শফিকুর রহমান
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৫ ১৮:২২ পিএম
বাংলাদেশ উন্নয়নের যাত্রা এগিয়ে চলেছে সমান্তরালভাবে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণে। একসময় গৃহকোণে সীমাবদ্ধ থাকা রান্নার কর্মশৈলী আজ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। রন্ধন শিল্প এখন কেবল পরিবারকেন্দ্রিক নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশে বিকশিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের অগ্রনায়ক হয়ে উঠেছেন অনেক নারী উদ্যোক্তা, যাদের মধ্যে হাসিনা আনছার একটি উজ্জ্বল নাম।
হাসিনা আনছার জন্মেছেন কুষ্টিয়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ এবং কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও পৌরসভার চেয়ারম্যান। এমন অনুপ্রেরণাদায়ী পরিবেশে বড় হওয়া হাসিনা শিক্ষাজীবনেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। কুষ্টিয়া সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে তারকা চিহ্ন পাওয়া এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে লেটারসহ উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা তার মেধার পরিচায়ক।
রান্নার হাতেখড়ি
পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হওয়ায় বাবা-মায়ের স্নেহে বড় হওয়া হাসিনা শৈশবেই রান্নার প্রতি আকৃষ্ট হন। মা ছিলেন দক্ষ রাঁধুনি, তার কাছ থেকেই রান্নার হাতেখড়ি। পরিবারের রান্নাঘর থেকেই শুরু হয়েছিল যাত্রা, যা পরবর্তীতে পরিণত হয় এক সফল রন্ধন শিল্পীর পথে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রান্না যেমনÑ ভর্তা, ভাজা, রুই মাছের দোপেঁয়াজা বা সরিষা ইলিশের পাশাপাশি তিনি কোরমা, পোলাও, খাসির রেজালা কিংবা কসা মাংস রান্না করে রসনা তৃপ্ত করেছেন ভোজন রসিকদের। ছোট মাছের চচ্চড়ি কিংবা মাছের কালিয়া তার বিশেষ পছন্দ।
চ্যালেঞ্জ
হাসিনা আনছারের মতো নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রন্ধন শিল্পের পথ চ্যালেঞ্জময়। সামাজিক মানসিকতা ও পারিবারিক প্রত্যাশা প্রায়ই সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। পুঁজি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাওয়া সহজ নয়, আর বাজারে প্রতিযোগিতাও তীব্র। পরিবারের দায়িত্ব, স্বাস্থ্য ও সময় ব্যবস্থাপনাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও নিজের দক্ষতা, ধৈর্য ও উদ্যমে তারা এগিয়ে চলছেন এবং নতুন প্রজন্মের নারী উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন।
হাসিনা কেবল সুস্বাদু রান্নার মাধ্যমেই নয়, স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। আলাপচারিতায় তিনি বারবার উল্লেখ করেছেনÑ পুষ্টিকর রান্না ছাড়া আসল সাফল্য আসে না। মিষ্টিজাতীয় খাবারেও তার দক্ষতা প্রশংসনীয়। তবে ব্যবসায়িক সফলতার চেয়ে মানুষের জন্য মানসম্মত খাবার পৌঁছে দেওয়া তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাঁধুনি থেকে প্রশিক্ষক
নিজে রান্না শিখে আজ তিনি প্রশিক্ষক হয়ে অনুজদের গড়ে তুলছেন। বহু শিক্ষার্থী তার কাছে রান্নার কৌশল শিখে আত্মনির্ভরতার পথে হাঁটছেন। ইতোমধ্যে তিনি বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছেন এবং রন্ধন শিল্পে নারীদের অনুপ্রেরণা হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন রেসিপি বই সম্পাদনায়ও যুক্ত হয়ে সহকর্মীদের প্রিয়ভাজন হয়েছেন।
সফলতা
হাসিনা আনছারের উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর রান্নার প্রচার, রান্নার প্রশিক্ষণ প্রদান করে নারীকে আত্মনির্ভর করার উদ্যোগ, বিভিন্ন রন্ধন শিল্পীর রেসিপি বই সম্পাদনা এবং সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। এই সব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি নারীদের ক্ষমতায়ন এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রান্নাকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন।
রন্ধন শিল্পী হাসিনা আনছারের লক্ষ্য শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়া। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সমন্বয়ে তিনি যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশি রন্ধন শিল্পের জন্য এক গৌরবের বিষয়। আমরা আশা করি, তার হাত ধরে এই শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের রন্ধনশৈলীকে নতুনভাবে পরিচিতি পাবে।
হাসিনা আনছারের গল্প শুধু একজন রন্ধন শিল্পীর সফলতার কাহিনী নয়, এটি নারীর অদম্য সাহস, ধৈর্য ও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অনন্য প্রমাণ। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি দেখিয়েছেন, সীমাবদ্ধতাকে জয় করা সম্ভব, চ্যালেঞ্জই বড় শক্তির জন্ম দেয়। তার রান্নার কৌশল শুধু ভোজন রসিকদের মনোরঞ্জন করে না, বরং প্রজন্মকে প্রেরণা দেয়Ñ স্বপ্ন দেখার, কাজ করার এবং সমাজে নিজের অবদান রাখার। হাসিনার প্রতিটি পদচারণা যেন বলছে, সীমা মানে বাধা নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার দরজা। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত তার মতো সাহসী হয়ে এগিয়ে চলা, স্বপ্নকে আলিঙ্গন করা এবং সমাজকে আরও সুন্দর করে তোলা। হাসিনার এই যাত্রা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে নারী হলে বা পুরুষ, প্রতিটি চেষ্টা, প্রতিটি উদ্যমই সমাজ ও দেশের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে।