খবির উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৭:০৩ পিএম
খবির উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান, অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব
গলফ এখন শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণির খেলা নয়; এটি সকল শ্রেনি ও সকল বয়সীদের একটি জনপ্রিয় স্পোর্টস হিসেব পরিগণিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে এর জনপ্রিয়তা যেমন বেড়ে চলছে তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনসহ তরুণদের বিভিন্ন মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখতে এর অবদান ক্রমশই বেড়ে চলছে।
Sports Tourism বা ক্রীড়া পর্যটনের মধ্যে গলফ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা উন্নত এবং উন্নয়শীল সকল দেশের জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারে। 'বাংলাদেশ পর্যটন নীতিমালা ২০১০' এ স্পোর্টস ট্যুরিজম-কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বিশেষ করে প্রাইভেট সেক্টরে গলফ ট্যুরিজমের প্রচার-প্রচারণায় দেশে একটি ভালো গতি পাচ্ছে। ক্রিকেট, ফুটবল, হা-ডু-ডু এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খেলার মতই গলফ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় খেলা হিসেবে আভির্ভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, যিনি বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট, এদেশে গলফ স্পোর্টসকে সর্বত্রই ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন এদেশের যুবক-যুবা এবং সুবিধাবঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রী এবং উদীয়মান খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তা দিয়ে গলফ স্পোর্টসের উন্নয়ন করতে হবে। এর মাধ্যমে তুরণ-তরুণীরা নেশা সহ সকল খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। তিনি আরো বলেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গলফ স্পোর্টসের মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। একইভাবে গলফ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসবে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে এবং প্রাণবন্ত যুবসমাজ গড়ে উঠবে। এছাড়াও বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশন (বিজিএফ) সম্মানিত সভাপতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল উয়াকার-উজ-জামান ওএসপি, এসজিপি, পিএসসি প্রাইভেট সেক্টরে যেসব গলফ ক্লাব আছে এবং প্রাইভেট সেক্টরে আরও গলফ ক্লাব হোক এ বিষয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন।
তিনি এদেরকে সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশের গলফ ফেডারেশন (বিজিএফ)-এর দায়িত্ব হচ্ছে দেশে গলফের উন্নয়ন এবং বিস্তারে কাজ করা। বিজিএফ তাই করছে। বর্তমান সেনাপ্রধান বাংলাদেশে গলফ উন্নয়নে ব্যাপক গুরুত্বায়ন করেছেন এবং বাংলাদেশ সরকারও সেই গুরুত্ব অনুধাবন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিকরণসহ প্রাইভেট গলফ রিসোর্টগুলোকে সহায়তা প্রদান করা উচিত। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এবং বিজিএফ-এর প্রেসিডেন্ট জেনারেল উয়াকার-উজ-জামান ওএসপি, এসজিপি, পিএসসি এ বছর অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব আয়োজিত 1st BKMEA Golf Tournament-2025 এ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে টুর্নামেন্টের শুভ উদ্বোধন এবং বিজয়ীয়দের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। এছাড়া, তিনি অরুণিমা রিসোর্ট ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং রিসোর্টে লেকে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন এবং বৃক্ষরোপন করেন। তিনি অরুনিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাবের প্রাকৃতিক সবুজ পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন।
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে গলফ-খেলোয়াড়ের সংখ্যাও বাড়ছে। অনেক যুব-যুবা এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষেরা গলফ স্পোর্টসে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এটা একটি শুভ লক্ষণ। বলবয়, ক্যাডি, গ্রাউন্ডসম্যান, গ্রীনম্যান, গলফ কোচ থেকে গলফার সর্বত্রই এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে গলফ খেলোয়াড়ের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে যার মধ্যে ৩-৪ জন খেলোয়াড় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। একটি বিশেষ পর্যটন সেগমেন্ট হিসাবে গলফিং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করতে পারে ( জিয়াউল হক, আলোকিত বাংলাদেশ, ২ জুলাই ২০২৩)।
