মনকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। ভিন্ন ধরনের বই পড়লে পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা প্রসারিত হয়, ভাষার দক্ষতা বাড়ে এবং কল্পনাশক্তি সমৃদ্ধ হয়। অন্যদিকে ডায়েরি লেখা হলো নিজের সঙ্গে নিজের আলাপ। দিনের অভিজ্ঞতা, ভালো লাগা বা কষ্টের মুহূর্তগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখলে মন হালকা হয়। এটা আত্মপর্যালোচনারও একটি দারুণ মাধ্যম।
দান করা বা উপহার দেওয়া
নিয়মিত দান করা বা উপহার দেওয়ার মাধ্যমে মনে আনন্দ, তৃপ্তি আর কৃতজ্ঞতা জন্মায়। অন্যের মুখে হাসি দেখতে পাওয়া নিজের মস্তিষ্কে হ্যাপিনেস হরমোন (ডোপামিন, অক্সিটোসিন) বাড়ায়।