বাংলাদেশে গলফ স্পোর্টস এবং গলফ ট্যুরিজমের উন্নয়নের জন্য অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব আমার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় যা ২০১৭ সালে বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশন (বিজিএফ) এর এফিলিয়েশন পায়। অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এখানে আগত অতিথিগণ (গলফার এবং নন-গলফার) গলফ খেলতে পারছেন। এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে কয়েকটি টুর্নামেন্টও এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নড়াইল জেলার নড়াগাতি উপজেলার পানিপাড়া গ্রামে 'অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব' হচ্ছে ন্যাচারবেইজড। এই গলফ কোর্সটি ০৯ হোল এবং ৩৬ পার বিশিষ্ট। এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ, সুবজ দিগন্তজোড়া মাঠ, সুপরিসর লেক, সুইমিং পুল, বিভিন্ন ফুল-ফলের সবুজ বৃক্ষরাজি, ঔষধি গাছ এবং পদ্মপুকুরসহ ইত্যাদি। সর্বোপরি এখানকার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী পাখি এবং নানাধরণের দেশীয় পাখি। এই গলফ রিসোর্টে রয়েছে পাখির অভয়ারণ্য (birds sancturary)। এখানে যে অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ রয়েছে গলফ খেলোয়াড়গণ তা দেখে অভিভূত হয়ে যায়।
এছাড়া এখানে আছে সুইমিং পুল, বার সুন্দর আবাসন এবং প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন ফলমূল, শাকসবজি ও দুগ্ধজাতীয় খাবার এবং নিজস্ব লেকের মাছ।। গলফ প্লেয়ার এবং অন্যান্য গেস্ট এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে ভিটামিন ডি গ্রহণ সহ নানাধরণের স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে সুস্থ্য হয়ে উঠতে পারেন দ্রুত। বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশন (বিজিএফ) হতে এসকল গলফ কোর্সগুলো পৃষ্ঠপোষকতা দিলে বাংলাদেশে গলফ স্পোর্টসকে ভিত্তি করে বহু সংখ্যক বিদেশি খেলোয়াড় আসবে, আন্তর্জাতিকমানের টুর্ণামেন্ট হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে নন-গলফারদের পার্টিং কম্পিটিশন চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে ট্যুরিস্টদের বিনোদন হচ্ছে। এতে করে দেশে গলফ ট্যুরিজমের উন্নয়ন হচ্ছে। সর্বোপরি গলফ ট্যুরিজমের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে গলফ-পর্যটনের একটি অনন্য গন্তব্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এবং এখানে মানুষের ক্রয় ক্রমতা ক্রমশ বাঁড়তে থাকায় এদশে গলফ ট্যুরিজমের প্রসারের বিশাল সম্ভাবনা রযেছে। অনেক তরুণ-তরুণীদের মধ্যে গলফ খেলায় আগ্রহ বাড়ছে। গলফ ট্যুরিজম পারে যুবসমাজকে ধর্মান্ধতা এবং ক্ষতিকারক নেশা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। বাংলাদেশের ক্রীড়া পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গলফকে অনেক পর্যটন বিশেষজ্ঞগণ গুরুত্বারোপ করেছেন। এখানে অনেক বিনিয়োগকারী আসছেন। গলফ পর্যটনে আরও বিনিয়োগ করা গেলে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রে ব্যাপক লাভবান হতে পারে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে এস.ডি.জি অর্জনে সহায়তা করবে।
এস.ডি.জি-৩ বলেছে, সব বয়সের সকল মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন নিশ্চিত করুন এবং সুস্থ থাকার জন্য খেলাধুলার সাথে প্রাসঙ্গিক নীতিসমূহ প্রচার করুন। খেলাধুলার সাথে যুবকদের সম্পৃক্তকরণ জরুরী কারণ তাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য এটি অপরিহার্য। গলফ খেললে শরীরে ভিটামিন ডি পেতে সাহায্য করে যা কোভিড এবং অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ করে। খেলাধুলাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম অর্জনে সহাযতা করে। তাই গলফের উপর বিশেষ মনোযোগ দিযে আমাদের ক্রীড়া পর্যটনের প্রচার করা উচিত (হক জিয়াউল, আলোকিত বাংলাদেশ, ২ জুলাই ২০২৩)।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সাথে সাথে বাংলাদেশকে গলফ স্পোর্টসের দিকে নজর দিতে হবে। বিদেশি খেলোয়াড়, স্পন্সর এবং আন্তর্জাতিক গলফ ক্লাব সদস্যদের জন্য উন্নতমানের আবাসন, গলফ কোর্সের সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করতে হবে। গলফ কোর্স শুধুমাত্র ক্লাব সদস্য বা পেশাদারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত সুবিধার জন্য গলফ পর্যটনের উন্নয়ন করা প্রয়োজন। গলফ খেলা আমাদের বাংলাদেশে টেকসই পর্যটন উন্নয়নে সহায়তা করবে। এক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে গলফ ট্যুরিজম উন্নয়নে আর্থিক প্রণোদনা এবং স্পন্সর প্রদানসহ বিভিন্ন পলিসি গাইড লাইন দিয়ে সহায়তা করতে পারে।
এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে টেকসই উন্নয়নে পর্যটন। যেহেতু গলফ ক্রীড়া পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, তাই সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের টেকসই পর্যটন উন্নয়নে গলফ দারুণভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবস সফল হোক। গলফ স্পোর্টস সফল আরো জনপ্রিয়তা লাভ করুক।
চেয়ারম্যান, অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব